Dhaka Mail Logo

জাতীয়

আবু সাঈদের মৃত্যু বদলে দেয় পুরো চিত্র

মো. মেহেদী হাসান হাসিব

০৫ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪৪ পিএম

কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন তখনও ছিল মূলত শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের লড়াই। কিন্তু ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর বদলে যায় আন্দোলনের পুরো চিত্র। তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফুঁসে উঠে গোটা দেশ। আন্দোলনে যুক্ত হন স্কুল-কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। একপর্যায়ে কোটা সংস্কারের দাবি ছাড়িয়ে আন্দোলন রূপ নেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে। পরে নয় দফা পেরিয়ে এক দফার দাবিতে গড়ানো সেই আন্দোলনের পরিণতিতে পতন ঘটে টানা প্রায় সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতা ধরে রাখা শেখ হাসিনা সরকারের। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুরোটা সময় ধরে মাঠে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বেলায়েত হোসাইন। আবু সাঈদের মৃত্যু কীভাবে চিত্র বদলে দেয় জানতে চাইলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আবু সাঈদ নিহত হওয়ার ঘটনা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত ও তীব্র করে তোলে।’

বেলায়েত হোসাইন বলেন, ‘শুরুর দিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনে মূলত চাকরিপ্রত্যাশী এবং সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই বেশি সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু আবু সাঈদের মৃত্যুর পর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও ব্যাপকভাবে মাঠে নামতে শুরু করে। একই সঙ্গে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও বেড়ে যায়। আমার কাছে এটিই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট।’

যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই এলাকার বিভিন্ন মাদরাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন, পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদের নিহত হওয়ার ঘটনা তাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। এ ঘটনার পর আবেগ ও ক্ষোভ থেকে অনেক মাদরাসা শিক্ষার্থী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

বেলায়েত হোসাইন আরও বলেন, ‘আবু সাঈদের মৃত্যুর পর আন্দোলন শুধু কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়ন এবং শিক্ষার্থীদের ওপর গুলির ঘটনায় আন্দোলনের চরিত্র দ্রুত বদলে যেতে থাকে।’

জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিক বলেন, ‘আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনের একটি প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এরপর আন্দোলন ধীরে ধীরে নয় দফার গণ্ডি পেরিয়ে এক দফা দাবির দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। ১৮ ও ১৯ জুলাই মাঠে থাকা অনেকের সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে, তখন আন্দোলনকারীদের বড় একটি অংশ আর এটিকে শুধু কোটা সংস্কারের আন্দোলন হিসেবে দেখছিল না; আন্দোলন সরকার পতনের দাবির দিকেও মোড় নিতে শুরু করেছিল।’

যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে পুলিশ সদস্যের ছেলে ইমাম হোসেন নিহত হওয়ার ঘটনার ভিডিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, ‘এ ভিডিও আমি সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ করি। এমন ঘটনাগুলোই আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও জনসম্পৃক্ততা আরও বাড়িয়ে দেয় এবং সরকারবিরোধী ক্ষোভকে তীব্র করে তোলে।’

আবু সাঈদের সঙ্গে সেদিন যা ঘটেছিল

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নামেন, ঠিক তখনই সবার মতো কোটাব্যবস্থার বিরোধিতা করতে রাজপথে নামেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। রাজধানীসহ সারাদেশে আন্দোলন যেমন তীব্র হয়ে উঠছিল, তেমনি রংপুরেও আন্দোলনকে বেগবান করে তুলছিলেন আবু সাঈদসহ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন রংপুর-কুড়িগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের পার্ক মোড়ে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষার্থীরা জড়ো হওয়ার আগেই ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা পুলিশের পাশাপাশি সেখানে অবস্থান নেন। ধীরে ধীরে পার্ক মোড়ে শিক্ষার্থীরা জড়ো হলে বৈষম্যবিরোধী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে এলাকা। শান্তিপূর্ণ এ আন্দোলন দমাতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ শুরু করে। এর প্রতিবাদে পুলিশের সামনে গিয়ে বুক চিতিয়ে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে পড়েন কালো টি-শার্ট পরা এক যুবক। তিনিই আবু সাঈদ।

পুলিশের গুলিকে ভয় না করে সেদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে পুলিশের চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়েছিলেন শহীদ আবু সাঈদ। তাকে লক্ষ্য করে পুলিশের গুলি চালানোর দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নিভে যায় তার প্রাণপ্রদীপ। তার মৃত্যু সারাদেশের ছাত্র-জনতাকে জাগ্রত করে তোলে। দেশজুড়ে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ ছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক।

syed-1

জাতিসংঘ ও অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে আবু সাঈদ হত্যার চিত্র

আবু সাঈদের মৃত্যুকে ঘিরে প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পৃথক প্রতিবেদনে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে। প্রতিবেদন দুটিতে ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষ তথ্য, ক্ষতচিহ্ন ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে তার মৃত্যুর পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক এই অনুসন্ধানগুলোতে আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো এবং তার মৃত্যুর ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) ‘বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন’ শীর্ষক তথ্য-অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ প্রাণঘাতী ধাতব গুলিতে শহীদ হন এবং তিনি ইচ্ছাকৃত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সঠিক ময়নাতদন্ত না হলেও ক্ষতচিহ্ন ও সংশ্লিষ্ট ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে আবু সাঈদকে অন্তত দুটি প্রাণঘাতী ধাতব গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। প্রাপ্ত তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ওএইচসিএইচআরের মূল্যায়ন, তিনি পুলিশের ইচ্ছাকৃত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের ধাওয়ায় শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে আবু সাঈদ দুই হাত মেলে বুক পেতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন রাস্তার বিপরীত পাশ থেকে মাত্র ১৪–১৫ মিটার দূর থেকে অন্তত দুই পুলিশ সদস্য শটগান থেকে সরাসরি তার ওপর গুলি চালান।

আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামিদের সাজা

শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় চলতি বছরের ৯ এপ্রিল প্রকাশ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। রায়ে পুলিশের সাবেক দুই সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড, তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকি ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। এছাড়া সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান জীবন, তাজহাট থানার তৎকালীন পরিদর্শক রবিউল ইসলাম নয়ন এবং এসআই বিভূতি ভূষণ রায় মাধবকরকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য হাসিবুর রশীদ, সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান ও আসাদুজ্জামান মণ্ডল, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন কমিশনার মনিরুজ্জামান এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি আসামিদের তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

Abu-Said

সেদিন শহীদ হওয়া অন্য চারজনের মধ্যে দুজন ছিলেন ঢাকার এবং বাকি দুজন চট্টগ্রামের। ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরামও সেদিন শহীদ হন। চট্টগ্রামে শহীদ হওয়া ওয়াসিমের বিষয়টিও বেশ আলোচিত হয়। মৃত্যুর আগের দিন ওয়াসিম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। পোস্টটিতে তিনি লিখেছেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে আছে আমার প্রাণের সংগঠন। আমি এই পরিচয়েই শহীদ হবো।’ এর ঠিক ১৬ ঘণ্টা পরই শহীদ হন ওয়াসিম আকরাম।
সেদিন জেলায় জেলায় সংঘর্ষ ও বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে সারাদেশ। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। একদিকে ছিল সমগ্র দেশের ছাত্র-জনতা, অন্যদিকে আওয়ামী সরকার, তাদের সমর্থক গোষ্ঠী ও প্রশাসন।

আবু সাঈদের মৃত্যুর দৃশ্য দেখে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দেয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং আন্দোলন দমাতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে তৎকালীন হাসিনা সরকার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সারাদেশে মোতায়েন করা হয় সব ধরনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু সরকারের এই দমন-পীড়ন আন্দোলনকারীদের থামাতে পারেনি। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় ছাত্র-জনতার সম্মিলিত এক দফা আন্দোলনে। সেই এক দফা ছিল তৎকালীন সরকারের পদত্যাগের দাবি। এই এক দফা বাস্তবায়নে প্রাণ দেন দেড় হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা। গুরুতর আহত হন হাজার হাজার মানুষ।
অবশেষে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান। এরপর থেকে তিনি দিল্লিতে অবস্থান করছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।

এমএইচএইচ/জেবি