নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৮ পিএম
শ্রমিক সংগঠন সমূহের জোট সম্মিলিত শ্রমিক পরিষদ (এসএসপি) আয়োজিত "সম্মিলিত শ্রমিক পরিষদ ও ছাত্র শ্রমিক জনতার গণঅভ্যুত্থান" শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি একথা বলেন।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন সম্মিলিত শ্রমিক পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক বাচ্চু ভূঁইয়া। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন পরিষদের নির্বাহী সমন্বয়ক সোহেল শিকদার।
অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি বলেন, ‘সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য হিসেবে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। তবে যেসব দাবি সরকারিভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না, সেগুলো আন্দোলনের মাধ্যমেই আদায় করে নিতে হবে।’
শিমুল বিশ্বাস বলেন, ‘এখন বাংলাদেশের গুরুত্ব দুনিয়ার কাছে বেড়ে গেছে। এ সময়ে ২০ কোটি মানুষের এই দেশে সাড়ে সাত কোটি শ্রমিক। এই শ্রমিক শ্রেণিই বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগামীতে দিকনির্দেশনা দেবে। আমি গল্প আকারে উন্মাদনা তৈরি করার জন্য বলছি না। আমি প্রত্যেকটা ইনফরমেশনটা আমার পক্ষে যতটুকু গ্রহণযোগ্য, আমাদের করা বিবেচনা হয়, মিথ্যে তথ্যের উপরে কোনো নির্মাণ হয় না। সঠিক তথ্যের ওপরেই একটা শক্তিশালী সৌধ নির্মিত হবে।’
বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কথা তুলে ধরে শিমুল বিশ্বাস বলেন, এশিয়ায় এখন ৮০ ভাগ জ্বালানির চাহিদা রয়েছে। প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক কারণে জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা এখন এশিয়ায়। এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগর গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়ে হয়ে উঠছে। ফলে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি বন্ধুত্ব করতে চায় সোভিয়েত রাশিয়া, চীন, আমেরিকা ও ইউরোপ। মুসলিম বিশ্বের ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবসহ সবাই পৃথকভাবে এই ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চায়।
শিমুল বিশ্বাস বলেন, ‘আপনার পণ্য যখন আপনি হাটে নিয়ে যান, কেউ দাম না করলে ফেলে আসতে হয়। যখন আপনার পণ্যের দাম করে, তখন আপনার বার্গেনিং ক্যাপাসিটি বেড়ে যায়। বাংলাদেশের এখন গুরুত্ব দুনিয়ার কাছে বেড়ে গেছে।’
শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই সরকারের কাছ থেকে আমরা কতটুকু দাবি আদায় করতে পারব, যেটুকু পারব সেটুকু আলহামদুলিল্লাহ। যেটুকু পারব না, সেটুকু আদায়ের জন্য লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হলে আমরা লড়াই করে আদায় করতে পারব।’
শ্রমিকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আট ঘণ্টা পরিশ্রম করে বাংলাদেশের কুলি-মজুর আর শ্রমিকের সংসার চলে না। ১৬ ঘণ্টা, ১৮ ঘণ্টা কাজ করে। এমনকি যারা শিক্ষিত পেশাজীবী, সাংবাদিক ভাইয়েরাও আট ঘণ্টা না, অনেক বেশি পরিশ্রম করেন। এই পরিশ্রমে সম্মিলিত একটা ফল কি আমরা দেখতে পাই? আমরা দেখতে পাই না।’
নিজের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে শিমুল বিশ্বাস বলেন, তার জীবনের সাড়ে তিন বছর ফ্যাসিবাদের কারাগারে কেটেছে। ৪৬ দিন একটানা পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ ও যৌথ বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যেও তিনি শ্রমিক, গণতন্ত্র ও জনগণের পক্ষে কথা বলার সাহস নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘এখন আমি জাতীয় সংসদের সদস্য, একটা দল কর্তৃক মনোনীত। কিন্তু এখনো পর্যন্ত আমার মুখ থেকে যা কথা বের হয়, তার ৮০ ভাগ বাংলাদেশের ভাগ্যহত শ্রমিক শ্রেণির পক্ষে।’
শিমুল বিশ্বাস বলেন, কোনো ব্যক্তিগত লাভের জন্য তাঁরা কাজ করছেন না। একজন নেতার কাজ হচ্ছে বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। বাংলাদেশের সব শ্রমিক শ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। লেফট-রাইট সবাই আমরা এখানে আছি। সবাইকে আমরা ধারণ করব এবং দেশকে গণতন্ত্রায়নের পক্ষে, শোষণের যন্ত্রণার বিরুদ্ধে, আমাদের অধিকার, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল শক্তি বাংলাদেশের শ্রমিক—তাদের নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে প্রভু-দাস সম্পর্কের পরিবর্তে পারস্পরিক মর্যাদা ও সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের নেত্রী তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত আইন গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।’
এ সময় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এএএম ফয়েজ হোসেন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক জোটের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মোশারেফ হোসেন মন্টু, ইসলামী শ্রমিক আন্দোলনের সহসভাপতি হারুন অর রশিদ, শ্রমিক অধিকার পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক আল ইমরান, শ্রমিক মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রভাষক মোহাম্মদ আব্দুল করিম, সাধারণ সম্পাদক এইচ এম এরশাদ, বিপ্লবী শ্রমিক সংহতির সাধারণ সম্পাদক মীর মোফাজ্জল হোসেন মোশতাক, শ্রমিক মুক্তি কাউন্সিলের আহ্বায়ক সোহেল রানা সম্পদ, ঢাকা জেলা সিএনজি, অটোরিকশা ও মিশুক চালক শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন দুলাল, ঢাকা মেট্রোপলিটন অটোটেম্পো ও অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল জব্বার মিয়া, প্রবাসী কল্যাণ পরিষদের সভাপতি নেক মোহাম্মদ, সাধারণ সম্পাদক শাহাবুদ্দিন আহমেদ, ভাসানী শ্রমিক পার্টির সভাপতি বাবুল বিশ্বাস, ড্রাইভার্স ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সভাপতি মোহাম্মদ বাদল আহমেদ এবং চামড়া শিল্প জোটের সভাপতি আবুল হোসেনসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।
এম/এমআই