Dhaka Mail Logo

জাতীয়

‘খাল-নদীপথের টেকসই উন্নয়ন ছাড়া নৌবাণিজ্যের প্রসার সম্ভব নয়’

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৯ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম

দেশের অভ্যন্তরীণ নৌবাণিজ্য সম্প্রসারণ, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে খাল ও নদীপথের টেকসই উন্নয়ন এবং আন্তঃসংযুক্ত নৌপথ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। একই সঙ্গে খাল খনন কর্মসূচির ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, নদী দখল ও দূষণ রোধ, নিয়মিত ড্রেজিং এবং সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেন বক্তারা।

বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশের বৃত্তাকার নৌপথের পুনরুজ্জীবন এবং অভ্যন্তরীণ নৌবাণিজ্য সম্প্রসারণে খাল খনন কর্মসূচির ভূমিকা শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পানি সম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, রাজধানীর চারপাশের খালগুলো একসময় নগরজীবনের প্রাণ ছিল। কিন্তু দখল ও দূষণের কারণে সেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে বর্তমান সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।

তিনি বলেন, শুধু খাল খনন করলেই হবে না, দেশের সব খালকে আন্তঃসংযুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে খননের পর সেগুলো সংরক্ষণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও চলমান রয়েছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, খাল ও নদী খননের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। শিল্পকারখানার বর্জ্য যাতে নদীতে না পড়ে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। বিশেষ করে ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কম খরচে বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপনে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে সরকার কাজ করছে। এ ছাড়া পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তির বিকল্প নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশের ১ হাজার ৪১৫টির বেশি নদীর মধ্যে দীর্ঘদিনের অবহেলা, দখল ও পলি জমার কারণে ৫৫ শতাংশেরও বেশি নদী ও খাল কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে দেশের ৭৭ শতাংশ পণ্য পরিবহন এখন সড়কপথনির্ভর, যা ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর।

তিনি বলেন, সড়কপথের তুলনায় নৌপথে পণ্য পরিবহনে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় কম হয় এবং ৪ থেকে ৬ গুণ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। তাই খাল খনন কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তাসকীন আহমেদ রাজধানীর চারপাশের চারটি নদীর ১১২ কিলোমিটার নৌপথকে সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আনার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এতে যানজট কমবে, নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের বিকাশ ঘটবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

তিনি আরও বলেন, নদী দখলমুক্ত করা, নিয়মিত ড্রেজিং, নৌপথে কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নদীসংলগ্ন এলাকায় কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়াতে হবে।

সেমিনারের আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে নিচু কালভার্ট ও সেতু নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি নদী ব্যবস্থাপনায় একাধিক সংস্থার পরিবর্তে কার্যকর একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ গঠনের আহ্বান জানান তিনি।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবেদ হোসেন বলেন, নদী উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয়ের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব ও কাজের পরিধি স্পষ্ট করা জরুরি।

ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের সিনিয়র স্পেশালিস্ট মো. তানিম সারওয়ার বলেন, নদী দখল ও পলি জমার কারণে নাব্যতা দ্রুত কমছে। এ সমস্যা সমাধানে জিআইএসসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নদীর সীমানা নির্ধারণ ও পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমগীর, স্থাপত্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির, সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক মো. মোতালেব হোসেন সরকার, আল্টাফুয়েল ড্রেজিং অ্যান্ড মেরিন সার্ভিসেসের চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন শওকত ইকবালসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

সেমিনারে ডিসিসিআইর ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মন, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এমআর/এআর