Dhaka Mail Logo

জাতীয়

জুলাই শহীদের মা এখন অন্যের বাসার গৃহকর্মী, মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

একে সালমান

১৪ জুলাই ২০২৬, ০৯:২২ পিএম

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে একমাত্র সন্তানকে হারানোর বেদনা আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন এক অসহায় মা। যে সন্তানের উপার্জনে চলত সংসার, তার মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েছে জীবনের সব ভরসা। রাষ্ট্রের স্বীকৃতি, প্রতিশ্রুত সহায়তা কিংবা পুনর্বাসনের আশায় দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত সহায়তা। ফলে অভাব-অনটনের কঠিন বাস্তবতায় নিজের শোক বুকে চেপে অন্যের বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে বাধ্য হচ্ছেন পারভীন বেগম। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শুধু প্রিয়জনকেই নয়, হারিয়েছেন অন্ন, বস্ত্র ও মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়ও। স্বপ্নহীন, সংগ্রামময় এই জীবন এখন রাষ্ট্রের কাছে এক মায়ের নীরব প্রশ্ন—সন্তানের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি কি কেবল সান্ত্বনা আর প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

‎২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মোহাম্মদপুর এলাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. রনি। সেদিন বিকেলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনরত অবস্থায় মোহাম্মদপুর তিন রাস্তা মোড় এলাকায় গুলিতে শহীদ হন রনি। এর কয়েক মাস আগে তার বাবা মারা যান।

‎শহীদ রনি'র মা পারভীন বেগম দুঃখ প্রকাশ করে ঢাকা মেইলকে বলেন, 'আমার কোনো ক্ষোভ নেই। কার প্রতি ক্ষোভ দেখাবো? যারা আমার সন্তানকে হত্যা করেছে, তাদের বিচার উপরওয়ালা করবে। আমার সন্তান শহীদ হওয়ার পর কত লোক আমাকে সান্ত্বনা দিতে এসেছে। রাজনৈতিক নেতারা এসেছে। কিন্তু কেউ আমার ছেলে যে শহীদ হয়েছে সেই স্বীকৃতির ব্যবস্থা করে দেয়নি। আমি অন্যের ঘরে বসবাস করি, অসুস্থ শরীর নিয়ে বৃদ্ধ বয়সে মানুষের বাসায় কাজ করে খাই। আমার কোনো আক্ষেপ নাই। প্রয়োজনে আমার ছেলের স্বীকৃতিও দরকার নেই। অন্তত আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন—এটাই চাই।' ‎শহীদ রনির মা কথাগুলো বলছিলেন আর তার দুই চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল।

আরও পড়ুন

জুলাই আন্দোলন: গুলি ও স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা নিয়েই দিন কাটছে আমিনুলের

স্বজনরা জানান, যেদিন রনি আন্দোলনে গিয়ে শহীদ হন সেদিন থেকে তার মা চুপচাপ হয়ে গেছেন। কারও সঙ্গে তেমন কথা বলেন না। আন্দোলনের সময় প্রাণ হারানো ছেলেই ছিল পরিবারের প্রধান ভরসা। তার আয়ে কোনো রকম মাকে নিয়ে সংসার চলত। কিন্তু সেই সন্তানকে হারানোর পর একদিকে শোক, অন্যদিকে অভাব— দুইয়ের ভার একসঙ্গে কাঁধে এসে পড়েছে মায়ের ওপর। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ভোরে ঘর থেকে বের হয়ে একাধিক বাসায় কাজ করেন তিনি। দিন শেষে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই কোনোভাবে জীবনের খরচ বহন করেন।

Rony-Mother2
রনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র ভরসা। ছবি: ঢাকা মেইল

 

‎শহীদ রনির চাচা ভোলা মিয়া আক্ষেপ করে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আন্দোলনের পর শহীদ পরিবারের পাশে থাকার নানা আশ্বাস দেওয়া হলেও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নেই। আমার ভাইয়ের স্ত্রী তার মায়ের সঙ্গে মিরপুরে তার ভাইয়ের বাসায় থাকেন। বাসা ভাড়া দিয়ে থাকার মতো টাকা নেই, তাই অন্যের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। সন্তান হারানোর পর একেবারে নিশ্চুপ হয়ে পড়েন তিনি। সন্তান হারানোর কষ্ট আজও ভুলতে পারেননি। জীবিকা নির্বাহ করতে অন্যের বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন।’

ভোলা মিয়া বলেন, ‘কোনো অক্ষরজ্ঞান না থাকায় সবচেয়ে বড় বিপাকে পড়েছেন তিনি। ছেলে শহীদ হওয়ার পর আশপাশের প্রতিবেশী ও আত্মীয়রা মিলে দাফন করেছিলাম। এরপর আমরা মিলে হাসপাতালে দৌড়ে কোনো রকম ছেলের মৃত্যুর কাগজটা নিয়েছি। বেশ কয়েক দফায় কয়েকজনের সহযোগিতায় জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনে যোগাযোগ করেছি। সেখান থেকে আমাদের এমআইএস নামক কী যেন একটি বিষয় সমাধান করে আনতে বলেছেন কয়েকজন। কিন্তু এ কাজ কীভাবে আমরা সম্পন্ন করব তা জানিই না।’

আরও পড়ুন

রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে স্বীকৃতিহীন শহীদ শিশু সাব্বির

‎জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা জামাল আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ছেলেটা মারা যাওয়ার পর স্থানীয়ভাবে আমরা তার মাকে নিজেদের সাধ্যমতো সহায়তা করেছি। কিন্তু এত অল্প সহায়তায় কী হয়। নির্বাচনের আগে অনেক দলের নেতাকর্মীরা তাদের বাসায় এসেছেন। অনেকে আশ্বস্ত করে গেছেন। কিন্তু তার মায়ের কোনো ব্যবস্থা করলেন না। এছাড়াও, সে যে আন্দোলনে শহীদ হলো সে স্বীকৃতি পায়নি। রনির বাবা আন্দোলনের ২-৩ মাস আগে মারা গেছেন। ২-৩ মাস পর আন্দোলনে ছেলেটা চলে গেল। তার মা কোনো উপায় না পেয়ে অন্যের বাসায় থাকে। মানুষের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।’

‎জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা শহীদদের নিয়ে কাজ করছি। এখনো যারা বাকি আছে তাদের নিয়ে কাজ করছি। আহত ও শহীদদের নামের তালিকা সংশোধন কিংবা সংযুক্তের বিষয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কাজ করছে। আশা করছি খুব শিগগির এই শহীদের নাম তালিকায় তুলে গেজেট প্রকাশ করা হবে।’

‎একেএস/জেবি