নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ জুলাই ২০২৬, ১১:০২ এএম
জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভা ও ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)। এ সময় বক্তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বৈষম্যহীন, ফ্যাসিবাদবিরোধী বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বুধবার (২৯ জুলাই) বিএমইউর শহীদ ডা. মিলন হলে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে বিএমইউ ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ‘মহীয়সী নারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কোনো কঠিন সময়েই নতজানু হননি, আপোষ করেননি। চরম নির্যাতনের সময়ও তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা।
তিনি মৃত্যুর আগে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন দেখে গেছেন, যা একটি বড় প্রাপ্তি। দেশনেত্রীর মেডিকেল বোর্ডের প্রধান চিকিৎসক হিসেবে তার সংস্পর্শে থাকার সুযোগ আমার হয়েছে। বিগত ১৭ বছরে জিয়া পরিবার যে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তা আমি কাছ থেকে দেখেছি।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন আমাদের শিক্ষা দেয়, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদী আচরণ করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। যারা দৃশ্যমান অন্যায় করেছে তারা যেন বর্তমানে কোনো সুযোগ-সুবিধা না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যায়কারীদের শাস্তি পেতেই হবে। জুলাই চেতনাকে ধারণ করে বৈষম্য, ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হবে। বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেভাবে দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তা জনগণকে আশান্বিত করেছে।’
প্রো-ভিসি (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার নির্যাতনকে শৈল্পিক রূপ দিয়েছিল। বর্তমানে তারা আবার তর্জন-গর্জন করছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, এটি দেশের সব মানুষের আন্দোলন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বেগম খালেদা জিয়ার আন্দোলন-সংগ্রাম ও ত্যাগ ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সুখী, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ওয়াসীমের বাবা শফিউল আলম তার ছেলের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘জুলাই শহীদদের দেশের মানুষ আবেগ দিয়ে ভালোবাসেন। তাদের আত্মত্যাগের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সততা, মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার অনৈতিক প্রথার অবসান ঘটাতে হবে।’
আহত জুলাই যোদ্ধার বাবা অধ্যাপক ডা. জাকারিয়া আজিজ বলেন, ‘যখন শুনেছি আমার সন্তানের গুলি লেগেছে, বাবা হিসেবে সেই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আহত জুলাই যোদ্ধারা চান, যারা দেশ পরিচালনা করছেন তারা যেন দেশপ্রেম নিয়ে দেশ পরিচালনা করেন। প্রকৃত জুলাই যোদ্ধাদের সঠিক তালিকা করতে হবে এবং দেশবিরোধী সব আইন ও চুক্তি বাতিল করতে হবে।’
প্রো-ভিসি (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, ‘বিগত সময়ে দেশ ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হাসপাতালের জরুরি বিভাগেও আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশকে ফ্যাসিবাদের যাঁতাকল থেকে মুক্তি দিয়েছে। আমাদের অসত্য ও অন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপোষ করা যাবে না।’
প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘গত ১৭ বছরের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। জুলাই শহীদদের যথাযথ সম্মান জানাতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে নিজ নিজ দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে।’
কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার বলেন, ‘ভেদাভেদ ভুলে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে হবে এবং জুলাই চেতনাকে ধারণ করে স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে।’
ডেন্টাল ফ্যাকাল্টির ডিন অধ্যাপক ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সময় আমি নিজেও কারাগারে ছিলাম। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট মুক্তি পাই। বিগত সরকারের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও নৃশংসতা ভোলার নয়।’
রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা কামাল বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার দেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। জুলাই গণমানুষের অনুভূতির বিষয়। জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।’
আলোচনা সভার শুরুতে বিএমইউর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মুফতী আব্দুল আহাদ পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন। পরে জুলাই শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। শহীদ ওয়াসীমের বাবা শফিউল আলম এবং আহত জুলাই যোদ্ধার বাবা অধ্যাপক ডা. জাকারিয়া আজিজকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানের শেষে জুলাই শহীদদের রুহের মাগফিরাত এবং দেশ ও জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধি কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে বিএমইউর বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, শিক্ষক, চিকিৎসক, রেসিডেন্ট, কর্মকর্তা-কর্মচারী, নার্স ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
এসএইচ/এআরএম