নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৯ পিএম
বর্ষায় ডুবে চট্টগ্রাম, এটা নতুন বিষয় নয়। অন্তত চার দশকের বিষয় এটি। তবে বিষয়টা এখন ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। বিষয়টি মোকাবেলায় কম ঘাম ঝরাচ্ছেন না চট্টগ্রামের সরকারি সংস্থাগুলোর কর্তারা। টিকে থাকার লড়াইয়ে একাধিক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম। নানা উদ্যোগ নিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনও। এরপরও তেমন সুফল আসেনি নগর ও উপকূলীয় এলাকা ডোবায়। নগরবাসীর প্রশ্ন-সমস্যা কোথায়? আর এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
নগরীর বোদ্ধাদের ভাষ্য, ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মতে, আগামী এক শতাব্দীজুড়ে হিমবাহ গলে সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা ১৪.০১ মিটার বাড়ার কারণে সম্পূর্ণ ডুবে যাবে চট্টগ্রাম। সামুদ্রিক টাইডাল (জোয়ার) বিষয়ক ওয়েবসাইট আর্থ.অর্গে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়, জলবায়ুর প্রভাবে ভাটির দেশগুলোর সমুদ্র উপকূলীয় একাধিক নগর ও উপকূলীয় এলাকা সাগরের গ্রাসে বিলীন হয়ে যেতে পারে। তম্মধ্যে চট্টগ্রাম অন্যতম। ২০৫০ সালের দিকে শহরটির অর্ধেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। ২১০০ সাল নাগাদ শহরটি সমুদ্রের গ্রাসে বিলীন হতে পারে; যদি অতি দ্রুত টাইডাল নিয়ন্ত্রণসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়।
ঠিক এই জায়গা থেকে যদি শুরু করা হয়, তাহলে বোঝা যায় বিষয়টি এখন কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে। গত ৬ জুলাই সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে নিম্নচাপের প্রভাবে চট্টগ্রামে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়। বলা যায়, অবিরাম বৃষ্টি। আর সকালেই দেখা যায় চট্টগ্রাম মহানগরের নিচু এলাকা তালিয়ে গেছে পানির নিচে। দুপুর হতেই এই পানি রূপ নেয় জলাবদ্ধতায়। তখন কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর, আবার কোথাও গলা সমান পানি জমে যায়। যেখানে ভোগান্তির শেষ ছিল না পেশাজীবী মানুষ ও স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের। ঘটে প্রাণহানির ঘটনাও।
আবার সন্ধ্যার পর দেখা যায়, পানি কমে হাঁটুর নিচে নেমে এসেছে নিচু এলাকায়। তখনও বৃষ্টি ঝরছে অঝোর ধারায়। ঠিক পরেরদিন মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরের দিকে আবার গলা সমান পানি নগরীর প্রায় দুই তৃতীয়াংশ এলাকায়। পরেরদিন ৮ জুলাই বুধবারও নগরজুড়ে থই থই করছে পানি। বৃষ্টিপাতের তীব্রতা এ সময় আরও বেশি ছিল। বৃহস্পতিবার সকালে বৃষ্টি ঝরলেও কিন্তু দেখা যায়, নগরী ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে গেছে। শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল থেকে বৃষ্টি থামলেও ডুবে রয়েছে নিচু এলাকা। পানিবন্দি হয়ে পড়ে চট্টগ্রামের সবকটি উপকূলীয় উপজেলা। বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, চট্টগ্রাম মহানগর ও উপকূলীয় এলাকা বৃষ্টিপাতে ডুবেনি, ডুবেছে পাহাড়ি ঢল আর সাগরের জোয়ারে।
বোদ্ধাদের মতে, সাগরের প্রবল জোয়ার চট্টগ্রাম মহানগরের দিকে ছুটে না এলে বৃষ্টির পানি ও পাহাড়ি ঢল কর্ণফুলী নদী হয়ে সাগরে চলে যেত। জোয়ারের পানি উল্টো নগরে ঢুকে যাওয়ায় জলাবদ্ধতার মূল কারণ। আর প্রতিবছর বর্ষায় সাগরে যখন ঘূর্ণিঝড় বা নিম্নচাপ সৃষ্টি হয় তখন জোয়ারের উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে যায়। যা ধেয়ে আসে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকাসমুহে। ডুবে যায় বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ক্ষতিগ্রস্ত হয় পেশাজীবী মানুষ।
জোয়ারপ্রবণ বঙ্গোপসাগর। তবে সৃষ্ট জোয়ার শুধু ক্ষতির কারণ হয় না, মানুষের উপকারও বয়ে আনে। জোয়ারে সমুদ্রের গভীরতা বেড়ে আন্তর্জাতিক আমদানি-রফতানির পণ্য পরিবহণে জাহাজ চলাচল সহজ হয়। নদীতে প্রবেশ করা জোয়ারের পানি কৃষি উৎপাদনে অকল্পনীয় ভূমিকা রাখে। নদী ও সাগরে মাছসহ জলজপ্রাণীর বংশবিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু জোয়ার ভয়ংকর হয়ে উঠে বর্ষাকালে। বিশেষ করে জুন-জুলাই মাসে। বাংলা আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে। এই দুই মাস জলবায়ুর প্রভাবে সাগরে সৃষ্টি হয় একের পর এক নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়। তখন সাগর উত্তালে ফেটে পড়ে। সাগরের জোয়ারের উচ্চতা পুরো বছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে এ সময় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অন্যদিকে আকাশ থেকে ভেঙে পড়ে ভারী বৃষ্টি। অন্য যেকোনো সময়ের বৃষ্টি নিচের দিকে কর্ণফুলী নদী হয়ে সাগরে নিমজ্জিত হলেও এ সময়ের বৃষ্টি নামতে পারে না, কারণ সাগরের জোয়ারের পানি তখন ঊর্ধ্বমুখী হয়ে কর্ণফুলী নদীর মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশ করে। এতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ফেনী-নোয়াখালীসহ বৃহত্তম চট্টগ্রাম জেলার সবকটি উপকূলীয় উপজেলা ডুবে যায়।

আর্থ.অর্গ (Earth.Org) ২১০০ সালের মধ্যে চরম বন্যায় চট্টগ্রাম কীভাবে সাগরের গ্রাসে হারিয়ে যেতে পারে পারে তার একটি মানচিত্র তৈরি করেছে। মানচিত্রে দেখানো হয়েছে, বঙ্গোপসাগরে তিন দশক আগে স্বাভাবিক সময়ে ঢেউ আছড়ে পড়ত সর্বোচ্চ ১-১.৫ মিটার উচ্চতায়। যা বর্তমানে ২.৮-৩ মিটার উচ্চতায় আছড়ে পড়ছে। ২১০০ সালের দিকে সেটা বেড়ে ৫ মিটার উচ্চতা ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর সাগর উত্তাল সময়ে সেটা ৩-৫ গুণ বেশি উচ্চতায় আছড়ে পড়বে। যা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে চট্টগ্রাম সাগরের গ্রাসে হারিয়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে বঙ্গোপসাগর ধীরে ধীরে সে লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে।
আর্থ.অর্গের মতে, এই শতাব্দীর শেষে বৈশ্বিক গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২ মিটার বৃদ্ধি পাবে বলে অনুমান করা হয়েছে। তবে স্থানীয় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি (SLR) নির্ধারণ করার জন্য, স্থানীয় উপকূলীয় বন্যার স্তর বিবেচনায় নিতে হয়, যা চরম পূর্বাভাসে গড় উচ্চ-জোয়ারের (MHHW) চেয়ে ২.৮ মিটার বেশি হতে পারে। এই স্থানীয় স্তরগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পূর্বাভাসে ১ মিটার থেকে ৬.৫ মিটার পর্যন্ত তারতম্য নিয়ে আসে (যেমন, রিও বনাম কলকাতা)।
কপ প্রমুখের দুটি বহুল উদ্ধৃত জার্নাল থেকে, যা মূলত সমুদ্রের তাপীয় প্রসারণ এবং বরফ গলার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অনুমান করে। মধ্যম-পরিসরের দৃশ্যকল্পটি আইপিসিসি (IPCC) দ্বারা সংজ্ঞায়িত বিভিন্ন রিপ্রেজেন্টেটিভ কনসেন্ট্রেশন পাথওয়েজ (RCP)-এর ওপর ভিত্তি করে ০.৫-১.২ মিটার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রক্ষেপণ করেছে। অন্যদিকে হতাশাবাদী দৃশ্যকল্পটি বরফ-চাদর গলার আরও কিছু প্রক্রিয়া যুক্ত করে ২১০০ সালে ১-২.৫ মিটার এবং ২৩০০ সালে ১০ মিটার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রক্ষেপণ করেছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির একটি প্রত্যক্ষ প্রভাব হলো উপকূলীয় বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধি। মুইস এট আল., (২০১৬)-এর গ্লোবাল টাইডস অ্যান্ড সার্জ রিঅ্যানালাইসিস-এর উপর ভিত্তি করে অনুমান করা হয় যে, উপকূলীয় জলের চরম স্তর গড় স্তরের চেয়ে ০.২-২.৮ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে চীন এবং নেদারল্যান্ডসের মতো চরম ক্ষেত্রে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৫-১০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। এখানে প্রক্ষেপিত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির (SLR) সাথে উপকূলীয় স্থানীয় বন্যার স্তর যোগ করা হয়।
এটি আইপিসিসি (IPCC) দ্বারা সংজ্ঞায়িত গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্বের গতিপথ (RCP) বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়। মৃদু স্তরটি ২ক্ক সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির RCP৪.৫-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি; যেখানে চরম স্তরটি ৪ক্ক সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির জঈচ৮.৫-এর উপর ভিত্তি করে তৈরি।

এই গবেষণায় ব্যবহৃত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির (SLR) দৃশ্যকল্পগুলো ক্লাইমেট সেন্ট্রাল-কোস্টাল রিস্ক স্ক্রিনিং টুলের পূর্বাভাসের উপর ভিত্তি করে নিম্নলিখিত প্যারামিটারগুলোসহ তৈরি করা হয়েছে। দুটি পরিস্থিতির জন্য ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পূর্বাভাস, যেখানে বৃদ্ধির পরিমাণ মিটারে উল্লেখ করা হয়েছে (হালকা = ৩ মিটার; চরম = ৫ মিটার)।
সমূদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার বিষয়টি অনুধাবন করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বলে জানান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সহকারী প্রকৌশলী রাজীব দাশ। তার মতে, নগরীর ৬৯ ভাগ এলাকা সাগরপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা মাত্র ০.১৯ মিটার, সেখানে আসা জোয়ারের গড় উচ্চতা ২.৫০ মিটার। মাত্র ২২ শতাংশ মহল্লার উচ্চতা পাঁচ থেকে ৩০ মিটার। এসব এলাকা এখন পর্যন্ত জোয়ারে প্লাবিত হওয়া থেকে সুরক্ষিত। তাছাড়া পাহাড়ি জমির ৯ শতাংশ এলাকার উচ্চতা ৩০ থেকে ৯০ মিটার।
সে হিসেবে নগর পরিকল্পনাবিদদের মত অনুসারে, চট্টগ্রামকে তিন ভাগে ভাগ করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সীতাকুন্ডের ফৌজদারহাট থেকে কর্ণফুলী নদীর মোহনা পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ১৮ ফুট উচ্চতার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। যা আউটার রিং রোড নামে পরিচিত।
এছাড়া শাহ আমানত সেতু থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সাড়ে ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ১০ মিটার উচু বেড়িবাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ প্রায় শেষের পথে। এছাড়া ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর ৩৬টি খাল খননসহ জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজও প্রায় শেষের পথে বলে জানান প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্ণফুলী নদী হয়ে চট্টগ্রাম শহরে জোয়ারের পানি অনুপ্রবেশ বন্ধে ৪০টি স্রোত নিয়ন্ত্রক (টাইডাল রেগুলেটর) বসানোর কাজ করছে। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকায় 'চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলমগ্নতা/জলাবদ্ধতা নিরসন ও নিষ্কাশন উন্নয়ন’ শীর্ষক আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

এর আওতায় চট্টগ্রাম বিমান বন্দর, মহেশখাল, শাহ আমানত সেতু, কালুরঘাট এবং হালদা নদীর মুখে আরও ২৩টি টাইডাল রেগুলেটর স্থাপন করা হবে। এছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও চাক্তাই খাল এবং রাজাখালে আরও ১২টি রেগুলেটর বসানোর কাজ করছে। শহরে জলাবদ্ধতা নিরসনে এর মধ্যে পাঁচটি রেগুলেটর স্থাপন আগামী বছরের মধ্যেই 'খাল পুনঃখনন, সংস্কার এবং উন্নয়ন' প্রকল্পের আওতায় শেষ হবে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মোহামদ্দ শাহ আলী।
কিন্তু এসব প্রকল্পের তেমন কোনো সুফল মিলছে না, প্রতি বছরের মতো এবারও বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে ডুবেছে চট্টগ্রাম মহানগর। ডুবেছে জেলার উপকুলীয় উপজেলা আনোয়ারা, বাঁশখালী, সীতাকুন্ড, মিরসরাই, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, ফটিকছড়ি, পটিয়া, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া। ডুবেছে কক্সবাজার জেলার সবকটি উপজেলা ও ফেনী-নোয়াখালী জেলার প্রত্যন্ত এলাকাও।
আর্থ. অর্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের বৃহত্তম বন্দরনগরী এবং আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এটি কর্ণফুলী নদীর চারপাশের একটি পাহাড়ি এলাকায় গড়ে উঠেছে, যা শহরের কেন্দ্র দিয়ে বয়ে গিয়ে চট্টগ্রামের ১২ কি.মি পশ্চিমে অবস্থিত একটি মোহনার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।
উপকূলীয় জোয়ারের সময় এখানকার মানুষ নিয়মিত বন্যার সম্মুখীন হয়, যা পুরো এলাকাকে অচল করে দেয় এবং মানুষকে নিজেদের ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে বাধ্য করে। কিন্তু প্রবেশপথ বন্ধ করতে এবং মেঝে উঁচু করতে যতই চেষ্টা করা হোক না কেন, বন্যাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়।
এই উপদ্রবের আরও ভয়াবহ রূপটি আসে ভারী বর্ষণের মাধ্যমে, যা মারাত্নক ভূমিধস এবং আকস্মিক বন্যার কারণ হয়। এর মুলে চেপে বসে আছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার মুলে রয়েছে পাহাড় নিধন। পলিথিন ব্যবহারের আধিক্যতা, যত্রতত্র অপরিকল্পিত বর্জ্য নিক্ষেপ। যা নিরূপণই এখন বড় সমস্যা।
অভিযোগ রয়েছে, এসব সমস্যা আড়াল করে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধস নিয়ে ঘাম ঝরাচ্ছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সরকারি সংস্থা। যারা কথায় ঘাম ঝরালেও কার্যত সঠিক সমস্যা নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। এতে পাহাড় নিধন যেমন চলছে, তেমনি চলছে পলিথিনের অবাধ ব্যবহার ও বর্জ্য নিক্ষেপ। যা প্রথমে নগরীর নালা-খালে, পড়ে কর্ণফুলী নদিতে গিয়ে পড়ছে। এরপর গিয়ে সাগরে তলদেশে জমছে। এতে কর্ণফুলীর তলদেশ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েই চলেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড় রক্ষার নামে একদিকে যেমন শত কোটি টাকা ব্যয়ে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ চলছে, তেমনি পলিথিনের অবাধ ব্যবহার বন্ধে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, চসিক ও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে অভিযান পরিচালনার নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হচ্ছে। নালা-নর্দমা, খাল পরিষ্কারের নামে জলে ঢালছে সরকারের কোটি কোটি টাকা। এতে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। কারণ এসব কাজের গোড়ায় পানি ঢালছে সরকারি সবগুলো সংস্থার দায়িত্বশীল লোকজন।
খোঁজ নিলেই দেখা মিলবে, সিডিএ ও চসিক খোদ পাহাড় কেটে সাবাড় করছে। তাদের সাথে আঁতাত করছে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদফতর। পলিথিন উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীদের সাথেও তাদের আঁতাত রয়েছে। আবার সরকারি প্রকল্প থেকে কমিশন খাওয়ার বিলাসীতায় মত্ত সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতিতে বসবাসের প্রায় অযোগ্য হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম শহর।
সিডিএর তথ্যমতে, চট্টগ্রাম মহানগরীর ৬৯ ভাগ এলাকা সাগরপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা মাত্র দশমিক ১৯ মিটার, সেখানে আসা জোয়ারের গড় উচ্চতা ২.৫০ মিটার। পাহাড় নিধনসহ পরিবেশ বিরোধী কর্মকাণ্ড এখনই না থামালে মাত্র ২০ বছরের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আরও ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। তখন নগরীর আরও ২২ শতাংশ এলাকা জোয়ারের পানিতে ডুবে যেতে পারে। এতে চট্টগ্রামের নাগরিকসহ বাংলাদেশের আরও ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হবে। যা ২১০০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ২ কোটি ৭০ লক্ষে পৌঁছাতে পারে। নিরাপদ থাকতে পারে শুধুমাত্র পাহাড়ি জমির ৯ শতাংশ এলাকা। যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০-৯০ মিটার উচ্চতায় রয়েছে।
টানা বর্ষণে গত পাঁচদিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ধসে অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে ২০ জন, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানে পাঁচজন করে ১০ জন এবং রাঙামাটিতে একজন মারা গেছেন।
পাহাড়ধসে বারবার প্রাণহানির বিষয়টি উল্লেখ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, 'খাসজমি ও অন্যান্য সরকারি জমিতে বাড়ি তৈরি করে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনে সরকার প্রস্তুত। ভবিষ্যতে পাহাড়ধসে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানান্তর উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করতে হবে।'
সূত্র মতে, ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রাম মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় টানা বৃষ্টির কারণে ভয়াবহ পাহাড় ও দেয়াল ধস এবং তীব্র পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে মারা যায় ১২৭ জন। পরের ১৯ বছরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অতিবৃষ্টির সময় পাহাড় ও দেয়াল ধসের ঘটনায় মারা গেছে ২১০ জনের মতো।
চট্টগ্রামে ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট পাহাড় ধসে ১১ জন, ২০১১ সালের ১ জুলাই ১৭ জন, ২০১২ সালের ২৬ জুন ২৪ জন, ২০১৩ সালের ২৮ জুলাই দুজন, ২০১৫ সালের ১৮ জুলাই আটজন নিহত হয়, ২০১৭ সালের জুন মাসে একাধিক ঘটনায় সাতজন। ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর চারজন, ২০২২ সালের ১৮ জুন চারজন নিহত হয়। অন্যান্য বছরগুলোতেও নিহত হন অনেকে।
পাহাড় এভাবে ভয়ংকর রূপ ধারণ করলেও বসতিদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই সেদিকে। খোদ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন বলছে, জেলার ২৬টি পাহাড়ে ৬ লাখেরও বেশি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসত করছে। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, এ সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি। যাদের শুধু বর্ষা এলেই পাহাড় থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে তোড়জোর চালায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

তার ব্যতিক্রম নয় এবারও, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের নিরাপদ আশ্রয় দিতে নগরীর চান্দগাঁও, আগ্রাবাদ, কাট্টলী ও বাকলিয়া সার্কেলের আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রেখেছে বলে জানান চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত কমিশনার (সার্বিক) মো. ওমর ফারুক।
তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বসতিদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া ও আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনায় সরকারের ত্রাণ তহবিল থেকে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রয়েছে। এরপরও বসতিদের সরিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না, বসতিরা ঘরবাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে রাজী নন।
দেশের প্রধান বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম একটি দ্বিমাত্রিক শহর। এই আধুনিক নগরে জলাবদ্ধতা নিরসনে নানা প্রকল্প সিটি করপোরেশন হাতে নিলেও, কার্যত বর্ষা এলেই বৃষ্টির পানিতে ডুবে। যার ব্যতিক্রম হয়নি এবারও। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও সাগরের জোয়ারে ডুবেছে চট্টগ্রাম শহর ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকা। ফলে নগরবাসী মনে করছে আধুনিক এই শহরের পানিই হচ্ছে পানিশমেন্ট।
নগরবাসীর মতে, টানা বর্ষণে নগরীতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। সড়কের পাশাপাশি রেল লাইন ডুবে যাওয়ায় নগরীর ষোলশহর এলাকায় হাজারো যাত্রী নিয়ে আটকে ছিল পর্যটন এক্সপ্রেস। খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের একাধিক স্থানে পানি উঠে যাওয়ায় এ সড়কে সরাসরি সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ ছিল। এতে খাগড়াছড়ির সঙ্গে রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
টানা প্রবল বর্ষণে বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম নাফাখুম জলপ্রপাত এলাকায় ঘুরতে গিয়ে আটকে পড়ে ৬৯ পর্যটক। তাদের সঙ্গে ছিলেন আরও ১০ জন ট্যুরিস্ট গাইড। এছাড়াও টানা ভারী বৃষ্টিতে কক্সবাজার জেলার ৯টি উপজেলার অন্তত ৩৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। আর চট্টগ্রামে প্রায় ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ মাহমুদুল আলমের তথ্যমতে, মঙ্গলবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে বৃষ্টি হয়েছে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার। এতে কার্যত অচল হয়ে পড়ে চট্টগ্রাম। এর আগে ২০০৭ সালের ১১ জুন একদিনে বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল ৪০৮ মিলিমিটার।
সেদিন চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল আর পাহাড়ধসে মারা যান ১২৭ জন। সেই ১১ জুনকেও ছাপিয়ে গেছে মঙ্গলবারের ৪১২ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত। কিন্তু সেদিনের মতো এত প্রাণহানি ঘটেনি। তবে একেবারে ঘটেনি তা নয়, পাহাড় ও দেয়ালধসে মারা গেছে ৩৩ জন। আহত হয়েছেন আরও অনেকেই।
সূত্র মতে, গত জুন মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল ৬১৩ মিলিমিটার, হয়েছে ৩৫১। আর জুলাই মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ সাধারণত ৬৯৪ মিলিমিটার। কিন্তু মঙ্গলবার এক দিনের বৃষ্টিতে তা অর্ধেক পার হয়ে গেছে। এই বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, দোকানপাট, বাসাবাড়ি সব। নগরীর কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ, বহদ্দারহাট, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, চান্দগাঁও, আগ্রাবাদ ব্যাংক কলোনি, সিডিএ আবাসিক, সল্টগোলা ক্রসিং ও হালিশহর এলাকাসহ সর্বত্র পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
চকবাজার এলাকার বাসিন্দা আবুল মনছুরের অভিযোগ, প্রতিবছরের মতো এবারও ভারী বর্ষণে একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে নানা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে পানি জমে মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ ও নিম্ন আয়ের কর্মজীবীদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি।
হালিশহর কে এবং এল ব্লকের সমাজ কল্যাণ সমিতির প্রেসিডেন্ট গোলাম মোস্তফা বলেন, ২০০৫ সালের পর থেকে এলাকাটি কমপক্ষে এক থেকে দেড় মিটার জোয়ারে প্লাবিত হচ্ছে। একারণে এলাকায় বাড়িভাড়া কমপক্ষে ৪০ - ৫০% কমে গেছে।
‘জোয়ারের পানি কমপক্ষে পাঁচ ঘণ্টা থাকে। এজন্য আমরা জোয়ারের পূর্বাভাসসহ ক্যালেন্ডার ঘরে রাখি। আমাদের প্রতিটি দিনের শুরু সেই মাফিকই হয়,' বলছিলেন চট্টগ্রাম মহানগরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত অভিজাত এলাকাটির এক বাসিন্দা জসীম উদ্দিন। তিনি বলেন, এভাবেই প্রতিদিন দুইবার বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জোয়ারের স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনযাপনের চেষ্টা করছেন স্থানীয়রা।

আগ্রাবাদের বাণিজ্যিক এলাকায় নগরীর বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দপ্তর। যার মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। বন্দরনগরীর এসব প্রতিষ্ঠান জোয়ারের পানিতে প্রভাবিত হচ্ছে। ২০১৬ সালে চালু হওয়া বাণিজ্য ট্রেড সেন্টারে গত দুই-তিন বছর ধরেই পানি প্রবেশ শুরু হয়েছে। আর এবার জোয়ারের পানিতে পুরো এলাকায় প্লাবিত হয় বলে জানান চট্টগ্রাম চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্টির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোকাম্মেল হোসেন।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং সে কারণে আসা উঁচু জোয়ার শুধু নাগরিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে না, বরং ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বাণিজ্যিক এলাকার ব্যবসাগুলোতে। একারণে দেশের বৃহত্তম পাইকারি পণ্য বাজার খাতুনগঞ্জ এবং আসাদগঞ্জের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পণ্য নষ্টের কারণে কমপক্ষে ১,০০০ কোটি টাকা বাৎসরিক ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি করেছে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ড্রাস্টিজ অ্যাসোসিয়েশন।
প্লাবিত হচ্ছে চট্টগ্রামের অবস্থিত মা ও শিশু হাসপাতাল, সবুজবাগ আবাসিক এলাকা এবং সিডিএ আবাসন প্রকল্প সংলগ্ন হালিশহরের কিছু অঞ্চল। সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছে শোলকবার এলাকা, কারণ সাগরপৃষ্ঠ থেকে সেখানকার উচ্চতা মাত্র দশমিক ১৯ মিটার, সেখানে আসা জোয়ারের গড় উচ্চতা ২.৫০ মিটার।
সিডিএ আবাসিক অঞ্চলে ২১ নম্বর রোডের দুটি ডুপ্লেক্স বাড়িতে এক সময় প্রাক্তন মন্ত্রী মরহুম এল কে সিদ্দিকী এবং তাঁর স্ত্রী মাহমুদা সিদ্দিকীর আবাস ছিল। ১৯৭৭ সালে প্রায় ৩,৩৮০ বর্গমিটার জমিতে বাড়ি দুটি নির্মাণ করা হয়। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত এখানেই বসবাস করেছেন সিদ্দিকী দম্পতি। কিন্তু সম্প্রতি ২০১৮ সালে বাড়ি দুটি সম্পূর্ণরূপে ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন তাদের উত্তরাধিকারীরা।
এল কে সিদ্দিকীর বড় ছেলে আসসান সিদ্দিকী বলেন, ১৯৯২ সালে যখন বাড়িগুলোর নিচতলায় পানি ঢোকা শুরু করেছিল, তখন আমরা ঢাকা গিয়ে বসবাস শুরু করি। মাঝেমাঝে চট্টগ্রামে আসলে তখন বাড়িদুটি ব্যবহার করা হতো। কিন্তু গত ১০ বছরে জলাবদ্ধতার কারণে সেখানে থাকা সম্ভব হচ্ছে না।
২১ নম্বর সড়কের আরেক বাসিন্দা সাবেক নাবিক এবং জাহাজীকরণ ব্যবসায়ী মীর রেজওয়ান হোসেইন টিপু – ১৯৭৬ সালে ১,৫২১ বর্গমিটার জমিতে তার বাড়ি তৈরি করেছিলেন। তিনি বলেন, ১৯৯০ এর দশকের আগে আমরা কখনও বাড়িতে পানি ঢোকার এই সমস্যার মুখে পড়িনি। ওই সময় থেকেই প্রতি বছর এলাকার পানিতে ডুবে যাওয়া এলাকার পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তখন আমরা নিচতলাগুলোকে উঁচু করে সেই সমস্যা মোকাবিলার চেষ্টা করি।
টিপু বলেন, ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সাল নাগাদ আমি বাড়ির নিচতলা কমপক্ষে পাঁচফুট উঁচু করিয়েছি, কিন্তু তারপরও প্রতিবছর পানির উচ্চতা যেভাবে বাড়ছে- তাতে এ চেষ্টা বৃথা বলেই মনে হচ্ছে।' চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাবা-মা এবং আমার শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি-বিজড়িত সেই বাড়িটি চিরতরে ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। এখন পরিবারসহ ভাড়া বাড়িতে বসবাস করছি।
টানা ভারী বৃষ্টিতে কক্সবাজার জেলার ৯টি উপজেলার অন্তত ৩৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল ও নদীর পানি বাড়ায় রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকার অনেক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত এর আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল এবং বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বাড়ায় রামু ও চকরিয়ার অন্তত ১৪টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েক শ ঘরবাড়ি। এ ছাড়া কক্সবাজার পৌরসভা, টেকনাফ, উখিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, ঈদগাঁও ও কুতুবদিয়ার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে প্লাবিত হয়েছে। বৃষ্টির কারণে রোববার দিবাগত রাতে একাধিক পাহাড়ধসের ঘটনায় আশ্রয়শিবিরে ৯জন রোহিঙ্গা এবং কক্সবাজার শহরের একজন বাসিন্দা নিহত হন। এ ছাড়া পেকুয়া উপজেলায় মাটির ঘর ধসে পড়ে এক শিশুর মৃত্যুর হয়েছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, গত ২০২৩ সালের ৭ আগস্ট এক দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ায় বন্যা দেখা দিয়েছিল। তখন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনটি সদ্য স্থাপন করা হয়েছিল। উদ্বোধনের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু বৃষ্টি ও ঢলজনিত বন্যায় বেঁকে গিয়েছিল নতুন ওই রেলপথের প্রায় তিন কিলোমিটার।
সেদিন ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছিল মাত্র ৩২২ মিলিমিটার। শুধু চট্টগ্রামে নয়, ওই দিন বৃষ্টি হয়েছিল সাতকানিয়ার পূর্বদিকের জেলা বান্দরবানেও। সেখানকার পাহাড়ের ঢলও নেমে এসেছিল উপজেলাটির ওপর। এর আগে ২০১৭ সালের ১৩ জুন চট্টগ্রামের পাশাপাশি রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে পাহাড়ধসে প্রায় ১৫০ জন মারা যায়। সেদিন চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত ছিল ১৭৭ মিলিমিটার। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ছিল রাঙামাটিতে।

চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের আরেক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল ২০১২ সালের ২৬ জুন, নগরীর আকবরশাহ মাজার এলাকায়। মারা গিয়েছিল ২৮ জন। ওই দিন ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৬৩ মিলিমিটার। যা মঙ্গলবারের চেয়ে প্রায় ৫০ মিলিমিটার বেশি ছিল।
তবে চট্টগ্রাম আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের সর্বকালের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ২৪ ঘণ্টায় ৫১১ মিলিমিটার। ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট এটি রেকর্ড করা হয়েছিল। সে হিসাবে গত মঙ্গলবার বৃষ্টিপাত প্রায় ১০০ মিলিমিটার কম হয়। এরপরও সমুদ্রের পানির উচ্চতা চট্টগ্রাম নগরীর ১৮ শতাংশ এলাকায় ০.৫-২.৫ পর্যন্ত বেড়েছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, আগ্রাবাদে সিডিএ'র তৈরি আবাসিক এলাকা, পূর্ব বাকালিয়া, দক্ষিণ বাকালিয়া, হালিশহর, শোলকবাহার, মুরাদপুর এবং বাহাদুরাঘাট অঞ্চল। দৈনিক এসব এলাকা প্লাবিত করা জোয়ারের পানির গড় উচ্চতা ২.৫ থেকে ২.৭৬ মিটার।
তাছাড়া মৌসুমি বৃষ্টি, নতুন চাঁদ উঠার কালে, পূর্ণ চাঁদনী রাতে এবং সাইক্লোনের সময়ে ৫১ শতাংশ এলাকায় পানির স্তর ২.৫-৪.৫ মিটার পর্যন্তও বাড়ে। গত ২১ আগস্ট কর্ণফুলী নদীতে আসা জোয়ারের উচ্চতা ৪.৮১ মিটার উচ্চতা লাভ করে। পরের দিন আসা জোয়ারের উচ্চতা ছিল ৪.৬৬ মিটার।
চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মো. রিয়াজ আক্তার মল্লিক জানান, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি চট্টগ্রাম নগরীকে মারাত্মক রকম প্রভাবিত করেছে। প্রতিবছর যেমন (সাগরের) পানির উচ্চতা বাড়ছে, একইসঙ্গে পানি নেমে যাওয়ার মতো নিম্নাঞ্চল (জলাভূমির) সংখ্যা কমছে। গত কয়েক দশকে এমন এলাকার সংখ্যা ৫০% হ্রাস পেয়েছে।'
অধ্যাপক মল্লিক জানান, নিষ্কাশন নালায় যেন বর্জ্য না ফেলা হয়- সে ব্যাপারটি নিশ্চিত করতেও একটি কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা দরকার। এমনটা না করা হলে, শুধু স্রোত নিয়ন্ত্রক বসানো কোনো কাজে আসবে না' বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া সমস্যার মুলে যেটা, সেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা হ্রাসে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সার্থে কর্ণফুলী নদির গভীরতা বাড়াতে হবে। পানি ধারণ ক্ষমতা নগরীর উচ্চতার লেবেলের নিচে রাখা গেলে জলাবদ্ধতা থেকে স্থায়ী মুক্তি শিলতে পারে। সেই সাথে উপকুলীয় এলাকাগুলোকেও বঙ্গোপসাগরের জোয়ার মুক্ত রাখতে আশপাশের খাল ও নদির গভীরতা তৈরি করতে হবে।
জোয়ারের পানি শহরে প্রবেশ না করতে পারে এজন্য জোয়ার নিয়ন্ত্রণে টাইডাল রেগুলেটর নির্মাণে গতি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি জোয়ারের পানি ধারনে শহরে জলাধার নির্মাণ করাটাও জরুরি বলে জানান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নগর পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ একেএম রেজাউল করিম।
তিনি বলেন, কর্ণফুলী নদীতে যেন জোয়ারের পানি বেশি পরিমাণে নিষ্কাশন করা যায় এজন্য নগরীর জলাশয় এবং খালগুলোর পাশে জেনারেটরসহ পা¤প বসানো উচিত।' এছাড়া আরও বেশি সবুজ এলাকা এবং খালের পরিমাণ বাড়ানোর প্রতি গুরুত্ব দেন তিনি। একইসাথে এসব বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি।
আইকে/জেবি