একে সালমান
১৯ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম
আকাশে হেলিকপ্টারের শব্দ উঠলেই থমকে যান মুমতাহিনা নাজ ও আয়শা খাতুন। কথার মাঝেই চুপ হয়ে যান। দুজনের চোখেমুখে ভেসে ওঠে আতঙ্ক। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ঢাকার বসিলায় নবম তলার বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় একটি গুলি মুমতাহিনার পা ভেদ করে বিদ্ধ হয়েছিল আয়শার পায়ে। সেই ঘটনার প্রায় দুই বছর পরও স্বাভাবিক হতে পারেননি দুই খালাতো বোন। পরিবারের দাবি, র্যাবের একটি হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া গুলিতেই তারা আহত হন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ১৯ জুলাই দুপুরের পর বসিলা এলাকায় র্যাব-২-এর সদর দফতরের আশপাশে হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ চলছিল। ওই সময় বাসার সামনের খোলা জায়গায় কয়েকজন কিশোর ফুটবল খেলছিল। নবম তলার বারান্দা থেকে খেলা দেখছিলেন মুমতাহিনা ও আয়শা। হঠাৎ একটি গুলি বারান্দা ভেদ করে মুমতাহিনার পায়ে লাগে। পরে সেটি তার পা ভেদ করে আয়শার পায়ে বিদ্ধ হয়। একটি গুলিতেই গুলিবিদ্ধ হন দুজন। মুহূর্তেই রক্তে ভেসে যায় ঘরের মেঝে।
মুমতাহিনা নাজ ও আয়শা খাতুন সম্পর্কে খালাতো বোন। আয়শার বাবা মারা যাওয়ার পর ছোটবেলা থেকেই তিনি মাকে নিয়ে খালার বাসায় থাকেন। একসঙ্গেই বড় হয়েছেন দুজন। মুমতাহিনার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল উদ্দিন আহমেদ তাদের দুজনকেই নিজের মেয়ের মতো লালন-পালন করেছেন। ঘটনার সময় মুমতাহিনা ভিকারুননিসা নূন কলেজের বেইলি রোড শাখার এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। আয়শা ছিলেন ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল উদ্দিন আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ১৯ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে চারদিক থেকে গুলির শব্দ আসছিল। সবাই আতঙ্কিত। ঘরের বাইরে তেমন কেউ বের হচ্ছিল না। ছাদে গিয়ে দেখি, র্যাব কার্যালয়ের ছাদ থেকে চারদিকে একনাগাড়ে গুলি করা হচ্ছে। আকাশে র্যাবের হেলিকপ্টার চক্কর দিচ্ছে। বসিলা সড়কে একের পর এক বাহিনী এসে একনাগাড়ে গুলি করছে। কে বিক্ষোভকারী আর কে পথচারী, কাউকে বাদ দিচ্ছে না। পরে জানতে পারি, তারা এপিবিএন ও এসএসএফের সদস্য ছিলেন। র্যাব ও পুলিশকে গুলি চালাতে দেখেছি। অনেক মরদেহ রাস্তায় পড়ে ছিল। কে কার খবর নেবে। এলাকার অনেকে মরদেহ এনে চুপিচুপি দাফন করেছে। ভয়ে কাউকে কিছু জানায়নি।
তিনি বলেন, ওই দিন আমার বাসার সামনের খালি মাঠে অনেক কিশোর খেলছিল। আশপাশের ভবনের বাসিন্দারা বারান্দা ও জানালা দিয়ে তাদের খেলা দেখছিলেন। হঠাৎ র্যাবের হেলিকপ্টারটি বাসার সামনে নিচে নেমে গুলি করতে করতে আবার ওপরে উঠে যায়। এ সময় একটি গুলি আমার বাসার একটি কক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা দুই মেয়ের পায়ে লাগে। একই গুলি এক মেয়ের পা ভেদ করে আরেক মেয়ের পায়ে বিদ্ধ হয়। তাদের রক্তে পুরো ঘর ভেসে যায়। হেলিকপ্টারটি ওপরে ওঠার সময় আরও একটি গুলি নয় তলার ছাদে থাকা সোলার প্যানেল ভেদ করে বেরিয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, র্যাবের হেলিকপ্টার ও র্যাব-২-এর কার্যালয়ের ছাদ থেকে মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ চলছিল। চারদিকে ছিল ভূতুড়ে পরিবেশ। গুলিবিদ্ধ দুই মেয়েকে নিয়ে বিপাকে পড়ে যাই। ঘর থেকে বের হতে পারছিলাম না। সড়কে কোনো গাড়ি ছিল না। তাদের হাসপাতালে নেওয়ার মতো একটি রিকশাও পাওয়া যায়নি।

তার ভাষ্য, যতগুলো অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করেছি, কেউ আসতে চায়নি। দু-একজন আসতে চাইলেও কাছাকাছি এসে জানায়, তাদের আর এগোতে দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশ ও শিক্ষার্থীরা চেক করছে। ৯৯৯-এ ফোন করলে তারা একটি অ্যাম্বুলেন্স পাঠালেও পুলিশ সেটিকে বেড়িবাঁধে আটকে দেয়। কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। এ সময় দুই মেয়ের পা থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছিল। পরে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে মুগদা হাসপাতাল থেকে একটি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স আসতে রাজি হয়। তবে তারা জানায়, বেড়িবাঁধের পর আর এগোতে পারবে না। তখন আমি তাদের বলি, গাবতলী হয়ে আমিনবাজার, সেখান থেকে হেমায়েতপুরের দিক দিয়ে কেরানীগঞ্জের তারানগর-আটিবাজার হয়ে বসিলা পার হয়ে আসতে। তারা সে পথেই আসে। এরপরও বসিলা ব্রিজে শিক্ষার্থীরা অ্যাম্বুলেন্সটি আটকে দেয়। তবে গুলিবিদ্ধের কথা জানার পর ছেড়ে দেয়। নানা বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্সে করে দুই মেয়েকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাই।
কামাল উদ্দিন বলেন, সেদিন পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে দেখি, গুলিবিদ্ধ শত শত ছেলে-মেয়ে। সবার চিৎকারে হাসপাতালে যেন কেয়ামতের দৃশ্য। চিকিৎসক ও নার্স থাকলেও কেউ এগিয়ে আসছিল না। সবাই যে যেখানে পড়ে আছে। কতজন মারা যাচ্ছেন, তার হিসাব নেই। রক্তের জন্য হাহাকার। স্বজনদের ছোটাছুটি। আবার অনেক আহতের কোনো স্বজনও ছিল না। কোনো পথচারী বা সহকর্মী তাদের রিকশা বা ভ্যানে করে হাসপাতালে রেখে গেছেন। তাদের আহাজারি দেখে কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। আমি ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করেছি। সেদিনও এমন দৃশ্য দেখিনি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা এসে মানুষ মেরেছে, আর এবার আমার দেশের বাহিনী জনগণকে মেরেছে।
কামাল উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, পরদিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পঙ্গু হাসপাতালে আসেন। আমার দুই মেয়েকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দেখেন। পরে একজন নার্সের মাধ্যমে জানতে পারি, তিনি চিকিৎসককে গোপনে বলে গেছেন, যে করেই হোক দুই মেয়ের পা যেন কেটে ফেলা হয়। এ খবর পাওয়ার পর আমার পরিচিত এক চিকিৎসক সবাইকে বলে যান, তাকে না জানিয়ে যেন এই দুই মেয়ের চিকিৎসা করা না হয়। পরে অস্ত্রোপচার করে পা থেকে গুলি বের করা হয়। এরপর এক সপ্তাহ দুই মেয়েকে দিন-রাত পালা করে ২৪ ঘণ্টা পাহারা দিয়েছি।
একেএস/এআর