নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ জুলাই ২০২৬, ০৫:২২ পিএম
বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্থূলতা ও কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও ট্রান্সফ্যাটের উপস্থিতি এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। কিন্তু প্যাকেটের পেছনে ছোট অক্ষরে লেখা জটিল পুষ্টি তথ্য সাধারণ ভোক্তার পক্ষে বোঝা কঠিন হওয়ায় স্বাস্থ্যকর খাদ্য নির্বাচনেও বাধা তৈরি হচ্ছে। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় খাদ্যপণ্যের সামনের অংশে সহজ ও স্পষ্ট সতর্কতামূলক লেবেলিং বা ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) দ্রুত বাধ্যতামূলক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের উদ্যোগে আয়োজিত 'বাংলাদেশে প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে লেবেলিং (এফওপিএল) বিষয়ক গণমাধ্যম প্রচারাভিযান' শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
কর্মশালায় জানানো হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্থূলতা ও কিডনি রোগের মতো প্রতিরোধযোগ্য অসংক্রামক রোগে ঘটে। এসব রোগের অন্যতম কারণ হিসেবে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও ক্ষতিকর ট্রান্সফ্যাটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারকে দায়ী করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, সাধারণ মানুষ যাতে কয়েক সেকেন্ডেই খাদ্যপণ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন, সে জন্য প্যাকেটের সামনের অংশে স্পষ্ট সতর্কতামূলক লেবেল থাকা প্রয়োজন।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ স্বাগত বক্তব্য রাখেন । তিনি বলেন, খাদ্যে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও চর্বির উপস্থিতি নীরবে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শিশু ও তরুণদের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে এফওপিএল নীতিমালার কোনো বিকল্প নেই। তিনি জানান, সরকার এফওপিএল বিষয়ক প্রবিধানমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং এতে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বাংলাদেশে একটি সহজ ও বাধ্যতামূলক এফওপিএল নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নিরাপদ খাদ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতিক ইজাজ বলেন, মানুষ না জেনেই প্রতিদিন বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্য কিনছে, যা পরিবার ও শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। জনসচেতনতা বাড়ানো এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নীতিনির্ধারকদের ওপর ইতিবাচক চাপ তৈরি করতে সাংবাদিকদের ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের প্রয়োজন রয়েছে।
আরও পড়ুন: বন্যার্তদের পাশে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন
বারডেম জেনারেল হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ সামসুন নাহার মহুয়া বলেন, শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি আসক্তি বাড়ছে, যা অল্প বয়সেই স্থূলতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করছে। প্যাকেটের সামনের সহজ সতর্কতামূলক সংকেত ভোক্তাদের স্বাস্থ্যকর খাদ্য বেছে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাভিশনের সিনিয়র নিউজ এডিটর আবু রুশদ মো. রুহুল আমিন বলেন, এফওপিএল এমন একটি সহজ ও স্পষ্ট লেবেলিং ব্যবস্থা, যা খাদ্যপণ্যের সামনের অংশেই অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা ক্ষতিকর উপাদান সম্পর্কে ক্রেতাকে দ্রুত সতর্ক করে। তিনি বলেন, চিলি ও মেক্সিকোর মতো বিভিন্ন দেশে বাধ্যতামূলক এফওপিএল চালুর ফলে ভোক্তাদের সচেতনতা যেমন বেড়েছে, তেমনি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত হয়েছে।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, জনস্বাস্থ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিভ্রান্তি দূর করে নীতি বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
কর্মশালার শেষাংশে অংশগ্রহণকারীরা একমত হন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার, খাদ্য শিল্প, গবেষক, ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) নীতি দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি এ বিষয়ে গণসচেতনতা বাড়াতে ধারাবাহিক সংবাদ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশেরও অঙ্গীকার করেন কর্মশালায় অংশ নেওয়া সাংবাদিকরা।
এএইচ/এমআই