Dhaka Mail Logo

জাতীয়

ময়লার ব্যবসা থেকে ফুটপাত দখল, ‘মাফিয়াতন্ত্র’ ভাঙতে ৭ দফা প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৮ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম

ময়লার ব্যবসা, ফুটপাত দখল, খাল-জলাশয় ও সরকারি জমি দখলকে কেন্দ্র করে নগরজুড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ অর্থনীতি ও ‘মাফিয়াতন্ত্র’ ভাঙতে সাত দফা প্রস্তাব দিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। 

সংস্থাটি বলছে, নগরসেবাকে ঘিরে গড়ে ওঠা অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের যোগসূত্র ভাঙতে না পারলে সংঘাত, সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা অব্যাহত থাকবে।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে আইপিডি এ আহ্বান জানায়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকার কাফরুলে ময়লার ব্যবসা, ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড গভীর উদ্বেগের বিষয়। এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, নগরের বিভিন্ন সেবা খাতে অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিপজ্জনক যোগসূত্র এখনো বহাল রয়েছে। 

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যেও এ ঘটনার পেছনে নগরসেবাকেন্দ্রিক অবৈধ অর্থনীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্থানীয় আধিপত্যের বিষয় উঠে এসেছে।

আইপিডির মতে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে নগরভিত্তিক অবৈধ অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, কাফরুলের ঘটনাটি তারই বহিঃপ্রকাশ।

সংস্থাটি বলছে, দেশের রাজনীতিতে এখনো এমন একটি সংস্কৃতি বিদ্যমান, যেখানে দলীয় পদ-পদবি ও রাজনৈতিক পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে জনসেবার পরিবর্তে অবৈধ অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির অবসান হবে বলে মানুষের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ময়লা সংগ্রহ, ফুটপাত, বাজার, পরিবহন, মাঠ-পার্ক, খাল-জলাশয় ও সরকারি জমি দখলকে কেন্দ্র করে একটি সমান্তরাল অবৈধ অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। এই অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বলয়ের ভেতরেও সংঘাত, সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে।

ময়লা ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে আইপিডি জানায়, নাগরিকরা নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করার পরও তাদের কাছ থেকে আলাদাভাবে ময়লা অপসারণের জন্য অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নবিদ্ধ। বিষয়টি নিয়ে আদালতেও রিট হয়েছে। এই অস্বচ্ছ ব্যবস্থার কারণে চাঁদাবাজি ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অথচ সিটি করপোরেশন চাইলে আধুনিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের অবসান ঘটাতে পারে।

সংস্থাটি আরও বলেছে, ফুটপাত, সরকারি জমি, খাল, জলাশয়, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান দখল করে একটি শক্তিশালী নগর মাফিয়াতন্ত্র গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশিশক্তির কারণে এসব দখলদারিত্ব বছরের পর বছর টিকে থাকায় নাগরিকদের চলাচল, পরিবেশ ও জীবনমান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আইপিডির মতে, দীর্ঘ সময় ধরে সিটি করপোরেশনগুলোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতি এবং প্রশাসকদের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন পরিচালিত হওয়ায় জবাবদিহিতা দুর্বল হয়েছে। এতে অবৈধ গোষ্ঠীগুলো আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকার ছাড়া নগর ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

এ অবস্থায় সংস্থাটি সরকারের প্রতি সাতটি সুপারিশ তুলে ধরে। এগুলো হলো, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া; রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে সংস্কারের মাধ্যমে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত সদস্যদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; ময়লা সংগ্রহ সম্পূর্ণভাবে সিটি করপোরেশনের আওতায় এনে অতিরিক্ত ফি আদায় বন্ধ করা; ফুটপাত, সরকারি জমি, খাল, জলাশয় ও পার্ক দখলমুক্ত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা; নগরসেবাভিত্তিক সব ইজারা ও আর্থিক লেনদেনে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে ডিজিটাল নজরদারি চালু করা; দ্রুত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং নগর ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান অবৈধ অর্থনীতি নির্মূলে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।

আইপিডি বলেছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে দখলদারিত্বের পালাবদলের সংস্কৃতি বন্ধ না হলে একটি নিরাপদ, সুশাসিত ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। নগরসেবাকে ঘিরে গড়ে ওঠা অবৈধ অর্থনীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অবসানে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, কার্যকর স্থানীয় সরকার, স্বচ্ছ নগর ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিকল্প নেই।

এএইচ/এআরএম