একে সালমান
০১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৮ পিএম
# রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় মিলছে বোম সাদৃশ্য বস্তু
# একদিনে দুই মেট্রো স্টেশনে মিললো দুইটি পরিত্যক্ত বস্তু
# দুই মেট্রো স্টেশনের একটিতে পান,আরেকটিতে মিললো বস্তা
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বোমা-সদৃশ বা সন্দেহজনক পরিত্যক্ত বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, মেট্রোরেল স্টেশন, সরকারি ভবন কিংবা জনবহুল এলাকায় এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
প্রতিটি ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এলাকা ঘিরে রেখে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বস্তুগুলো ক্ষতিকর নয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেলেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের মাঝে।
যেসব ঘটনায় উদ্বেগ বাড়িয়েছে
গত ২৪ জুলাই ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু হওয়া উল্টোরথের শোভাযাত্রা ওই এলাকা অতিক্রম করার কথা ছিল। এসময় আনসার সদস্যদের সতর্কতায় মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে জেনারেটর রুমের পাশে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে একটি আইইডি বা পাইপ বোমা উদ্ধার করে পুলিশ।
সে সময় ছাতার ভেতরে আলো জ্বলতে দেখে বিষয়টি শনাক্ত হয়। শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এড়াতে পুলিশ ঘটনাটি গোপন রেখে সেখানে ‘শর্ট সার্কিট’ হয়েছে বলে জানায়। পরে পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ডিভাইসটি নিষ্ক্রিয় করে। এ ঘটনার পর মতিঝিল থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা দায়ের করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, কে বা কারা ডিভাইসটি সেখানে রেখেছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এটিকে নাশকতার উদ্দেশে রাখা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
এছাড়া সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের কর্মকর্তারা সে সময় জানান, উদ্ধার হওয়া বস্তুর ভেতরে সালফারজাতীয় বিস্ফোরক উপাদানের সঙ্গে বেয়ারিং বল, তারকাঁটা ও ধারালো লোহার টুকরো ছিল। ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক সার্কিটের সঙ্গে ছাতার বোতাম সংযুক্ত ছিল। কেউ ছাতাটি খুলতে গেলে বিস্ফোরণ ঘটতে পারত। বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সময় বিস্ফোরণের স্প্লিন্টারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক পথচারী কর্মী আহত হন।
এদিকে এ ঘটনার পরদিন সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে একটি বস্তা সদৃশ বস্তু দেখে ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সবার মনে আতঙ্ক দেখা দেয়। পরে ঘটনাস্থলে ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এসে একটি বস্তা উদ্ধার করে।
এসব ঘটনার রেশ না কাটতেই বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাতে আশুলিয়ার খেজুর বাগান এলাকায় হৃদয় চাকমার চায়ের দোকানের সামনে একটি পরিত্যক্ত ব্যাগ দেখতে পান স্থানীয়রা। দীর্ঘ সময় ব্যাগটি পড়ে থাকতে দেখে তাদের সন্দেহ হয়। পরে স্থানীয়রা ব্যাগটি তল্লাশি করে একটি ‘প্রেসার কুকার’ দেখতে পান। এরপর ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করেন।
এ ঘটনায় আশুলিয়া থানায় বিস্ফোরক দমন আইনে একটি মামলা হয়েছে। শুক্রবার (৩১ জুলাই) আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম বোমা উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এর কয়েক ঘণ্টা না যেতেই শনিবার (১ আগস্ট) রাজধানীর মিরপুর ও ফার্মগেট এলাকায় নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এদিন সকালে রাজধানীর মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ দুটি পরিত্যক্ত বস্তু পড়ে আছে- এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে।
খবর পেয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে।
যদিও দুই এলাকার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, মিরপুর মেট্রো স্টেশনের নিচে পাওয়া বস্তুটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুসরণ করে ফ্র্যাঞ্জিবল ডিসরাপ্টর ব্যবহার করে নিরাপদে বস্তুটি নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরপর ব্যাগটি খুলে দেখা যায়, ভেতরে ছিল জর্দার একটি কৌটা ও পান। কোনো ধরনের বিস্ফোরক বা ক্ষতিকর বস্তু পাওয়া যায়নি।
একই চিত্র দেখা যায় ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনে। পরীক্ষা নিরিক্ষা শেষে নিশ্চিত হওয়া যায়, বস্তার ভেতরে কোনো ধরনের বিস্ফোরক বা বিপজ্জনক বস্তু নেই।
পুলিশ ও বিশেষজ্ঞরা যা বলছে
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, রাজধানীর মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশন এবং ফার্মগেট এলাকায় বোমা সদৃশ বস্তু থাকার সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করি।’
তিনি জানান, ‘আমাদের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট তাদের অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে সন্দেহজনক বস্তুগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। এরপর আমরা নিশ্চিত হই যে, কথিত বোমা সদৃশ বস্তুগুলো কোন বিস্ফোরক ছিল না। এগুলো ছিল পান সুপারির কৌটা এবং অন্যান্য পরিত্যক্ত আবর্জনা। অর্থাৎ মিরপুর-১০ মেট্রোরল স্টেশনে যেগুলো পাওয়া যায় সেগুলো ছিল মূলত পান সুপারি জর্দা ইত্যাদি। আর ফার্মগেট এলাকাতে যে বস্তুটি পাওয়া যায়, সেটি একটি বস্তার মতো। তার মধ্যে আমরা পরিত্যক্ত ময়লা এবং আবর্জনা পাই। ফলে জননিরাপত্তার জন্য কোনো ধরনের হুমকি বা ঝুঁকির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।’
মোহাম্মদ শামসুল হক আরও বলেন, ‘এসব ঘটনায় কাউকে আতঙ্কিত না হয়ে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জানানোর অনুরোধ করা হলো। এছাড়া ঘটনাগুলো আমরা তদন্ত করে দেখছি। বস্তা কিংবা বস্তু রেখে যাওয়া ব্যক্তিদের আমরা শনাক্তের চেষ্টা করছি। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে আমরা তাদের শনাক্তের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।’
এমন পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দেশে উগ্রবাদী সংগঠনগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা হওয়ার শঙ্কা সরকারের জন্য ভয়ের এবং চ্যালেঞ্জের। লোকসমাগম কেন টার্গেট করছে, রথযাত্রাকে কেন টার্গেট করছে, মেট্রোরেলের নিচে কেন বোমা রাখা হলো- এসব বিষয়গুলো সামনে রেখে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর এজেন্ডা, কখনো নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা যাচাইয়ের চেষ্টা, আবার কখনো পরিকল্পিতভাবে জনমনে ভয়ভীতি সৃষ্টির অপচেষ্টা হতে পারে।’
ড. তৌহিদুল হক আরও বলেন, ‘কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এর পেছনে কারা বা কী উদ্দেশে কাজ করেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।’
একেএস/এএইচ