Dhaka Mail Logo

জাতীয়

রামপুরা-যাত্রাবাড়ী-মোহাম্মদপুর ও উত্তরায় সকাল থেকেই নামে আন্দোলনের ঢল

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯ জুলাই ২০২৬, ১২:২৯ পিএম

পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৯ জুলাই সকাল থেকেই দ্বিতীয় দিনের মতো কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি পালনে রাস্তায় নামেন শিক্ষার্থীরা। এদিন সরকারের সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র অন্দোলন নয় দফা দাবি পেশ করে। আন্দোলনের সমন্বয়করা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।

সকাল থেকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ি ও রামপুরা এলাকায় সব বাধা ভেঙে দিয়ে সড়কে নেমে আসতে থাকেন ছাত্র-জনতা। একই সঙ্গে মোহাম্মদপুর এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। সকাল থেকে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ বেলা গড়াতেই রাজধানীর ধানমন্ডি, বাড্ডা, রামপুরা, উত্তরা ও মহাখালীতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রেসক্লাব ও পল্টন এলাকাজুড়ে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনরত ছাত্র জনতার ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। কমপ্লিট শাডডাউন কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, গুলি, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ভয়াবহ এ সংঘর্ষে রাজধানীসহ সারাদেশে অন্তত ৬৭ জন নিহত হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা

১৯ জুলাই পুরো রাজধানী জুড়ে আন্দোলনের ভয়াবহ চিত্র দেখে দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় হাসিনা সরকার। দফায় দফায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে সরাসরি কিংবা ব্যক্তিগত ফোনে জরুরি বৈঠক ও আলাপ আলোচনা করতে থাকেন।

আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার থেকে গুলি, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে র‌্যাব। র‌্যাবের ছোড়া গুলিতে আন্দোলনরত বেশ কয়েকজন আহত হয়। এ ছাড়াও, একটি ভবনের ছাদ থেকে লুঙ্গি পড়ে র‌্যাবের হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য বেশ ভাইরাল হয়। হেলিকপ্টার থেকে গুলি করার ঘটনাটি র‌্যাবের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়। র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা আকাশ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। হেলিকপ্টার থেকে কোনো গুলি ছোড়া হয়নি, বরং উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হয়েছে।

বিজিবির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে পুঁজি করে যারা ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালাচ্ছে, তাদের শক্ত হাতে দমন করা হবে।

দিনভর যেসব ঘটনায় সরকার দুশ্চিন্তায়

১৯ জুলাই সকাল থেকে আন্দোলনে নামে ছাত্র-জনতা। শিক্ষার্থীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিচারে গুলির ঘটনায় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা রামপুরা থানা ও রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ি, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে পূরবী পর্যন্ত পাঁচটি পুলিশ বক্সে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। বনানীতে বিআরটিএ-এর সদর কার্যালয়, মিরপুরে অবস্থিত সংস্থাটির মেট্রো-১ কার্যালয়, মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদফতরের পুরোনো ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। মিরপুরে বিআরটিএ অফিসে থাকা বেশ কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়।

এদিন মেট্রোরেলের কাজীপাড়া স্টেশনে ভাঙচুর চালানো হয়। মেট্রোরেল ভাঙচুরের ফলে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এদিন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যান চলাচল করতে দেখা যায়নি। ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা থেকে আন্তর্জাতিক অনেক ফ্লাইট বাতিল করা হয়। ঢাকার সঙ্গে সারাদেশের রেল চলাচল বন্ধ ছিল। পুরো রাজধানী জুড়ে মোটরসাইকেল চলাচল সীমিত করে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এক বক্তব্যে দেশজুড়ে বিএনপি-জামায়াতের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। এ সময় তিনি নেতাকর্মীদের প্রতিটি ইউনিট ও ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন।

ওবায়দুল কাদেরের এমন ঘোষণার পর দেশজুড়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ায় তাদের অভিভাবকরা। ‘সন্তানের পাশে অভিভাবক’ এমন ব্যানারে রাজধানীর শাহবাগে মানববন্ধন করেন সর্বস্তরের অভিভাবক সমাজ। অভিভাবকদের এমন  দুঃসাহসিক ভূমিকা দেখে সারাদেশে আন্দোলন আরও গর্জে ওঠে।

দেশজুড়ে এমন পরিস্থিতি দেখে রাতে গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি, বিজিবির ডিজি ও ডিএমপি কমিশনার। তাদের বৈঠকের পরই মধ্যরাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে আটক করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শুক্রবার (১৯ জুলাই) রাত ১২টা থেকে সারাদেশে কারফিউ জারি করে সেনা মোতায়েন করা হয়।

রাজধানীর বাইরের চিত্র

রাজধানীর বাইরে খুলনার শিববাড়ী, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, রংপুর, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও গাজীপুরে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গোলযোগের মধ্যে নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা চালিয়ে কারা কর্মকর্তা ও কারারক্ষীদের জিম্মি করে সেখান থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া হয়। 

একেএস/এফএ