নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ জুলাই ২০২৬, ০১:৩০ পিএম
অন্তর্বর্তী সরকারের পাঁচ মাস পার হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজনরা। তারা বলেছেন, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নকে আর দীর্ঘসূত্রতায় ফেলে রাখা যাবে না। এজন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ একটি রোডম্যাপ ঘোষণা, সব পক্ষকে সম্পৃক্ত করে আস্থা তৈরির উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার বাস্তব প্রতিফলন প্রয়োজন।
বুধবার (২৯ জুলাই) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের আয়োজনে 'সরকারের ৫ মাস: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন অগ্রগতির মূল্যায়ন' শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। মব সহিংসতা, মাজারে হামলা এবং পার্বত্য অঞ্চলে জাতিগত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতার ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; এগুলো একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ।
তিনি বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের এত বছর পরও পাহাড়ে কাঙ্ক্ষিত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ভূমির অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
সাইফুল হক বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের জনসংখ্যার কাঠামো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দুই থেকে তিন দশকের মধ্যে আদিবাসী জাতিসত্তাগুলো নিজ ভূখণ্ডেই আরও গভীর সংখ্যালঘুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালি জনগোষ্ঠীকেও সমাধান প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা যাবে না। তাদের সম্পৃক্ত না করে কোনো দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়।’
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে একটি জাতীয় কমিশন গঠন করা উচিত। সেখানে পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিসত্তা, বাঙালি জনগোষ্ঠী, নাগরিক সমাজ, গবেষক, রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে বাস্তবতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে টেকসই সমাধানের রূপরেখা তৈরি করতে হবে।’
রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা কম। ফলে এ সংকট ভবিষ্যতে পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা, জনসংখ্যা ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে চুক্তি বাস্তবায়নের রেকর্ড খুব আশাব্যঞ্জক নয়। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামাজিক চুক্তি সংবিধানের অনেক অঙ্গীকারই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তাই পার্বত্য শান্তি চুক্তির ক্ষেত্রেও প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহারে বহুত্ববাদী সমাজ গঠন, পরিচয়ের বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান এবং পার্বত্য অঞ্চলে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার রয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা।
'আদিবাসী' পরিচয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মৌলিক নীতি অনুযায়ী কোনো জনগোষ্ঠী নিজেদের যে পরিচয়ে পরিচিত হতে চায়, সেই আত্মপরিচয়ের অধিকার তাদের রয়েছে। অতীতে "বাংলাদেশে আদিবাসী নেই"—এই সরকারি অবস্থান পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।’
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের অর্থ চুক্তি বাতিল নয়; বরং কোথায় অগ্রগতি হয়েছে, কোথায় হয়নি এবং কীভাবে কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব, তা বাস্তবতার আলোকে পর্যালোচনা করা।’
তিনি বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কোনো একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি জাতীয় দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সেনাবাহিনী, পার্বত্য অঞ্চলের জনগণ এবং নাগরিক সমাজ—সব পক্ষকে আস্থা তৈরির ভিত্তিতে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে হবে।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অধিকার কেবল পাহাড়ের মানুষের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন। তাই ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও রোডম্যাপ ঘোষণা করে কার্যকর অগ্রগতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
মতবিনিময় সভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন। এ সময় অন্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন প্রমুখ।
এমএইচ/এমআই