নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ জুলাই ২০২৬, ০১:০৪ পিএম
জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার, সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রবীণ রাজনীতিক, খ্যাতিমান আইনজীবী এবং বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও বিচার বিভাগীয় অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রধান বিচারপতি জোবায়ের রহমান চৌধুরী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ, বিরোধী দলীয় নেতাসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা পৃথক শোকবার্তায় তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।
রোববার (১২ জুলাই) ভোর ৪টা ১৯ মিনিটে রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।
প্রধানমন্ত্রীর শোক
এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রজ্ঞাবান, অভিজ্ঞ, সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সততা, প্রজ্ঞা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে সুসংহত করা, সংসদীয় সংস্কৃতির বিকাশ এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র পরিচালনায় তার অবদান জাতি চিরকাল গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তিনি আজীবন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আদর্শে অবিচল ছিলেন।
বিগত ১৭ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে তার অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানুষের মৌলিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তার ভূমিকা বিএনপির ইতিহাসে যেমন স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তেমনি দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
প্রধান বিচারপতির শোক
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি জোবায়ের রহমান চৌধুরী। সুপ্রিম কোর্টের এক শোকবার্তায় জানানো হয়, প্রধান বিচারপতি তার নিজের, আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন। একই সঙ্গে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শ্রদ্ধা
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন একজন প্রথিতযশা আইনজীবী, দক্ষ সংসদীয় ব্যক্তিত্ব এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে তিনি সংসদ পরিচালনায় যে দক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন, তা দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন এবং সংসদীয় গণতন্ত্র বিকাশে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি একজন আদর্শবান রাজনীতিক ও অসাধারণ সংসদীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
চিফ হুইপ ও বিরোধী দলীয় নেতার শোক
প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আমির জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান নিজের ভেরিফাইড ফেসবুকে লেখেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার সুপ্রিম কোর্টের একজন খ্যাতিমান সিনিয়র আইনজীবী এবং একজন পরিচ্ছন্ন ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ হিসেবে দীর্ঘদিন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তার পেশাগত ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন।
মহান জাতীয় সংসদের স্পিকার থাকা অবস্থায় তিনি ছিলেন সবার কাছেই সমাদৃত। ফ্যাসিবাদী আমলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দসহ যাদের ওপর আইনি জুলুম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই সময় তিনি আমাদের প্রতি পরম সহানুভূতিশীল ছিলেন। নানা বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দের পক্ষে তিনি আদালতে দাঁড়িয়েছেন। কোনো দিন আমরা জোর করেও তাকে কোনো ফি দিতে পারিনি। তিনি বলতেন, ‘এটি আমার নৈতিক দায়িত্ব— এই মজলুমদের পাশে দাঁড়ানো।’ আমরা তার কাছে গভীর কৃতজ্ঞ।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম এক শোকবার্তায় বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সংসদীয় অভিজ্ঞতা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ, সংসদীয় গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তার অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে তার নিরপেক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা সর্বমহলে প্রশংসিত ছিল।
মন্ত্রীদের শোক
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আইনি জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। মুক্তিযুদ্ধের সময় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের সংগঠিত করতেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংসদীয় ব্যক্তিত্ব। স্পিকার, মন্ত্রী ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার অবদান জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ) বলেন, তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান ও প্রথিতযশা আইনজীবী। গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন তিনি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ছিল নীতি, আদর্শ, সততা ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের রাজনৈতিক, আইনি এবং রাষ্ট্রীয় অঙ্গনের জন্য তার মৃত্যু এক অপূরণীয় ক্ষতি। শিক্ষা বিস্তার, আইন অঙ্গন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতেও তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এবং প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুও পৃথক শোকবার্তায় বলেন, দেশ একজন অভিজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান ও নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিবিদকে হারিয়েছে।
বিপিজেএর শোক
বাংলাদেশ পার্লামেন্ট জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজেএ) সভাপতি হারুন জামিল ও সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী খান লিথো এক বিবৃতিতে বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন এ দেশের সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চার অন্যতম অগ্রপথিক। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক সংকটে তার ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অবসান
১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ, এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যে গিয়ে লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ‘ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি লাভ করেন।
দেশে ফিরে তিনি আইন পেশায় যুক্ত হয়ে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, ভূমি প্রতিমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনীতি, আইন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাওয়া এই বর্ষীয়ান রাজনীতিকের মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। তার অবদান ও কর্মময় জীবন দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এমআর/এফএ