Dhaka Mail Logo

জাতীয়

নিখোঁজ মিরাজ শেখকে নিয়ে প্রতিবেদন বিষয়ে কোস্ট গার্ডের প্রতিক্রিয়া

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

০১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫৭ পিএম

গত ২৯ জুলাই অনলাইন নিউজ পোর্টাল ঢাকা মেইলে মিরাজ শেখ কোথায়, কী ঘটেছে তার ভাগ্যে? শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাগেরহাটের মোংলার সুন্দরবন সংলগ্ন জয়মনির ঘোল এলাকা থেকে মিরাজ শেখ (৩০) নামে এক যুবক নিখোঁজের সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও তার কোনো হদিস মেলেনি। পরিবারের অভিযোগ, কোস্টগার্ড সদস্যরা তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই তিনি নিখোঁজ। এই ঘটনায় কোস্ট গার্ডের দায় অস্বীকার, পাল্টা মামলা এবং মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগের মধ্যে বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।

এই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া বিভাগ থেকে একটি প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। বাহিনীটি দাবি করছে, প্রতিবেদনটি একতরফা বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে।

কোস্ট গার্ডের প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়, এ ঘটনায় অভিযোগগুলো বর্তমানে তদন্তাধীন থাকা সত্ত্বেও সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পুনরায় সুস্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে, মিরাজ শেখকে কখনো আটক বা হেফাজতে নেয়নি। অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিটের অপারেশনাল রেকর্ড, টহল কার্যক্রম ও অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান পর্যালোচনায় বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, অভিযোগে বর্ণিত তারিখে জয়মনির ঘোল এলাকায় কোস্টগার্ডের কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি।

কোস্ট গার্ড দাবি করেছে, আত্মসমর্পণকারী বনদস্যুদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মিরাজ শেখ সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত ছোট সুমন বাহিনীর সহযোগী হিসেবে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা, রসদ ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান, কোস্টগার্ডের গতিবিধিসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান এবং জেলেদের কাছ থেকে মুক্তিপণের অর্থ সংগ্রহের কাজে সম্পৃক্ত ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা চলমান রয়েছে এবং তিনি গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি। এছাড়া তার পিতা মোস্তফা শেখও অতীতে সুন্দরবনের বনদস্যু কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করেছিলেন। আরও প্রতীয়মান হয়েছে যে, বনদস্যু চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অর্থ ভাগাভাগি ও সাংগঠনিক বিরোধের কারণে মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার সম্ভাবনাও গুরুত্ব সহকারে অনুসন্ধানাধীন রয়েছে।

কোস্ট গার্ড বলছে, এ ঘটনার পর গত ৮ মে ও ২৬ মে পৃথক সংবাদ সম্মেলনে ঘটনাস্থল, আটককারী ব্যক্তির পরিচয়, পোশাক এবং ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়, যা অভিযোগগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে যৌক্তিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। এছাড়া তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মিরাজ শেখ পূর্ব থেকেই বিভিন্ন সময়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতেন এবং তার পরিবারও এ বিষয়ে অবগত ছিল।

প্রতিক্রিয়ায় আরও বলা হয়, সুন্দরবনে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের ধারাবাহিক অভিযানে বনদস্যু চক্রগুলোর কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হওয়ায় এবং একাধিক বনদস্যুর আত্মসমর্পণের পর জয়মনির ঘোল এলাকায় কোস্টগার্ডের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়। এরই প্রেক্ষাপটে গত ১১ জুন কোস্টগার্ড স্টেশন হারবারিয়ায় সংঘবদ্ধ হামলা, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের চেষ্টা এবং সরকারি নৌযান ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা সংঘটিত হয়, যাতে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি হয় এবং কর্তব্যরত।

প্রতিবেদকের বক্তব্য

'দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়' বলে কোস্ট গার্ডের যে বক্তব্য, তা সত্য নয়। ১০ এপ্রিল মিরাজ শেখ জয়মনির ঘোল এলাকা থেকে কোস্ট গার্ড কর্তৃক তুলে নিয়ে যাওয়ার একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, পরিবারের বক্তব্য রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় দোকানদার মোহাম্মদ আলামিন শেখ, যার দোকান থেকে মিরাজকে অপহৃত করা হয়, তার সাক্ষ্য রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। যা আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। দোকানদার আলামিন শেখ বলেন, ‘দুইজন সিভিল পোশাকধারী লোক এসে মিরাজকে ধরে নিয়ে যায়। ৫-৬ মিনিট পর তারা ফিরে এসে মিরাজের মোটরসাইকেলটি আমার দোকানে রাখতে বলে। আমি রাখতে না চাইলেও তারা জোর করে রেখে যায়।’

কোস্ট গার্ডের বিবৃতিতে, আমার করা রিপোর্টের কোনো অসঙ্গতি তারা তুলে ধরতে পারেননি। এছাড়া মিরাজের নিখোঁজ সম্পর্কে জানতে চাইলে, মোংলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আতিকুর রহমানও তার নামে মামলা আছে কি না বা তিনি বনদস্যু কার্যক্রমে যুক্ত কি না এ জাতীয় তথ্য জানাননি। তাছাড়া পরিবার কোস্ট গার্ডের এ ধরনের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে।’

আরও পড়ুন

গুম কমিশনের দ্বিতীয় প্রতিবেদনেও হাসিনার গোপন বন্দিশালার ভয়ানক তথ্য

‘সরকার কোনোভাবেই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকে প্রশ্রয় দেবে না’

'প্রতিবেদনে উপস্থাপিত অভিযোগের একাধিক তথ্যে গড়মিল রয়েছে' বলে উল্লেখ করলেও এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য তারা তাদের বিবৃতি উল্লেখ করতে পারেনি। তাদের বক্তব্যে দায় অস্বীকার আর সরলীকরণ ছাড়া কিছুই নেই। 

এছাড়া ১০ এপ্রিল নিখোঁজ হলেও ১৩ দিন পর মিরাজের নিখোঁজ জিডির বিষয় জানতে চাইলে তার স্ত্রী মুক্তা খাতুন পুলিশের অসহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ১৩ এপ্রিল থেকে-২৩ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ৭ দিন থানায় গেলেও তারা অভিযোগ নিতে চাননি। তারা শুধু বারবার অপেক্ষা করতে বলেছে। মোংলা থানার মিরাজ নামে এক পুলিশ কর্মকর্তার সাথে তারা এই সাত দিন দেখা করেছেন বলে জানান। অবশেষে ২৩ এপ্রিল তাদের নিখোঁজ জিডি গ্রহণ করা হয়। মুক্তা খাতুনের নিখোঁজ জিডিতে কোস্টগার্ডের নাম উল্লেখ না থাকার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি 'পুলিশ নাম দিতে চায়নি' বলে জানান।

আমার করা রিপোর্টে মিরাজের নিখোঁজ হওয়া থেকে জিডি করা পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের কথা উল্লেখ করলেও নির্দিষ্ট কোনো অসঙ্গতির কথা তুলে ধরতে পারেনি কোস্ট গার্ড। কোন কোন কারণে রিপোর্টটি সাংবাদিকতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অভিহিত করা হয়েছে, তাও স্পষ্ট করে উল্লেখ করতে পারেনি। তাছাড়া জিডি করা নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতার বিষয়টি রিপোর্টের কোনো অসঙ্গতি নয়।

এমআইকে/জেবি