Dhaka Mail Logo

জাতীয়

জুলাই অভ্যুত্থান: যে ছবিটি বদলে দিয়েছিল আন্দোলনের ভাষা

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

১৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৩ পিএম

  • সেই ছবির তরুণী লামিয়া, ইডেন কলেজের ছাত্রী
  • হামলাকারী ছিলেন বাঙলা কলেজ ছাত্রলীগের নেতা
  • সেদিন কলেজের হলে থাকতে পারেননি সেই ছাত্রী
  • বাবা-মা প্রথমে ভয় পেলেও এখন গর্ব করেন

১৫ জুলাই ২০২৪। বিকেলের আলো তখনও ফিকে হয়ে যায়নি। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নেমে এসেছিল এক ভয়াবহ অন্ধকার। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। হাতে লাঠি, রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তারা ধাওয়া করে শিক্ষার্থীদের। প্রাণ বাঁচাতে ছুটছিলেন অনেকে।

সেই দৌড়ের মধ্যেই ক্যামেরাবন্দী হয় দুই তরুণীর আতঙ্কভরা মুহূর্ত। সামনে ছুটছেন তারা, ঠিক পেছনেই লাঠি হাতে ধেয়ে আসছেন এক হামলাকারী। পরদিন ছবিটি ছড়িয়ে পড়ে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। মুহূর্তেই সেটি হয়ে ওঠে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত প্রতীক। অনেকের কাছে ছবিটি শুধু হামলার নথি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের এক নির্মম সাক্ষ্য।

ছবির দুই তরুণীর একজন লামিয়া রায়হান। তখন তিনি ইডেন মহিলা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। আন্দোলনের শুরু থেকেই সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু সেদিন কীভাবে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পৌঁছেছিলেন, কী ঘটেছিল হামলার আগে ও পরে, কিংবা কীভাবে একটি ছবি তার জীবনকে বদলে দিয়েছিল—এক বছর পর সেসব স্মৃতি তুলে ধরেছেন ঢাকা মেইলের কাছে।

ইডেন কলেজের গেট ভেঙে রাজপথে নামেন ছাত্রীরা

লামিয়া জানান, সেদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে বের হন। পরিকল্পনা ছিল ইডেন কলেজের ছাত্রীদের নিয়ে টিএসসিতে যাওয়ার। কিন্তু কলেজের সামনে গিয়ে দেখেন প্রধান ফটক বন্ধ। বাইরে কয়েকজন ছাত্রী দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, ছাত্রীরা আগে জড়ো হলেও কলেজ ছাত্রলীগের নেত্রীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। এরপর হলের ছাত্রীদের হলে ঢুকতে বাধ্য করা হয় এবং বাইরে থেকে আসা ছাত্রীদের বের করে দিয়ে প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়।

lamia--

এরপর কী হয়েছিল, তা বর্ণনা করে লামিয়া বলেন, সেই পরিস্থিতিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিই, আন্দোলনে যাবই। আমাদের এভাবে আটকে রাখা যাবে না। বাইরে থাকা ১০-১২ জন মেয়ে মিলে বড় গেটটি ভেঙে ফেলি। গেট ভাঙার পর আরও অনেক ছাত্রী আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। এরপর ইডেনের ছয়টি হলেই যাই। প্রতিটি হলের তালা ভেঙে ছাত্রীদের বের করি। সবাইকে একত্র করে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে টিএসসির উদ্দেশে রওনা দিই।

টিএসসিতে সেদিন যা ঘটেছিল

সেদিনের পরিস্থিতি বর্ণনা করে লামিয়া বলেন, আমরা টিএসসিতে গিয়ে বসে ছিলাম। স্লোগান চলছিল। বেলা আড়াইটার দিকে খবর পাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়া এলাকায় ছাত্রলীগের লোকজন ঢুকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করছে। খবর পেয়ে সমন্বয়কেরা সিদ্ধান্ত নেন, টিএসসি থেকে মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবেন। মিছিলের সামনে ছিলেন ছাত্রীরা, পেছনে ছাত্ররা।

তিনি বলেন, আমরা ক্যাম্পাসের মূল এলাকায় ঢোকার পর আবার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তখন সমন্বয়কেরা সিদ্ধান্ত নেন, আর ক্যাম্পাসে না থেকে সবাই টিএসসিতে ফিরে যাবেন। কিন্তু ততক্ষণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল।

Untitled

বাস থেকে বের করে মারধর করছিল ছাত্রলীগ

লামিয়া বলেন, মেয়েরা তখন খুব ভয় পেয়ে যায়। অনেকেই ছত্রভঙ্গ হয়ে বাসার দিকে চলে যান। কেউ বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন। আমরা ভিসি চত্বরে গিয়ে দাঁড়াই। তখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বাস দাঁড়িয়ে ছিল। আমি ফুটপাতে বসে পড়ি।

প্রায় সাত-আট মিনিট পর দেখি, ক্যাম্পাসের ভেতর থেকে ছাত্রলীগের বড় একটি দল রড, লাঠি, বাঁশসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসছে। তারা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা শুরু করে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

তিনি বলেন, আমি ভেবেছিলাম বাসের পেছন দিয়ে দৌড়ে পালাব। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই বাসের পেছনে আমরা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী আটকা পড়ে যাই। দুই দিক থেকে ছাত্রলীগ আমাদের ঘিরে ফেলে। সামনে ছিল বাস, আর বাস লক্ষ্য করে ইট ছোড়া হচ্ছিল। বাসের কাচ ভেঙে যায়। এত ভিড় ছিল যে মাথা ঢাকারও সুযোগ পাইনি। এরপর ছাত্রলীগ একে একে বাস থেকে আন্দোলনকারীদের বের করে মারধর করতে থাকে।

ছেলে-মেয়ে কেউই রক্ষা পাননি

লামিয়া বলেন, একপর্যায়ে আমাদের আন্দোলনের এক ভাই ছাত্রলীগের একজনকে অনুরোধ করেন, এখানে অনেক মেয়ে আছে, তাদের যেন না মারা হয়। তখন তিনি কয়েকজন মেয়েকে বের হয়ে যেতে বলেন। আমি ও আরও পাঁচ-ছয়জন মেয়ে বাসের পেছন থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামি।

lamiaa

তিনি বলেন, কিন্তু রাস্তায় নেমে কোথায় যাব, সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। চারদিকে ছাত্রলীগের দখল। যাকে সামনে পাচ্ছিল, তাকেই মারছিল। ছেলে-মেয়ে কাউকেই ছাড়ছিল না। ভাইরাল ছবিতে আমার পাশে যে মেয়েটিকে দেখা যায়, তাকে আমি চিনতাম না। আমরা দুজন রাস্তায় দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছিলাম না কোন দিকে যাব। তখন আমি তার হাত ধরে বলি, চল, এদিকে দৌড় দিই। আমরা দৌড় শুরু করলে কয়েকবার আমাদের ওপর হামলার চেষ্টা হয়। আমরা শুধু প্রাণ বাঁচানোর জন্য দৌড়াচ্ছিলাম। সেই সময়ই একজন সাংবাদিক আমাদের ছবিটি তুলে ফেলেন। তখন আমরা বুঝতেই পারিনি।

ছাত্রলীগ হামলা করলেও পুলিশ ছিল নীরব দর্শক

লামিয়া বলেন, ছবিটি কখন তোলা হয়েছিল, তা আমরা তখন জানতাম না। হামলার এলাকা থেকে বের হয়ে আমরা গণতন্ত্র তোরণের সামনে যাই। সেখানে দাঁড়িয়ে দেখি, পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। একই সঙ্গে দেখি, তোরণের দুই পাশে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন পুলিশ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন না।

তিনি বলেন, বিষয়টি দেখে আমার খুব রাগ হয়েছিল। আমি চিৎকার করে বলেছিলাম, ওদিকে শিক্ষার্থীদের মারধর করা হচ্ছে আর আপনারা এখানে দাঁড়িয়ে কী করছেন? কিন্তু তারা কোনো জবাব দেননি। পরে আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ক আমাদের বাসায় চলে যেতে বলেন। এরপর আমি রিকশায় বাসায় ফিরি।

সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ফেসবুকে ঢুকে দেখি, আমাদের বিভাগের মেসেঞ্জার গ্রুপে আন্দোলনের বেশ কয়েকটি ছবি শেয়ার করা হয়েছে। সেখানে নিজের ছবিটি দেখে প্রথমে অবাক হয়ে যাই। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই দেখি ছবিটি ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়ে গেছে।

ছবি ভাইরাল হওয়ার পর আতঙ্কে ছিল পরিবার

লামিয়া গোপনে আন্দোলনে অংশ নিতেন। তার পরিবার জানত না তিনি আন্দোলনে যাচ্ছেন। কিন্তু ছবিটি ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি তারা জানতে পারেন। এতে পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

Lamia

লামিয়া বলেন, আমার পরিবার জানত না আমি আন্দোলনে যাই। ছবিটি ভাইরাল হওয়ার পর তারা সব জানতে পারে। তারা খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। কারণ এটি ছিল সরকারবিরোধী আন্দোলন, আর আমি হামলার এক ভয়াবহ মুহূর্তে ছিলাম। আমি গুরুতর আহতও হতে পারতাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে সেদিন বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।

সেই ছবি বন্ধু-সহপাঠীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল

লামিয়া বলেন, তিনি কখনো ভাবেননি, তার ওপর হামলার ছবিটি এতটা ছড়িয়ে পড়বে। তবে পরবর্তীতে ছবিটি অনেককে আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করেছে।

তার ভাষায়, আমার অনেক বন্ধু ছিল যারা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। কিন্তু তারা যখন দেখল সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর কীভাবে হামলা হয়েছে, তখন তারাও আন্দোলনে যোগ দেয়। ছবিটি তাদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।

রাতে কলোনিতে অভিযানে নামে পুলিশ

সেদিন রাতে লামিয়া আজিমপুরের একটি ভাড়া বাসার মেসে আশ্রয় নেন। পরে সেই এলাকার বিভিন্ন কলোনিতে পুলিশ অভিযান চালায়। পুলিশের ধারণা ছিল, লামিয়া আজিমপুরের কোনো বাসায় লুকিয়ে আছেন। তবে যে বাসায় তিনি ছিলেন, সেখানে অভিযান চালানো হয়নি।

লামিয়া বলেন, ওই রাতে বাসার মালিকও খুব ভয় পেয়েছিলেন। আতঙ্কের মধ্যেই রাত কেটেছিল।

এমআইকে/এআর