Dhaka Mail Logo

জাতীয়

প্রথমবার ডিজিটাল পরিচয়পত্র পাচ্ছে দেশের ৩০ হাজার খাল

আব্দুল হাকিম

০৭ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৬ পিএম

৩১৫ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প 
সিএস ও আরএস মানচিত্রের সমন্বয় 
বড়, মাঝারি ও ছোট—তিন শ্রেণিতে খাল 
কৃষি ও সেচ ব্যবস্থায় সহায়ক 
পুনঃখননে ডিজিটাল তথ্যভিত্তি

দেশের প্রায় ৩০ হাজার খালের জন্য প্রথমবারের মতো ডিজিটাল ‘পরিচয়পত্র’ তৈরি করতে যাচ্ছে সরকার। খালের অবস্থান, দৈর্ঘ্য, প্রবাহপথ, শ্রেণি, দখল-ভরাটের অবস্থা থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর তথ্য নিয়ে গড়ে তোলা হবে একটি জাতীয় ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার। ৩১ কোটি ৫৭ লাখ টাকার এ প্রকল্পের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের তথ্য ঘাটতি দূর করে খাল পুনরুদ্ধার, পুনঃখনন এবং সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ তৈরি হবে।

প্রকল্পের আওতায় দেশের সব জীবিত ও বিলুপ্ত খাল শনাক্ত করে বড়, মাঝারি ও ছোট- এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি খালের অবস্থান, উৎপত্তিস্থল, প্রবাহপথ, অববাহিকা, পানি ধারণ ও নিষ্কাশন সক্ষমতা, দখলের অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর তথ্য নিয়ে একটি সমন্বিত জিও-ইনফরমেটিক্স ডেটাবেস তৈরি করা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই তথ্যভাণ্ডার ভবিষ্যতে খাল পুনঃখনন, দখলমুক্তকরণ, কৃষি সেচ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘বাংলাদেশের খালসমূহ শনাক্তকরণ, শ্রেণিবিন্যাস এবং ভূ-তথ্যভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার প্রণয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি সম্প্রতি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রকল্প বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তা দেবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নদী নিয়ে ইতোমধ্যে একটি জাতীয় ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার তৈরি হলেও খাল নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার গড়ে ওঠেনি। ফলে কোথায় কতটি খাল রয়েছে, কোনটি সচল, কোনটি ভরাট হয়ে গেছে, কোনো খাল দখলের শিকার হয়েছে কিংবা কোন খালের দায়িত্ব কোন সংস্থার, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। এই তথ্যের অভাবে অনেক সময় একই খালে একাধিক সংস্থা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, আবার বহু গুরুত্বপূর্ণ খাল বছরের পর বছর অবহেলিত থেকে যাচ্ছে।

প্রকল্পের আওতায় জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (জিআইএস), রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি এবং কেডাস্ট্রাল (সিএস) ও রিভিশনাল (আরএস) ভূমি জরিপের মানচিত্র ব্যবহার করে সারাদেশের খালের ডিজিটাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হবে। প্রতিটি খালের উৎপত্তিস্থল, শেষপ্রান্ত, প্রবাহের ধরন, অববাহিকা, উপ-অববাহিকা এবং পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে খালের ওপর নির্মিত সড়ক, সেতু ও কালভার্টের অবস্থানও ডেটাবেজে যুক্ত করা হবে, যাতে কোথায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তা সহজেই চিহ্নিত করা যায়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশের অনেক খাল এখনো সিএস ও আরএস রেকর্ডে থাকলেও বাস্তবে সেগুলো ভরাট হয়ে গেছে কিংবা দখলদারদের কবলে পড়ে বিলুপ্ত হয়েছে। আবার অনেক খালের স্বাভাবিক প্রবাহ সড়ক, কালভার্ট বা অন্যান্য অবকাঠামোর কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় মাঠপর্যায়ে সরেজমিন যাচাইয়ের মাধ্যমে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হবে। শুধু সরকারি নথি নয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রবীণ বাসিন্দা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতেও তথ্য যাচাই করা হবে, যাতে প্রকৃত অবস্থা প্রতিফলিত হয়।

প্রকল্প নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার পলি জমে গঠিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ। দেশের কৃষি, সেচ, মৎস্য, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় খাল নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক খালের কোনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় তালিকা কিংবা বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস এতদিন তৈরি হয়নি। ফলে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে তথ্যের ঘাটতি রয়ে গেছে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন তথ্যভাণ্ডার তৈরি হলে খাল পুনঃখননের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ সহজ হবে। কোন খাল পুনরুদ্ধার করলে কৃষিতে বেশি সুফল মিলবে, কোথায় জলাবদ্ধতা কমবে কিংবা কোথায় পানি সংরক্ষণের সুযোগ বাড়বে, সে বিষয়ে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে খাল দখল ও ভরাটের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণেও এই ডেটাবেজ কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

প্রকল্পের আওতা খালের অবস্থান, প্রতিটি খালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো, পানি প্রবাহের বাধা, নিষ্কাশন সক্ষমতা এবং পরিবেশগত গুরুত্বও নথিভুক্ত করা হবে। ফলে ভবিষ্যতে নতুন সড়ক, সেতু কিংবা কালভার্ট নির্মাণের সময়ও পরিকল্পনাকারীরা খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বিবেচনায় নিতে পারবেন।

প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে স্থানীয় পরামর্শক সেবার জন্য ২৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া ব্যক্তিগত পরামর্শক নিয়োগে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ টাকা। প্রকল্পের বড় অংশ পরামর্শক খাতে বরাদ্দ থাকায় এ অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কেবল পরামর্শক নিয়োগ নয়, মাঠপর্যায়ে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ এবং আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারই প্রকল্পের সফলতার মূল শর্ত।

প্রকল্প নথিতে আরও বলা হয়েছে, এর আগে ‘বাংলাদেশের নদীর তথ্য হালনাগাদ ও আইসিটিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের প্রবাহমান নদীগুলোর তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করা হয়েছে। নতুন খালভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার সেই বিদ্যমান নদী ডেটাবেজের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। ফলে নদী ও খালকে একই প্ল্যাটফর্মে এনে সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নদী ও খালের তথ্য একই প্ল্যাটফর্মে থাকলে বন্যা পূর্বাভাস, সেচ পরিকল্পনা, পানি সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় সহজ হবে এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অপ্রয়োজনীয় দ্বৈততা কমে আসবে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনের আগে ঘোষণা দিয়েছেন, সরকার গঠন করলে পাঁচ বছরে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলাশয় খনন বা পুনঃখনন করা হবে। এটি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ের কর্মসূচির আধুনিক সংস্করণ বলে উল্লেখ করা হয়। সরকার গঠনের পর ইতোমধ্যে সেই কর্মসূচি শুরু হয়েছে। 

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এত বড় কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে দেশের খালগুলোর প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। নতুন ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার সেই বৃহৎ কর্মসূচির ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। অতীতে অনেক খনন প্রকল্প প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। কোথাও খননের পর আবার দ্রুত ভরাট হয়েছে, কোথাও সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হয়নি। নতুন ডেটাবেজের মাধ্যমে খালগুলোর পারস্পরিক সংযোগ, নদীর সঙ্গে সম্পর্ক এবং পানি প্রবাহের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। ফলে খনন ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।

পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১৮০ দিনের মধ্যে ১০০০ কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে তা ছাড়িয়ে ১২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দৃশ্যমান হবে। তিনি আরও আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটারের বেশি খাল খনন সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি মৌলিক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই হবে না, সেই তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় নিশ্চিত করা এবং পরিকল্পনা গ্রহণে তথ্যের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তাদের মতে, দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য বিশৃঙ্খলা, সমন্বয় সংকট এবং পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে, এই প্রকল্প তা কাটিয়ে ওঠার একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। প্রকল্পের তথ্য যদি ভবিষ্যতের সব খাল পুনঃখনন, দখলমুক্তকরণ, কৃষি সেচ সম্প্রসারণ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনায় কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে দেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশের জীবিত ও মৃত সব খালকে এই প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। পরে সেগুলোকে বড়, মাঝারি ও ছোট এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হবে। এই শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে কোন ধরনের খালের দায়িত্ব কোন সংস্থা পালন করবে, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে খাল খনন ও সংস্কারের কাজ করছে। কিন্তু সমন্বিত তথ্য না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে একই খালে একাধিক সংস্থা কাজ করছে। আবার অনেক খাল কোনো সংস্থার পরিকল্পনায়ই আসছে না। এতে অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি উন্নয়ন কার্যক্রমেও অদক্ষতা তৈরি হচ্ছে। নতুন প্রকল্পটি সেই সমন্বয়হীনতা দূর করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের বর্তমান সদস্য ও সরকারের সচিব মো. মাহমুদুল হোসেন খান প্রকল্পের বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তথ্যভাণ্ডারটি ভবিষ্যতে খাল পুনরুদ্ধার, জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচ সম্প্রসারণ এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পরিকল্পনা কমিশন ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, দেশের খালগুলো নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় তথ্যভাণ্ডার নেই। বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে খাল খনন ও সংস্কার করলেও কোথায় কোন খাল রয়েছে, কোনটি সচল, কোনটি ভরাট বা দখল হয়েছে কিংবা কোন সংস্থার দায়িত্বে কোন খাল থাকবে, সে বিষয়ে সমন্বিত তথ্য নেই। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে এ ঘাটতি দূর করা হবে।

এএইচ/জেবি