বোরহান উদ্দিন
২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৮ এএম
# বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে ৩২ ডিসিকে
# ২৫ বছরের আইনি ধারায় অ্যাকশন
# ডিসি, পিএস ও গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের নথি যাচাই
# ২০১৮ সালের নির্বাচনের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে
# ব্যবস্থা নেওয়ার পেছনে আছে প্রশাসনে বঞ্চিতদের ক্ষোভ ও রাজনৈতিক চাপ
# পর্যায়ক্রমে আরও কর্মকর্তার অবসরের সম্ভাবনা
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিগত সময়ে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা ও দলীয়করণের অভিযোগে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। পদচ্যুতি ও বাধ্যতামূলক অবসরের তালিকায় পুলিশের অনেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা যুক্ত হলেও সিভিল প্রশাসনে এতদিন ছিল অনেকটা নীরবতা। শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা পদ হারালেও যুগ্ম সচিব পদমর্যাদা পর্যন্ত বড় একটি অংশের কর্মকর্তারা ওএসডি অবস্থায় স্তস্তিতেই ছিলেন। তবে এবার সেই নীরবতা ভেঙে প্রশাসনের অভ্যন্তরে বড় ধরনের পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছে সরকার।
২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) চেয়ারে বসে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী সময়ে আন্দোলন দমনে ভূমিকা রাখার দায়ে বিসিএস ২০তম ব্যাচের ৩২ সাবেক ডিসিকে একযোগে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, যাদের ‘দিনের ভোট রাতে করার’ নেপথ্যের কারিগর বলে আখ্যা দিয়েছিলেন ওই সময়ের সরকারবিরোধীরা।
আরও পড়ুন: বাধ্যতামূলক অবসরে ‘রাতের ভোটের’ ৩২ ডিসি
সোমবার (২৭ জুলাই) রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে বর্তমানে যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার এসব কর্মকর্তার অবসর কার্যকর করা হয়।
অবশ্য এর আগেও বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করার অভিযোগ থাকা সাবেক ২২ ডিসিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল।
আরও কর্মকর্তার তালিকা পর্যালোচনায়
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আমলাতন্ত্রে শুদ্ধি অভিযানের এই ধাক্কা এখানেই শেষ হচ্ছে না। আরও কয়েকটি ব্যাচের কর্মকর্তাদের নথি পর্যালোচনা শেষ পর্যায়ে। বিসিএস ২১, ২২, ২৪ ও ২৫তম ব্যাচের অতি-উৎসাহী এসব কর্মকর্তাদের তালিকা এখন সরকারের টেবিলে। এসব কর্মকর্তার চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে অবসরে পাঠানো হবে।
রাজনৈতিক চাপ ও বঞ্চনার খেসারত
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনামলে পদোন্নতি ও পদায়নে বিএনপি-জামায়াতপন্থী ও দল নিরপেক্ষ অনেক কর্মকর্তা চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন। অন্যদিকে, অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাসহ অনেকে ওই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দায়িত্ব পেয়ে প্রশাসনে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।
জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অভিযোগ এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে প্রশাসনে পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই বঞ্চিত কর্মকর্তারা বিভিন্নভাবে দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তারা সচিবালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে বিক্ষোভ, স্মারকলিপি ও আবেদনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের অনুগত কর্মকর্তাদের বরখাস্ত ও অবসরে পাঠানোর জোর দাবি জানান। তাদের ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অব্যাহত চাপের মুখে অবশেষে অ্যাকশনে যেতে বাধ্য হলো সরকার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার চেয়ারে বসে যারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করেছিলেন, তাদের প্রশাসনে বহাল রাখা নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও অসন্তোষ ছিল। সেই চতুর্মুখী চাপের মুখে কঠোর সিদ্ধান্তে যেতে বাধ্য হয়েছে সরকার।
২৫ বছরের আইনি ফাঁদে বিদায়
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিসিএস ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ২০০১ সালের ৩১ মে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। গত ৩০ মে তাদের চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হয়।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার জনস্বার্থে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাতে পারে। এই আইনি ক্ষমতার ভিত্তিতেই ওএসডিতে থাকা ৩২ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অবসরে পাঠানো হলো সাবেক যে ৩২ ডিসিকে
গতকাল সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া এসব কর্মকর্তা ২০১৮ সালের নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট জেলায় ডিসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
অবসরে পাঠানো এসব কর্মকর্তা সাবেক জেলা প্রশাসক হিসেবে যেখানে ছিলেন সেই জেলাসহ তালিকা দেওয়া হলো- চাঁদপুরের মো. মাজেদুর রহমান খান, পটুয়াখালীর মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী, কুড়িগ্রামের মোছা. সুলতানা পারভীন, কিশোরগঞ্জের মো. সারওয়ার মোর্শেদ চৌধুরী, খাগড়াছড়ির মো. শহীদুল ইসলাম, খুলনার মো. হেলাল হোসেন, বান্দরবানের মোহাম্মদ দাউদুল ইসলাম, বরিশালের এস এম অজিয়র রহমান, চুয়াডাঙ্গার গোপাল চন্দ্র দাশ, শরীয়তপুরের কাজী আবু তাহের, রাজশাহীর এস এম আব্দুল কাদের, কুমিল্লার আবুল ফজল মীর, শেরপুরের আনারকলি মাহবুব, নরসিংদীর সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন।
আরও পড়ুন: ৯৩ শিক্ষানবিশ এএসপিকে বদলি
আরও আছেন ময়মনসিংহের সাবেক ডিসি মো. মিজানুর রহমান, নেত্রকোনার মঈনউল ইসলাম, সুনামগঞ্জের মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ, হবিগঞ্জের মাহমুদুল কবির মুরাদ, রাঙামাটির এ কে এম মামুনুর রশিদ, ফেনীর ওয়াহেদুজ্জামান, কক্সবাজারের মো. কামাল হোসেন, ঝিনাইদহের সরোজ কুমার নাথ, ভোলার মোহাম্মদ মাসুদ আলম ছিদ্দিক, নীলফামারীর নাজিয়া শিরিন, কুষ্টিয়ার মো. আসলাম হোসেন, নাটোরের শাহ রিয়াজ, পাবনার মো. জসিম উদ্দিন, মানিকগঞ্জের এস এম ফেরদৌস, লক্ষ্মীপুরের অঞ্জন চন্দ্র পাল এবং চট্টগ্রামের মোহাম্মদ, ইলিয়াস হোসেন, রাজশাহীর আলী আকবর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের এ জেড এম নুরুল হক।
‘রেড জোনে’ আরও ৪ ব্যাচের আমলা
প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, পুলিশের পর এবার সিভিল প্রশাসনেও চিরুনি অভিযান শুরু হয়েছে। বিসিএস ২১, ২২, ২৪ ও ২৫তম ব্যাচের যেসব ডিসি, বিভিন্ন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পিএস, কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বে থেকে সাবেক সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন, তাদের নথি পর্যালোচনা শেষ পর্যায়ে। এই চার ব্যাচের কর্মকর্তাদের সার্ভিস ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া মাত্রই একইভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হতে পারে। এর আগে একই প্রক্রিয়ায় ২০১৮ সালের নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পালনকারী ৩৩ জন পুলিশ সুপার (এসপি) এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী ২২ জন সাবেক ডিসিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল।
বিইউ/এমআর