নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম
টানা কয়েক ঘণ্টার ভারী বর্ষণে আবারও জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা। রোববার রাতের প্রথম প্রহর থেকে শুরু হওয়া মুষলধারে বৃষ্টি সকাল গড়িয়ে দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকায় মিরপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, আগারগাঁও, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, মালিবাগ, মৌচাক, শান্তিনগর, বাড্ডা, রামপুরা, শাহজাহানপুর, তেজগাঁও, বনশ্রী ও খিলগাঁওয়ের বিভিন্ন সড়কে হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে চরম দুর্ভোগ। অনেক এলাকায় যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে, আবার কিছু এলাকায় সড়ক কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী এবং জরুরি কাজে বের হওয়া সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় পানির মধ্যে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।
দুপুরের দিকেও বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। একটানা বর্ষণে সড়কে জমে থাকা পানির উচ্চতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। অনেক অলিগলি, বাসাবাড়ির প্রবেশপথ, দোকানপাটের সামনের অংশ এবং নিচু এলাকার বসতঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নর্দমার পানি উপচে সড়কে মিশে যাওয়ায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে চলাচলের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কর্মজীবী মানুষ। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পেরে অনেকে বিকল্প পথ ব্যবহার করেছেন। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় বাসের অপেক্ষায় থেকেও যানবাহন না পেয়ে হাঁটতে বাধ্য হয়েছেন। বিভিন্ন বাসস্টপে যাত্রীদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক বাস নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে পৌঁছায়। কোথাও কোথাও কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
বৃষ্টির পানিতে বিভিন্ন সড়কে বাস, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল বিকল হয়ে পড়েছে। অনেক চালক গাড়ি ঠেলে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। পানিতে ডুবে যাওয়ায় অনেক মোটরসাইকেল মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। রিকশা ও ভ্যানচালকদের অনেকেই অতিরিক্ত ভাড়ায় যাত্রী পারাপার করলেও পানি বেশি থাকায় অনেক রাস্তায় তারাও চলাচল করতে পারেননি।
ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। নিচু এলাকায় থাকা দোকানগুলোতে পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক দোকানদার তড়িঘড়ি করে মালামাল উঁচু স্থানে সরিয়ে রাখেন। ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দোকান গুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হন। বৃষ্টির কারণে ক্রেতার উপস্থিতিও ছিল খুবই কম।
হাসপাতালগামী রোগী ও তাদের স্বজনদের দুর্ভোগ ছিল আরও বেশি। অ্যাম্বুলেন্স অনেক এলাকায় ধীরগতিতে চলেছে। কিছু কিছু এলাকায় পানি জমে থাকায় রোগীদের বিকল্প পথে হাসপাতালে নিতে হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছুটি শেষে বাড়ি ফিরতেও ভোগান্তিতে পড়ে শিক্ষার্থীরা।
বছরের পর বছর ধরে রাজধানীতে বৃষ্টি হলেই একই ধরনের জলাবদ্ধতা দেখা দিলেও স্থায়ী সমাধান এখনও দৃশ্যমান নয়। নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল ভরাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, নালা-নর্দমা নিয়মিত পরিষ্কার না করা, অবৈধ দখল এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকাই এই সমস্যার প্রধান কারণ। ফলে কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যায়।
মিরপুর এলাকার পথচারী আলাউদ্দিন বলেন, সকালে অফিসে বের হয়ে মনে হয়েছে রাস্তা নয়, যেন খাল পার হচ্ছি। কোথায় ম্যানহোল আছে, কোথায় গর্ত আছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কাপড়, জুতা সব ভিজে গেছে। প্রতিবার বর্ষায় একই কষ্ট ভোগ করছি। এত উন্নয়নের কথা শুনি, কিন্তু বৃষ্টি হলেই সবকিছু পানির নিচে চলে যায়। মনে হয় রাজধানীর রাস্তায় এখন নৌকা চালানোর ব্যবস্থা করলেই ভালো হতো।
রিকশাচালক আশিক বলেন, সারাদিন রিকশা চালিয়েও ঠিকমতো ভাড়া পাচ্ছি না। অনেক রাস্তায় পানি এত বেশি যে রিকশা চালানো যায় না। পানি ঢুকে গাড়ি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ব্রেক কাজ করছে না। যাত্রীও কম। আবার যারা উঠছেন তারা দ্রুত যেতে চান, কিন্তু পানি থাকায় গতি বাড়ানো সম্ভব নয়। এভাবে চলতে থাকলে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে যাবে।
গাবতলী থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারগামী অছিম বাসের চালক অনিক বলেন, পানি জমে থাকায় বাস চালাতে খুব ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। কোথায় গর্ত আছে তা বোঝা যায় না। অনেক জায়গায় ইঞ্জিনে পানি ঢুকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। একটু দ্রুত চালালেই ঢেউ উঠে পাশের মানুষ ভিজে যায়। আবার ধীরে চালালে পেছনে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। আমাদেরও অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই রাস্তায় আটকে থাকতে হচ্ছে।
একই বাসের হেলপার জনি বলেন, আজ যাত্রীদের রাগ, ক্ষোভ সব আমাদের ওপর পড়ছে। কিন্তু আমরা তো ইচ্ছা করে দেরি করছি না। পানি আর যানজটের কারণে এক ট্রিপ শেষ করতেই দ্বিগুণ সময় লাগছে। অনেক যাত্রী বাসে উঠতে পারছেন না, কেউ আবার মাঝপথে নেমে হাঁটছেন। সকাল থেকে ঠিকমতো খাওয়ারও সময় পাইনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সামান্য বৃষ্টি হলেই এলাকায় পানি জমে যায়। কিন্তু আজকের মতো টানা ভারী বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। পানি নামতে অনেক সময় লাগছে। এতে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়ছেন। ময়লা পানির কারণে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। দ্রুত কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, খাল উদ্ধার, নালা-নর্দমা নিয়মিত পরিষ্কার এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত অপসারণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তারা।
নারী যাত্রী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ছোট বাচ্চাকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিলাম। কিন্তু কোনো যানবাহন পাচ্ছিলাম না। অনেক দূর পর্যন্ত পানি ভেঙে হাঁটতে হয়েছে। বৃষ্টির পানি আর ড্রেনের নোংরা পানি একসঙ্গে মিশে গেছে। খুব ভয় লাগছিল। রাজধানীতে বসবাস করেও যদি এভাবে চলতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কষ্ট কে বুঝবে?
মিরপুরের স্থানীয় দোকানদার মোজাম্মেল হোসেন বলেন, প্রতিবার বৃষ্টি হলেই দোকানে পানি ঢোকে। আজও অনেক মালামাল উঁচুতে তুলে রাখতে হয়েছে। ক্রেতা নেই বললেই চলে। বিদ্যুতের লাইন নিয়ে ভয় কাজ করছে। ব্যবসা করে লাভ তো দূরের কথা, দোকান টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত পানি সরানোর ব্যবস্থা না করলে আমাদের বড় ক্ষতি হবে।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, বর্ষা মৌসুমে আগামী দিনগুলোতেও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আগাম প্রস্তুতি ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। অন্যথায় প্রতিটি ভারী বৃষ্টির পর রাজধানীবাসীকে একই ধরনের দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার (১২ জুলাই) সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় ঢাকায় ২৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে মোট ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ফলে রাজধানীর বিভিন্ন প্রধান সড়ক, মহাসড়ক ও অলিগলিতে পানি জমে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী।
আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বিভাগেও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ সময়ে দিন ও রাতের তাপমাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই।
এই পরিস্থিতিতে রোববার দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার জন্য ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তা জারি করেছে আবহাওয়া অধিদফতর। সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি এবং কিছু এলাকায় ৮৮ মিলিমিটারের বেশি অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। ফলে নিচু এলাকা ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ স্থানে দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।
এএইচ/এফএ