Dhaka Mail Logo

জাতীয়

বাঁশ পাতার চা খেয়েছেন কি কখনো?

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

১১ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম

  •  ৬০ প্রজাতির বাঁশ এসেছে মেলায়
  • দেখা মিলবে ২৬ সেন্টিমিটার মোটা বাঁশের
  • ১১০ প্রজাতির বিলুপ্ত বনজ বৃক্ষের সমাহার

চা তো জীবনে অনেক খেলেন। চা পাতার চা, মরিচ চা, কমলা চা, তেতুঁল চা প্রভৃতি। কিন্তু বাঁশ পাতার চা কি কখনো খেয়েছেন? যদি না খেয়ে থাকেন; খাওয়ার সুযোগ পেতে সোজা চলে যেতে পারেন ঢাকার আগারগাঁওয়ে চলমান বৃক্ষ মেলায়। যেখানে আপনি সহজেই এই চা খেতে পারবেন। স্টল নং-২৪-২৫।

জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬ এ ৬০  প্রজাতির দেশি-বিদেশি বাঁশের চারা, বাঁশের আসবাপপত্র, ব্যবহার্য জিনিসপত্র এবং বাঁশ পাতার চা নিয়ে হাজির হয়েছে কোয়ান্টাম ব্যাম্বুরিয়ান নামের একটি প্রতিষ্ঠান। যারা বান্দরবান এলাকার বাঁশ ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করছে।

তারা মেলায় ৬০ প্রজাতির বাঁশের চারা নিয়ে হাজির হলেও তাদের সংরক্ষণে রয়েছে ২১০ প্রজাতির বাঁশ। প্রতিষ্ঠানটি এসেছে বান্দরবানের লামা উপজেলা থেকে। যদিও আমাদের দেশে সাধারণত ৩০ প্রজাতির বাঁশের দেখা মেলে।

‘অন্যকে বাঁশ দেওয়া’ একটি অত্যন্ত পরিচিত অপ্রাতিষ্ঠানিক বা প্রচলিত কথ্য শব্দবন্ধ। সহজ কথায় এর অর্থ হলো কাউকে বিপদে ফেলা বা কোনো ক্ষতি করা অথবা অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলা। এটি মূলত কাউকে ঘায়েল করার বা কারো পরিকল্পনা নষ্ট করে দেওয়ার নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। 

কিন্তু সেই বাঁশকে জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের উপযোগী করতে কাজ করছে কোয়ান্টাম ব্যাম্বুরিয়ান। প্রতিষ্ঠানটি এবার দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় বৃক্ষ মেলায় অংশ নিচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তারা শুধু বাঁশ, বনজ, ফুল ও বনজ ওষুধি গাছের চারােই নিয়ে আসেননি তারা মেলায় বাঁশের তৈরী বাসার বাড়ীতে ব্যবহারে লাগে বিভিন্ন জিনিসও এনেছেন। যেগুলো প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। তাদের কাছে মিলছে বাঁশের বোতল, মগ, ফুলদানি,মোবাইল রাখার স্ট্যান্ড, 

বাঁশ পাতার চা-এ কী আছে?

বাঁশ পাতার চায়ের ব্যাপারে তার কাছে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির কিউরেটর সাইফুদ্দিন সাইফ বলেন, ব্যাম্ব লিফ টি। এটা আমি চায়নাতে খেয়ে এসেছি। বাঁশপাতার মধ্যে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আছে। অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল রূপে এর মধ্যে প্রধান উপাদান হিসেবে থাকে প্রচুর পরিমাণে সিলিকা। ম্যাক্সিমাম ফুডেই এই জিনিসটা পাওয়া যায় না। কিছু সামুদ্রিক খাবারের মধ্যে সিলিকা থাকে এবং এটার নখের জন্য ভালো, হাড়ের জন্য ভালো, স্কিনের জন্য ভালো। বয়স হয়ে গেলে অনেকে কোলাজেন ইনজেকশন নেন। চামড়া ঝুলে যায় সেই বয়সে। কিন্তু স্কিনের ইলাস্টিসিটি বাড়াতে সাহায্য করা এটা কোলাজেন প্রোটিনও রয়েছে এই চায়ে। ইনজেকশনের বদলে এটা ন্যাচারালি হচ্ছে। এটা আপনার গ্রোথ নিশ্চিত করবে। স্কিনের ইলাস্টিসিটি বাড়বে এবং এই বাঁশ পাতার চা খুবই উপকারি এবং সুস্বাদু। চীনে এই চা বহুল প্রচলিত। বাংলাদেশে আমরা গতবারের মেলায় সাড়ে ৬ হাজার লোককে অলরেডি খাইয়েছি।

আমাদের যে লোকাল বাঁশপাতা আছে এগুলো দিয়ে সম্ভব কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হতে পারে কারণ সব পাতারই। আমরা যেটা এখানে ইন্ট্রোডিউস করছি সেটা চীনের একটা প্রজাতি। বাংলাদেশের এগুলোও হতে পারে; অন্যান্য জাতগুলোর ফ্লেভার নিয়ে আমরা চেষ্টা করছি। সবগুলোই খাওয়া যাবে।

Tea

বাঁশের কি বিভিন্ন ব্যবহার সম্ভব?

সাইফুদ্দিন সাইফ বলেন, আমরা এবার মেলায় ৬০ প্রজাতির বাঁশ ও ১২০ প্রজাতির বনজ ফুল ও ঔষধি গাছ এনেছি। পাশাপাশি কিছু বাসার প্রোডাক্টও এনেছি। আমরা চাই মানুষ ইকোফ্রেন্ডলি প্লান্ট বা প্রোডাক্টগুলো ব্যবহার করতে শিখুক। একটা প্লাস্টিকের বোতল পরিবেশে থেকে যায়; ৫০০ বছরেও ধ্বংস হয় না। এর বিকল্প হিসেবে আমরা বাঁশের বোতল এনেছি। প্লাস্টিকের মগ আছে, প্লাস্টিক বা কাচের বোতল আমরা ব্যবহার করতে পারি। মানে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে আমরা এগুলো ব্যবহার করতে পারি। আর দৈনন্দিন যে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর মধ্যে আমাদের আছে ফাইল হোল্ডার। আমরা চাই মানুষ ইকো ফ্রেন্ডলি প্রোডাক্টের দিকে ঝুঁকে পড়ুক।

বাঁশের সম্ভাবনা

বাঁশ নিয়ে সম্ভাবনার কথাও জানালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ুয়া প্রতিষ্ঠানটির এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আমরা বাঙালিরা তো বাঁশকে নেতিবাচক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করি বা বাঁশ দেই আর বাঁশ খাই। কিন্তু বাঁশ নিয়ে কমপক্ষে ৪০টি সেক্টরে কাজ করা যায়। আমি বিভিন্ন দেশে গিয়েছি। ইন্দোনেশিয়া ও চায়না ছাড়াও ভারত এবং থাইল্যান্ডে দেখেছি; তারা বাঁশকে রীতিমতো শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আমরা জানি বাঁশ থেকে কাগজ হয়; কিন্তু বাঁশ থেকে ওষুধ, পেট্রোল ও ইথানলও তৈরি হচ্ছে।

বাঁশ শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আরও বলেন, ভারত গত বছর ৩২ হাজার কোটি টাকার একটা প্রজেক্ট করেছে। ইতোমধ্যে ব্রাজিল ৫০ শতাংশ গাড়ি ইথানলে কনভার্ট করে ফেলেছে। পেট্রোল তো একটা জাতীয় সম্পদ একদিন শেষ হতে পারে। কিন্তু যদি বাঁশ থেকে জ্বালানি উৎপাদন করা যায় তাহলে সম্ভাবনা অসীম। শুধু তাই নয়, বাঁশ থেকে বিদ্যুৎ, টাইলস ও প্লাই হচ্ছে। বাঁশ অন্য গাছের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি অক্সিজেন উৎপাদন করে।

Bamboorean

১১০ প্রজাতির বিলুপ্ত গাছ নিয়েও কাজ করছেন তারা

কোয়ান্টাম ব্যাম্বুরিয়ানের কিউরেটর জানান, তাদের কাছে ১১০ প্রজাতির বিপন্ন বনজ গাছের সংগ্রহ আছে। তাদের একটা টিম আছে যারা বিভিন্ন রিজার্ভ ফরেস্টে ঘুরে বীজ সংগ্রহ করেন। যেমন বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু বৃক্ষ হচ্ছে বৈলাম। বৈলাম হারিয়ে যাচ্ছে। বৈলামের চারা আছে তাদের কাছে। তারা মেলায় বেশ কিছু বিলুপ্ত গাছের চারাও নিয়ে এসেছেন।

২৬ সেন্টিমিটার মোটা বাঁশের দেখা মিলবে মেলায়

সাইফুদ্দিন সাইফ জানান, তারা মেলায় ২৬ ইঞ্চি ব্যাসের বাঁশ নিয়ে এসেছেন। যেটাকে জড়িয়ে ধরে যে কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে। এই বাঁশ তারা বাংলাদেশে উৎপাদন করছেন।

তিনি বলেন, আমাদের আরেকটা বাঁশ সংগ্রহ আছে যার ইংরেজি নাম ডেন্ড্রোকলামাস জেগেন্টিয়াস। বাংলাদেশের সবচেয়ে মোটা যে বাঁশগুলো পাওয়া যায় তার মধ্যে এটা অন্যতম। এর পরিধি ২৫ থেকে ২৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। এই বাঁশের বেশ কিছু চারা আছে। এটা পাহাড়ি অঞ্চলে ১৯৫৩ সালে বার্মা থেকে পরবর্তীতে বাংলাদেশে অ্যাডজাস্ট করে গেছে। এই বাঁশ সাধারণত পাহাড়ি অঞ্চলে হয়। সারা বাংলাদেশে এটা হওয়া সম্ভব। আমরা বিভিন্ন জায়গায় দিচ্ছি। বিশেষ করে পঞ্চগড়ে। এই বাঁশ সমতলে হয়। এই বাঁশ মূলত ফার্নিচার মেকিং বা হস্তশিল্পে ব্যাপক হারে ব্যবহার করা হয়।

এমআইকে/এফএ