Dhaka Mail Logo

জাতীয়

গণঅভ্যুত্থানে ফারহান ও ইয়ামিনের মৃত্যুতে সারাদেশ রণক্ষেত্র, নিহত ২০

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

১৮ জুলাই ২০২৬, ০১:২১ পিএম

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। এই দিনে কোটা সংস্কারের দাবিতে সারাদেশে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি পালিত হয়। ছাত্রদের আন্দোলন দমাতে পুলিশ যে সাঁড়াশি অভিযান চালায় তাতে ঢাকায় ১৩ জনসহ সারাদেশে মোট ২০ জন নিহত হয়। সেই নিহতের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ঢাকার  ফারহান ও সাভারের ইয়ামিন। ইয়ামিনের মৃত্যুর ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নাড়া দেয়। ফলে দ্রুত এই ঘটনা ছড়িয়ে  পড়ে। ইয়ামিনকে যেভাবে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হয়েছিল তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক হারে প্রচারিত হয়।

এদিন  ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ছিল উপচেপড়া আহতদের ভিড়। বেলা বাড়তেই গুলিবিদ্ধ মানুষের মিছিল বাড়তে থাকে। কিন্তু এরপরও থেমে ছিল না হাসিনার গণহত্যার অন্যতম সহযোগী পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। আরও যুক্ত হয়েছিল বিজিবি, সেনা ও র‌্যাব। তারা সারাদেশে একযোগে নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালায়।

ঢাকার রাজপথ বিশেষ করে উত্তরা, সাভার ও যাত্রাবাড়ী এলাকা পুলিশেল টিয়ারসেল, গুলি, রাবারবুলেট ও সাউন্ডগ্রেনেডে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। এদিন মুলত আন্দোলনের বারুদ ছড়িয়ে পড়ে ঢাকায়। কিন্তু সেই বারুদকে দমিয়ে দিতে সরকার পরদিন থেকেই ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। ফলে টানা ১০ থেকে ১৪-১৫ দিন ইন্টারনেটবিহীন ছিল সারাদেশ। কিন্তু আড়ালে ঠিকই হাসিনার মন্ত্রীরা সেই ইন্টারনেট ব্যবহার করতেন।   

রাজধানীর রামপুরায় দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার। ওই দিন বিক্ষুদ্ধ জনতা একাধিক পুলিশ বক্স ও বিটিভি ভবনে আগুন দেয়। হানিফ ফ্লাইওভার টোল প্লাজায় কয়েক দফায় আগুন দেওয়া হয়। কোন সড়কে কোন ধরনের যানবাহন ছিল না। ওই দিন কেউ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হননি। সব মিলে দিনটি ছিল উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় ভরা।

ঢাকায় ১৩ জনের মৃত্যু

এদিন সারাদেশে সরকারি হিসেবে ২০ জনের মৃত্যু হয়। কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি ছিল। সেই সংখ্যা কত তা আজো জানা যায়নি। অনেকে স্বজনের মৃত্যুকে হাসিনা সরকারের ভয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন। যদি প্রকাশ পায় তখন ঝামেলা হবে। 

এদিন উত্তরা, বাড্ডা, ধানমন্ডি ও যাত্রাবাড়ীর কাজলায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে ১৩ জনের মৃত্যু হয়। উত্তরায় সাতজন, বাড্ডায় দুইজন, ধানমন্ডিতে তিনজন ও কাজলায় একজনের মৃত্যু হয়। তবে নিহতদের মধ্যে সাধারণ মানুষই ছিল বেশি। 

ধানমন্ডিতে নিহত হন ফারহান

এদিন ধানমন্ডিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মীদের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সেই সময় আওয়ামী লীগ কর্মী ও পুলিশের হামলায় গুলিতে নিহত হন ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ফারহান ফাইয়াজ। পরে ফারহানকে উদ্ধার করে ধানমন্ডির সিটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ফারহান ছিলেন তার বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। ফারহানের মৃত্যু দুপুরে হলেও রাতে সেই ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে আলোড়ন তোলে। তার ছবি ভাইরাল হয় এবং অনেকে তার মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি। ফারহান ফাইয়াজের মৃত্যুর পর কলেজটির অনেক ছাত্রছাত্রী আন্দোলনে যুক্ত হন। তারা সহপাঠীর মৃত্যুর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

বাড্ডা এলাকা রণক্ষেত্র, নিহত ২
 
ওইদিন বাড্ডায় পুলিশের সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে দুইজন নিহত ও শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হন। নিহত দুইজনের একজন ছিলেন গাড়িচালক। তার নাম দুলাল মাতব্বর। সংঘর্ষের সময় মাইক্রোবাস চালিয়ে ওই এলাকা পার হচ্ছিলেন। ঠিক ওই সময় তার বুকে গুলি চালায় পুলিশ। দুপুর তখন সাড়ে ১২টা। এরপর তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ফরাজী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আহত হয়ে ১০০ জন হাসপাতালে ভর্তি

বাড্ডা, রামপুরা, ও যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ ও ছাত্রদের সংঘর্ষে প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী ও পুলিশ আহত হন। রামপুরা, বাড্ডা ও মগবাজারের হাসপাতালগুলোতে রোগীকে চিকিৎসা দিতে রীতিমতো হিমশিম খেয়েছেন চিকিৎসকরা। 

বাড্ডায় হেলিকপ্টারে উদ্ধার অবরুদ্ধ পুলিশ

রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালালে তোপের মুখে পড়ে পুলিশ। পাশে থাকা কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে শিক্ষার্থীদের গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করতে থাকে পুলিশ। পরে আন্দোলনকারী ছাত্র ও জনতা একযোগে রুখে দাঁড়ায় তাদের বিরুদ্ধে। তারা তাদের ধাওয়া দিলে একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে পিছু হটে পুলিশ। পরে কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনে আশ্রয় নেন তারা। এরপর তারা সরাসরি চলে যায় ভবনটির ছাদে। পরে বেলা সাড়ে ৩টায় র‍্যাবের হেলিকপ্টার ওই ছাদ থেকে পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে। 

শিক্ষার্থীদের দাবি, পুলিশ বিনা উসকানিতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এমনকি ক্যাম্পাসের ভেতরে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। পুলিশের হামলায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে পুলিশদের অবরুদ্ধ করে রাখেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।

অন্যান্য স্থানে যা ঘটেছিল

কয়েক হাজার শিক্ষার্থী জড়ো হয়েছিলেন কুড়িল বিশ্বরোডের বিভিন্ন পয়েন্টে। এ সময় পুলিশ তাদের রাস্তা থেকে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করলে শুরু হয় সংঘর্ষ। দুই পক্ষের মধ্যে চলতে থাকে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। এক পর্যায়ে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। তখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। বেলা ১১টায় বিক্ষুব্ধরা রামপুরা পুলিশ বক্সে আগুন দেন। এরপর সারাদিন দফায় দফায় চলতে থাকে সংঘর্ষ। বেলা সাড়ে ১১টার পর থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ২ ও ৩ নম্বর গেটের সামনের সড়কে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে। দুই দফায় রামপুরায় বিটিভি ভবনের পাশে আগুন দেন আন্দোলনকারীরা। দাউ দাউ করে আগুন জ্বললেও তা নেভাতে ফায়ার সার্ভিস প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তারা টেলিভিশন ভবনের ক্যান্টিন, রিসিপশন ও একটি গাড়ি ভাঙচুর করে আগুন লাগিয়ে দেন। রামপুরা পুলিশ ফাঁড়িসহ ওই এলাকায় কমপক্ষে ১০টি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনরতদের ওপর গুলি চালাতে থাকে। এরপরও আন্দোলনকারীরা পিছু না হটলে সন্ধ্যার পর সেখানে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয় বলে জানান আন্দোলনকারীরা।

বন্ধ হয়ে যায় মেট্রোরেল

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় মেট্রোরেল। এর আগে সকাল থেকে কয়েকটি স্টেশনে না থামিয়ে সীমিতভাবে চলতে থাকে। মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানায়, অনিবার্য কারণবশত জননিরাপত্তার স্বার্থে মতিঝিল মেট্রো স্টেশন থেকে সবশেষ মেট্রো ট্রেন বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে উত্তরা উত্তরে ছেড়ে গেছে। আর কোনো ট্রেন সেদিন চলাচল করেনি।

আলোড়ন তোলে ডিবি হারুনের বক্তব্য

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আমাদের ধৈর্যকে যারা দুর্বলতা মনে করছেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। আমি অনুরোধ করছি আপনারা ঘরে ফিরে যান।’ ওইদিন বিকেলে যাত্রাবাড়ী এলাকা পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের মধ্যে মাদরাসার ছাত্র, ছাত্রদল, যুবদল, জামায়াত-শিবিরের লোক ঢুকে গেছে। তারা পুলিশের গায়ে হাত দিচ্ছে, ভাঙচুর করছে। আমরা কাউকে ছাড় দেব না।’

সাভারে ইয়ামিনকে হত্যার পর এপাচিতে তুলে ফেলে দেয় পুলিশ

ওইদিন সাভারে প্রথম শহীদ হন শাইখ আসহাবুল ইয়ামিন। পুলিশের গুলিতে শহীদ হওয়ার পরও তার লাশ নিয়ে হেনস্তার ইয়ত্তা ছিল না পুলিশের। তারা তার লাশটি এপাচিতে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু প্রতিরোধ গড়ে সহযোদ্ধারা। পরে তারা তার লাশ এপাচি থেকে রাস্তায় ফেলে দেয়। সেই দৃশ্য বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তৈরি করে। ওইদিন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাকিজা, বাসস্ট্যান্ড, রেডিও কলোনি এলাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাভারের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভে নামে শিক্ষার্থীরা। 

১৮ জুলাই বেলা ১১টার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা। পিস্তল, লাঠি, হকস্টিক ও দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সরকারদলীয় কর্মীরা মহাসড়কে আন্দোলনবিরোধী স্লোগান দিলে শুরু হয় তীব্র ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ত্রিমুখী সংঘর্ষ। পাকিজা সংলগ্ন সাভার মডেল মসজিদ এলাকা রূপ নেয় রণক্ষেত্রে। মুহুর্মুহু গুলির শব্দ আর টিয়ারশেলের ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে আসে চারপাশ। গুলিবিদ্ধসহ আহত হন শতাধিক শিক্ষার্থীসহ আন্দোলনকারীরা।

দুপুর দেড়টার দিকে জোহরের নামাজ শেষে ইয়ামিন জানতে পারেন, তার এক শিক্ষিকার ছেলের চোখে রাবার বুলেট লেগেছে। তখন ইয়ামিন আন্দোলনে অংশ নেন এবং শিক্ষিকার ছেলের খোঁজ নেওয়ার জন্য পাকিজা এলাকার পাকিজা মডেল মসজিদের সামনে পৌঁছান। সেখানে একটি পুলিশের সাঁজোয়া যান (এপিসি) থেকে যেন আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো না হতে পারে, সেজন্য ইয়ামিন সাহসিকতার সঙ্গে সাঁজোয়া যানের দরজা টেনে বন্ধ করার চেষ্টা করেন।

ইয়ামিনের জন্ম ২০০১ সালের ১২ ডিসেম্বর। তিনি সাভার ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। মা নাসরিন সুলতানা, তিনি গৃহিণী। বোন শাইখ আশহাবুল জান্নাত, তিনি পড়ছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইয়ামিন এমআইএসটিতে ডিবেটিং ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

এমআইকে/এফএ