রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি
০২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১৬ এএম
রাজধানী ঢাকার উত্তরার র্যাব-১ এর হেডকোয়ার্টার মূল ভবনের পেছনের অংশে রয়েছে একটি পুরাতন দোতলা ভবন। যার দুই তলায় রয়েছে মোট ২৯টি রুম বা সেল। বাইরে থেকে দেখে সাধারণ কোনো ভবন মনে হলেও ভেতরের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন।
যে ভবনের কথা বলা হচ্ছে এটি সাধারণ কোনো বাড়ি নয়, এটি র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল যা ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত।
এটি র্যাবের গোয়েন্দা শাখা ইন্টেলিজেন্স’র পরিচালকের অধীনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
শনিবার (১৯ অক্টোবর) বেলা ১১টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক ও প্রসিকিউশন দল আলোচিত এই বন্দিশালা পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিমসহ প্রসিকিউশন টিম এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও এই পরিদর্শনে অংশ নেন।
সাউন্ডপ্রুফ রুম ও গোপন কক্ষের রহস্য
ভবনটিতে ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে পাশাপাশি দুটি ইন্টারোগেশন রুম। পুরো রুম সাউন্ডপ্রুফ বোর্ড দিয়ে ঢাকা, যাতে ভেতরের কোনো শব্দ বাইরে না যেতে পারে। রুমে কোনো বৈদ্যুতিক পাখা নেই, তবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন সরঞ্জাম। একটি রুমের দেয়ালে ক্যান্টনমেন্টের একটি বড় মানচিত্র দেখা যায়। প্রসিকিউটরদের দাবি, পাশেই একটি এসি রুমে বসে র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ পর্যবেক্ষণ করতেন।
বামে ৫টি সিঁড়ির নিচে দুটি বড় কক্ষ রয়েছে যা ‘ভিআইপি সেল’ নামে পরিচিত ছিল। এর একটির আকার ১৪ ফুট বাই ১০ ফুট এবং অন্যটি ১০ ফুট বাই ১০ ফুট। এই রুমগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত বাথরুম থাকলেও ৫ আগস্টের পর প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে পুরো অবকাঠামো বদলে ফেলা হয়েছে বলে জানান প্রসিকিউশন। তদন্ত দল জানায়, ভিকটিমদের বয়ান শোনার পর তারা নবনির্মিত দেয়াল ভেঙে এসব সেলের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন।
দ্বিতীয় তলায় ছোট আকারের ১০টি সেল রয়েছে, যার গড় আকার ১৪ ফুট বাই ৪-৫ ফুট। এখানে র্যাব কর্মকর্তাদের অফিস কক্ষও রয়েছে। একটি রুমে লোহার শিক দেওয়া জানালা দিয়ে বাইরে একটি কাঁঠাল গাছ দেখা যায়। ট্রাইব্যুনালের একাধিক ভিকটিম তাদের সাক্ষ্যে এই জানালার ফাঁক দিয়ে কাঁঠাল গাছ দেখার বর্ণনা দিয়েছিলেন। এর পাশেই রয়েছে একটি বড় এগজস্ট ফ্যান। অন্য একটি রুমে বেশ কিছু ইসলামি বই স্তূপ করে রাখা দেখা গেছে।

অন্ধকার আন্ডারগ্রাউন্ড ও ‘ডেথ সেল’
ভবনের নিচতলায় আন্ডারগ্রাউন্ডে রয়েছে ১০টি ছোট সেল। এখানে ৫ ফুট বাই ৮ ফুট আকারের সেলে একজন মানুষের পক্ষে ঘুমানো প্রায় অসম্ভব। ৫ আগস্টের পর এই সেলগুলোও দেয়াল তুলে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল।
আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বের হয়ে ডানে ৭টি অত্যন্ত সংকীর্ণ সেল রয়েছে, যেগুলোকে ‘ডেথ সেল’ বা ‘যম সেল’ বলা হতো। মাত্র ২ ফুট বাই ৪ ফুট আকারের এসব সেলে নেই কোনো আলো-বাতাস বা ফ্যান।
মানবাধিকার কর্মী ও গুম কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন জানান, এই সেলগুলোর উচ্চতা মাত্র ৪১ থেকে ৫৩ ইঞ্চি, যেখানে মানুষকে মুরগির খাঁচার মতো কুঁকড়ে থাকতে হতো। সেলের ভেতরেই ছিল মলমূত্র ত্যাগের ড্রেনেজ ব্যবস্থা।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার এই স্থাপনাটিকে বলপূর্বক গুম ও নির্যাতনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। গোপনীয়তার জন্য একে কোড নেমে ‘হাসপাতাল’ বলা হতো।
জিজ্ঞাসাবাদের কক্ষে বন্দিদের (যাদের ‘সাবজেক্ট’ বলা হতো) নির্যাতনের জন্য ছিল শিউরে ওঠার মতো ব্যবস্থা। এর মধ্যে ছিল ঘূর্ণায়মান স্টিলের চেয়ার, যাতে বসিয়ে ইলেকট্রিক মোটর চালু করে বন্দিকে প্রচণ্ড গতিতে ঘোরানো হতো। এ ছাড়া ছিল বৈদ্যুতিক শক ও ছাদ থেকে ঝুলিয়ে পেটানোর ব্যবস্থা। মই-সদৃশ লোহার বেডে বেঁধেও চলত নির্যাতন। দেয়ালে ঝোলানো ছিল কাটা হাত বা উপড়ে ফেলা চোখের বীভৎস ছবি, যা বন্দিদের মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার জন্য ব্যবহৃত হতো।
পরিদর্শন শেষে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘এই কক্ষগুলো রূপকথা নয়, বরং ফ্যাসিবাদী শাসনের চরম বাস্তবতা।’
তিনি জানান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং ব্যারিস্টার আরমানকে এই সেলে আটকে রাখার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মায়ের ডাক-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ‘এখান থেকে মাত্র ২০ কদম দূরে ওয়েটিং রুমে আমার মা-বোনেরা বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন, অথচ পাশেই ছিল এই অন্ধকার সেল। আমরা এই অমানবিক টর্চারের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’
আসামিপক্ষের আইনজীবীদের ভিন্নমত
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী তবারক হোসেন ভূঁইয়া এই স্থাপনাকে ‘আয়নাঘর’ হিসেবে মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘টিএফআই কোনো সুনির্দিষ্ট জায়গা নয়, এটি একটি কনসেপ্ট বা ধারণা। এখানে আইনি কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তা বিভাগীয় ব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু একে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলা যায় না।’
৫ আগস্টের পর এই বন্দিশালার অনেক আলামত নষ্ট করা হলেও ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দল দাবি করেছে, ভিকটিমদের সাক্ষ্য ও অবকাঠামোগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে তারা অপরাধের যথেষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন।
আরএনবি/এফএ