Dhaka Mail Logo

জাতীয়

‘৩২ জুলাই’ থেকে ‘৩৬ জুলাই’: যেভাবে তৈরি হলো প্রতিবাদের ক্যালেন্ডার

নিজস্ব প্রতিবেদক

০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম

ইতিহাসে কখনো কখনো এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মানুষ কেবল রাষ্ট্রব্যবস্থা নয়, সময়কেও নতুন অর্থ দেয়। তখন ক্যালেন্ডার আর শুধু দিন-তারিখের হিসাব থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে প্রতিবাদ, আশা এবং বিজয়ের ভাষা। বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই ছিল তেমনই একটি মাস।

জুলাই মাস সাধারণত ৩১ দিনেই শেষ হয়। কিন্তু ২০২৪ সালে বাংলাদেশের গণ-আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের একাংশ ঘোষণা করলেন-জুলাই শেষ হবে না। ৩১ জুলাইয়ের পর আসবে ৩২ জুলাই, তারপর ৩৩, ৩৪, ৩৫…এবং যেদিন স্বৈরশাসনের অবসান ঘটবে, সেদিনই শেষ হবে জুলাই। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্টকে বলা হয় ‘৩৬ জুলাই‘। ইতিহাসে এভাবেই জন্ম নেয় একটি প্রতীকী, কাল্পনিক কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী তারিখ।

এটি বাস্তব ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন ছিল না; বরং ছিল আন্দোলনের নিজস্ব সময়-দর্শন-একটি প্রতীকী ‘প্রতিবাদের ক্যালেন্ডার’।

কোটা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান

২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায় ১৪ জুলাই, যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের সম্পর্কে ‘রাজাকারদের নাতি’ মন্তব্য করেন। এই বক্তব্য সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

১৫ জুলাই থেকে আন্দোলন দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। কোটা সংস্কারের দাবিকে ছাড়িয়ে এটি রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে বৃহত্তর গণ-প্রতিরোধে রূপ নেয়। সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার, কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ এবং ব্যাপক প্রাণহানির মধ্য দিয়ে দেশ অস্থির হয়ে ওঠে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী এই সময়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ নিহত ও আহত হন।

অবশেষে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের কাছে সেই দিনটি ‘৫ আগস্ট’ নয়- ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে ওঠে।

কীভাবে জন্ম নেয় ‘৩২ জুলাই’?

জুলাই মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আন্দোলনের লক্ষ্য তখনও অর্জিত হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ১ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বাংলাদেশ সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও অনলাইন কর্মী মো. শামসুল আলম সামাজিক মাধ্যমে একটি প্রতীকী ঘোষণা দেন— ‘জুলাই মাস বিজয় পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হলো। আজ ৩২ জুলাই, আগামীকাল ৩৩ জুলাই… মুক্তির ক্যালেন্ডার শেষ হবে বিজয়ের দিন।’

ঘোষণাটি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক আন্দোলনকারী এটিকে গ্রহণ করেন এবং ‘৩২ জুলাই’, ‘৩৩ জুলাই’, ‘৩৪ জুলাই’, ‘৩৫ জুলাই’ ও ‘৩৬ জুলাই’  ব্যবহার করতে শুরু করেন। পরে আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিও এই প্রতীকী তারিখ অনুসারে প্রচারিত হয়। “জুলাই শেষ হবে না’ স্লোগানটি আন্দোলনের মনস্তাত্ত্বিক শক্তির অংশে পরিণত হয়।

উইকিপিডিয়ার বর্ণনা

বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ায় “36 July” শিরোনামে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বাংলাদেশি জ্যেষ্ঠ আমলা ও অনলাইন কর্মী মো. শামসুল আলম ১ আগস্ট একটি ফেসবুক পোস্টে বিজয় না আসা পর্যন্ত জুলাই মাস বাড়িয়ে দেওয়ার ধারণা প্রকাশ করেন। পরে আন্দোলনকারীরা ১ আগস্টকে “৩২ জুলাই’ হিসেবে গণনা শুরু করেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৪ আগস্টকে “৩৫ জুলাই’ এবং ৫ আগস্টের ‘ঢাকা মার্চ’ কর্মসূচিকে ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে ঘোষণা করে। শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর এই দিনটি আন্দোলনের বিজয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।

উইকিপিডিয়ার বর্ণনায়-

 “Md Shamsul Alam, an exiled Bangladeshi senior bureaucrat and online activist residing in the United States, made a Facebook post on 1 August writing about the fictional extension of the month of July until the protests meet success, which translates below:
”July has been extended until victory – today is the 32nd, tomorrow is the 33rd… in this way, the calendar of liberation will end with victory!

Alam’s post became viral and protesters also agreed they were “counting down the month of July until the demands are met”, thus they counted 1 August as “32 July” The Students Against Discrimination, which led the movement, called for the non-cooperation movement from 4 August (35 July) and announced their “Long March to Dhaka” programme on 5 August (36 July). On that day, millions of people surrounded the Ganabhaban (in Alam’s language, the Bastille) and Sheikh Hasina resigned and fled to India. The success of the movement was termed by the agitators as “Second Independence” or “Rebirth Day” and the day as “36 July”.

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ‘৩৬ জুলাই’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সামাজিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Framing Theory। সমাজবিজ্ঞানী ডেভিড স্নো ও রবার্ট বেনফোর্ড দেখিয়েছেন, সফল আন্দোলন কেবল দাবি তোলে না; তারা বাস্তবতাকে নতুন ভাষায় ব্যাখ্যা করে। এই নতুন ব্যাখ্যাই মানুষের মধ্যে অভিন্ন পরিচয় ও উদ্দেশ্য সৃষ্টি করে।

‘৩৬ জুলাই’ ছিল এমনই একটি নতুন ফ্রেম। এখানে সময়কেই পুনর্ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। ক্যালেন্ডার আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিষয় ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক সংকল্পের ভাষা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Political Opportunity Structure। সিডনি ট্যারো ও ডগ ম্যাকঅ্যাডামের গবেষণা দেখায়, আন্দোলন তখনই গতি পায়, যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ক্ষমতার কাঠামো দুর্বল হচ্ছে এবং পরিবর্তনের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ‘জুলাই শেষ হবে না’-এই প্রতীকী ঘোষণা সেই বিশ্বাসকে শক্তিশালী করেছিল।

একই সঙ্গে বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের Imagined Community ধারণাও এখানে প্রাসঙ্গিক। একটি জাতি কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা দিয়ে নয়; বরং অভিন্ন স্মৃতি, প্রতীক ও কল্পনার মাধ্যমেও গড়ে ওঠে। ‘৩৬ জুলাই’ সেই অর্থে একটি যৌথ রাজনৈতিক স্মৃতির নির্মাণ।

ইতিহাসে কি এমন নজির আছে?

মানুষের প্রয়োজনে ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের ঘটনা ইতিহাসে নতুন নয়। ফরাসি বিপ্লবের পর ১৭৯৩ সালে French Revolutionary Calendar চালু করা হয়। সেখানে রাজতন্ত্রের স্মৃতি মুছে দিতে মাসের নাম, সপ্তাহের কাঠামো এবং বছরের গণনাই বদলে দেওয়া হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নে শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে বিশ শতকের ত্রিশের দশকে পাঁচ দিনের এবং পরে ছয় দিনের কর্মসপ্তাহভিত্তিক Soviet Revolutionary Calendar পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়।

উত্তর কোরিয়ায় আজও ব্যবহৃত Juche Calendar-এ বছর গণনা শুরু হয় কিম ইল-সুং-এর জন্ম সাল থেকে। তবে এসব ছিল রাষ্ট্র কর্তৃক প্রবর্তিত ক্যালেন্ডার।

july
ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশের ‘৩৬ জুলাই’ ভিন্ন প্রকৃতির। এটি কোনো রাষ্ট্র, সরকার বা আইন প্রণয়ন করেনি। এটি জন্ম নিয়েছিল একটি গণ-আন্দোলনের ভেতর থেকে—নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক প্রতীকে। এ কারণেই এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আলাদা।

বিশ্ব ইতিহাসে অবশ্য প্রতীকী তারিখের আরও নজির আছে। চীনের “May Fourth Movement”, ফ্রান্সের “May 1968”, চেকোস্লোভাকিয়ার “Prague Spring” কিংবা আরব বিশ্বের “25 January Revolution”—এসব ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট তারিখ বা মাস আন্দোলনের পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কোনো আন্দোলন বাস্তব ক্যালেন্ডারের দিনসংখ্যাকেই প্রতীকীভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে—এমন উদাহরণ অত্যন্ত বিরল।

গণভবন থেকে ‘বাস্তিল’

৫ আগস্ট লাখো মানুষ ঢাকায় সমবেত হন। আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনকে প্রতীকীভাবে ‘বাংলাদেশের বাস্তিল’ হিসেবে উল্লেখ করতে থাকেন—ফরাসি বিপ্লবের বাস্তিল দুর্গের অনুষঙ্গে। বিকেলের মধ্যে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর নিশ্চিত হলে রাজধানীজুড়ে বিজয়োল্লাস শুরু হয়। বহু মানুষের কাছে সেই মুহূর্তই ছিল ‘৩৬ জুলাই’ এর সমাপ্তি এবং নতুন সময়ের সূচনা।

ইতিহাসে ‘৩৬ জুলাই’ এর স্থান

কোনো সমাজে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় নতুন প্রতীক জন্ম নেয়। কখনও নতুন পতাকা, কখনও নতুন গান, কখনও নতুন স্লোগান। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ‘৩৬ জুলাই’ সেই ধরনের একটি প্রতীক।

এটি ইতিহাসের দৃষ্টিতে ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; বরং রাজনৈতিক সময়ের পুনর্নির্মাণ। এটি দেখিয়েছে, মানুষের সম্মিলিত কল্পনা কখনও কখনও ঘড়ি ও ক্যালেন্ডারের সীমাকেও অতিক্রম করতে পারে।

সম্ভবত এ কারণেই ‘৩৬ জুলাই’ কেবল একটি কাল্পনিক তারিখ নয়; এটি একটি মানসিক অবস্থা, একটি রাজনৈতিক ভাষা এবং একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি—যেখানে বিজয় না আসা পর্যন্ত সময়ও যেন থেমে থাকতে অস্বীকার করেছিল।

এমআর