Dhaka Mail Logo

জাতীয়

পুলিশে আবারও বাধ্যতামূলক অবসরের আতঙ্ক

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

৩০ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৮ পিএম

  • সম্প্রতি ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর, আরও অনেকে তালিকায়—গুঞ্জন
  • বেশি উদ্বেগ ও অস্বস্তি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে

পুলিশে আবারও আতঙ্কের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ ও অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে হঠাৎ অবসরে পাঠানো এবং বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।

সাধারণত চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকারি চাকরিজীবীরা স্বাভাবিক নিয়মে অবসরে যান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সামনে আরও কর্মকর্তাকে একই প্রক্রিয়ায় অবসরে পাঠানো হতে পারে।

গত বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তিনজন ডিআইজিসহ ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। এ ঘটনার পর পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে আতঙ্ক ও অস্বস্তি বিরাজ করছে। যদিও এ বিষয়ে কর্মকর্তাদের কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না।

আরও পড়নু:

পুলিশের বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের ১৪১ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সামনে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে গুঞ্জন রয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে বর্তমানে ১১৭ জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের মধ্য থেকে সম্প্রতি ১৭ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন তিনজন ডিআইজি, ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি এবং পুলিশ সুপার পদমর্যাদার দুজন কর্মকর্তা।

তিনজন ডিআইজি হলেন হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মো. আবদুল্লাহীল বাকী, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি সারদার ডিআইজি মো. ওয়ালিদ হোসেন এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিআইজি সানা শামীনুর রহমান।

বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো অতিরিক্ত ডিআইজিরা হলেন সিআইডির মো. সরোয়ার হোসেন ও রেবেকা সুলতানা, ট্যুরিস্ট পুলিশের বিধান ত্রিপুরা ও সুলতানা নাজমা হোসেন, পুলিশ স্টাফ কলেজের এ কে এম ইকবাল হোসেন, এপিবিএনের সহেলী ফেরদৌস, সারদার বিপিএর মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ, পুলিশ টেলিকমের হাসিনা রহমান, পুলিশ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের ফয়সল মাহমুদ, পুলিশ অধিদপ্তরের কানিজ ফাতেমা, নৌপুলিশের জেসমিন বেগম এবং ডিএমপির অতিরিক্ত ডিআইজি মোছা. ফরিদা ইয়াসমিন। তালিকায় আরও ছিলেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার মো. হাবিবুর রহমান এবং টিডিএস পুলিশের পুলিশ সুপার আবদুর রহিম শাহ চৌধুরী।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে ১৭ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর কথা জানানো হয়। সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী জনস্বার্থে তাঁদের চাকরি থেকে অবসর দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন:

পুলিশের বিভিন্ন সূত্র বলছে, শুধু এই ১৭ জনই নন, এর আগেও বেশ কিছুদিন ধরে পুলিশ কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। চলতি বছর এ সংখ্যা বাড়ছে। এখন মাসে ধাপে ধাপে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে একই বিধানের আওতায় অবসরে পাঠানো হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও এভাবে অনেক সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের অনেকেই সব দিক থেকে যোগ্য ছিলেন। কিন্তু দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকায় তাঁদের চাকরিতে রাখা হয়নি। পরে যাঁরা পুলিশে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এসেছিলেন, তাঁদের একটি অংশের কর্মকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশ পুলিশ বিতর্কিত হয়েছে।

ওই কর্মকর্তারা আরও বলেন, চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর স্বাভাবিক নিয়মে অবসরে যাওয়া এবং বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়ার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। বাধ্যতামূলক অবসরের কারণে একজন পুলিশ কর্মকর্তার সারাজীবনের অর্জন অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। পরিবার ও স্বজনদের কাছেও সরকার কেন তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছে, তা ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

police

তাঁদের মতে, বাধ্যতামূলক অবসরের বিধান সরকারি চাকরিতে স্বীকৃত একটি ব্যবস্থা। তবে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে এভাবে অবসরে পাঠানোর সংখ্যা বাড়তে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হবে। এখন অনেক কর্মকর্তা ভয়ে আছেন, নতুন সরকার তাঁদেরও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় কি না।

ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত জুলাইয়ের পর বাংলাদেশ পুলিশ যে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এরপরও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে একের পর এক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর খবর তাঁদের কাজের গতিকে মন্থর করে দিচ্ছে।

ওই কর্মকর্তারা বলেন, পুলিশ আগের তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনায় কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

হঠাৎ করে ১৭ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর কারণ জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, অধিকাংশ কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সরকারের অনুগত ছিলেন। তাঁরা ২০১৮ সালের নির্বাচনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও অপকর্মের অভিযোগও রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আরও বলেন, গত দুই বছরে যাঁদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, তাঁদের কেউ কেউ হত্যা, গুম, মিথ্যা মামলা দিয়ে বিরোধী মতের লোকজনকে হয়রানি এবং রাজনৈতিক কর্মীদের নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে তাঁরা আলোচিত ছিলেন। পুলিশের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতেই তাঁদের বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক অবসরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি চাকরিতে ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার কাউকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাতে পারে। তবে এভাবে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সংখ্যা বাড়তে থাকলে তা পুলিশের মধ্যে আশঙ্কার জন্ম দেবে। এতে কর্মকর্তারা স্বাধীনভাবে ও মন খুলে কাজ করতে পারবেন না। দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব পুলিশের সার্বিক কার্যক্রমেও পড়তে পারে।

এ বিষয়ে জানতে পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কেউ কথা বলতে রাজি হননি।

এমআইকে/এআর