Dhaka Mail Logo

জাতীয়

গুলিবিদ্ধ হয়েও মাঠ ছাড়েননি নাঈম, পরিবারের কাছেও রেখেছিলেন গোপন 

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

০৭ জুলাই ২০২৬, ১২:২৫ পিএম

# পুলিশের ছোঁড়া টিয়ারসেল তাদের দিকেই ছুঁড়ে মারতেন নাঈম
# ১৭ টেলিগ্রাম গ্রুপ খুলে সংগঠিত করেছিলেন ছাত্রদের
# জুলাই আহত স্বীকৃতি ছাড়া কিছুই জোটেনি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছিলেন ওয়ালিদ ইসলাম নাঈম। আন্দোলনের সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে রাবার বুলেট তার উরু ভেদ করে ঢুকে বেরিয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থাতেও তিনি মাঠ ছাড়েননি। আহত পায়ে সেলাই নেওয়ার পর বিশ্রামে না গিয়ে আবারও নেমে পড়েন আন্দোলনের ময়দানে।

তবে এত বড় একটি ঘটনা পরিবারের কাছে গোপন রেখেছিলেন তিনি। আন্দোলনের পুরো সময়জুড়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি জানতে দেননি স্বজনদের। কারণ, পরিবারের দুশ্চিন্তা নয়, তখন তার কাছে সবচেয়ে বড় ছিল আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়া। জীবন বাজি রেখে টেলিগ্রামে গ্রুপ খুলে ১৭টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন জড়ো করেছেন।

আন্দোলনের কর্মসূচিতে তাদের একত্র করা, যোগাযোগ রক্ষা এবং মাঠে উপস্থিতি নিশ্চিত করার দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।

ওয়ালিদ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক। তার গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের শরণখোলায়। জীবনকে ঝুঁকির মুখে রেখে আন্দোলনের দিনগুলোতে তার ভূমিকা এখনো অনেকের কাছে সাহস, ত্যাগ ও দৃঢ়তার এক অনন্য উদাহরণ।

তবে ছাত্রদলের পদের জন্য জুলাইয়ের আন্দোলনে তাকে কোনও কমিটিতে রাখেনি বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের নেতারা। তবুও নেপথ্যে থেকে আন্দোলনের মাঠে সম্মুখসারিতে থেকেছেন। 

গার্মেন্টস, শ্রমিক, রিক্সাচালক, খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ আর বিপ্লবী তরুণ-তরুণীদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন ফ্যাসিবাদের মসনদ গুঁড়িয়ে দিতে। চোখের সামনেই সহযাত্রীকে গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন কিন্তু মাঠ ছাড়েননি। পুলিশের ছোঁড়া টিয়ারসেল পিচঢালা পথ থেকে কুড়িয়ে আবারও পুলিশের দিকেই ছুঁড়েছেন। ফলে পুলিশ ও বিজিবি মনোবল হারিয়েছিল বলে মনে করেন তিনি। 

কোটা বিরোধী আন্দোলন চরমে ওঠে জুলাইয়ের ১৭ তারিখের পর। ইন্টারনেট বন্ধ করে, কারফিউ জারি করেও লোকজনকে ঠেকানো যায়নি। 

e85d572a-b35c-48e0-ab04-97c0c18c55a7

ওয়ালিদের দায়িত্ব ছিল গাজীপুর ও উত্তরা কেন্দ্রীক। তিনি একাই আন্দোলনকারীদের জড়ো করতেন। গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও জামালপুরের দিকের আন্দোলনকারীদের একত্রিত ও সমন্বয় করা। তখন সরাসরি ফোনে কথা বলা যেতো না। ফলে নাঈম একেকবার একেক সিম দিয়ে কথা বলে ফোনটি লুকিয়ে রাখতেন। বাটন ফোনে কথা বলতেন বিভিন্নখানে। যাতে কেউ ট্র্যাক করতে না পারে। 

শান্তিনগরে প্রথম ছাত্রদলের প্রকাশ্য মিছিল

তিনি বলছিলেন, আন্দোলন তখন ছড়িয়ে যাচ্ছিলো দেশব্যাপী। রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেওয়া যাচ্ছে না। তবুও আমরা ১৮ জুলাই শান্তিনগরে একটি মিছিল বের করি। ছাত্রদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসিরও ছিল। খুব সকালে, তখন সাড়ে ছয়টা। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব খান সোহেল ভাইয়ের নেতৃত্বে মিছিলটা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রানিং সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনও ছিল। পরে সকালে ছাত্ররা রাস্তায় নামতে শুরু করলো। 

এরপর রাকিব ভাই আবারও ফকিরাপুর মোড়ে একটি মিছিল করে। কিন্তু সেদিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ খুব মারমুখী ছিল। তারা ফায়ারিং করছিল। আমরা তখনো বুঝতে পারিনি ভয়াবহতা। পরে সেখান থেকে আমি উত্তরায় ব্যাক করি। এরপর রাজউক কলেজসহ আশপাশের কলেজ ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের একত্রিত করে আন্দোলনে নামি। দুপুরের দিকে উত্তরাপূর্ব থানার সামনে র‌্যাব ও পুলিশ অবস্থান নেয়। তারা মুহুর্মুহু গুলি করতে থাকে। অনেকে আহত হয়।

পুলিশের টিয়ারসেল তাদের দিকেই ছুঁড়ে মারি

তিনি বলেন, র‌্যাব ও পুলিশ যখন টিয়ারসেল মারছিল তখন আমি সেটি হাতে ধরে তাদের দিকে ছুঁড়ে মারছিলাম। একাজে নিজের কাছে থাকা টিস্যু পেপার ব্যবহার করতাম। সেটি দিয়ে চেপে ধরে আবারও পুলিশের দিকেই মারতাম। এটা ছিল আমাদের কাছে বড় প্লাস পয়েন্ট। আমার দেখাদেখি অন্যরাও শুরু করলো। অনেকের সাহস বেড়ে গেল। যেহুতু আমার আন্দোলন সংগ্রামে এসব করে অভ্যাস ছিল। পুলিশের দিকে ছুঁড়ে মারায় এটা তাদের একটা বড় দুর্বলতা ছিল। টিয়ারসেলের গ্যাসটা তাদের ও আমাদের দিকেও ছড়াতো। ফলে তারা আর দ্বিতীয় বার টিয়ারসেল মেরে পিছু হটবে তাও সুযোগ ছিল না। কারণ পেছনে উত্তরা পূর্ব থানা। সেই সময় একটি ইটবাহী ট্রাক আসছিল। আমরা ট্রাকটিকে ধাওয়া দিয়ে সেটিতে আগুন দেই। আগুন দেওয়ার কারণ ছিল টিয়ারসেলের ধোঁয়ার তেজস্ক্রিয়তা কমানো।      

উরুতে লাগে রাবার বুলেট ও শরীরে অর্ধশত ছররা গুলি

১৮ জুলাই উত্তরায় আন্দোলন করার সময় তার শরীরে রাবার বুলেট ও ৫০টির মতো ছররা গুলি লাগে। সেই অবস্থায়ই  হাঁটছিলেন তিনি। পাশে থাকা একজন দেখতে পান তার পা দিয়ে রক্ত ঝরছে। পরে তাকে গাজীপুরের এক ক্লিনিকে গোপনে নিয়ে যাওয়া হয়। তবুও রক্ষা হয়নি। রাতেই সেই ক্লিনিক ঘিরে ফেলে স্থানীয় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। তারা ভেতরে ঢোকার আগেই আহত পা নিয়েই পালিয়ে একজনের বাসায় কোনোমতে রাত পার করেন নাঈম। এরপর টানা ১৩ দিন একটি অজ্ঞাত বাসায় লুকিয়ে আন্দোলনের নির্দেশনা ও প্ল্যানমাফিক কাজ করে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছেন।

ছাত্রদল করায় আন্দোলনের কমিটিতে রাখা হয়নি তাকে

নাঈম বলছিলেন, ২০ জুলাই থেকে তিনি একবারেই সম্মুখসারিতে ছিলেন। তবে ছাত্রদল করার কারণে তাকে সেই সময় বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের উত্তরা জোনের কমিটিতে রাখা হয়নি। কিন্তু তাদের তিনি বলেছিলেন, আমি কমিটিতে না থাকলেও নেপথ্যে লিড দিব। তিনি কথা রেখেছিলেন। শেষদিন পর্যন্ত উত্তরায় আন্দোলনকে বিজয়ের মুখ দেখিয়েছিলেন তিতুমীর কলেজের ছাত্রদলের এই নেতা। 

তিনি বলছিলেন, তারা (বৈষম্য বিরোধী নেতারা) উত্তরা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও আশুলিয়া নিয়ে একটি কমিটি করলো। আমাকে তিন নম্বরে রাখলো। কিন্তু আমি যখন বললাম, আমি তো ছাত্রদলের রাজনীতি করি। তখন তারা আমাকে বললো যে, এখানে রাজনৈতিক কাউকে যুক্ত রাখা যাবে না। আমি ছাত্রদল করি বলায় তারা আমাকে সেদিন রিজেক্ট করেছিল। মানে কমিটিতে না রেখে নেপথ্যে লিড দিতে বললো। আমি গাজীপুরের ১৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য ১৭টি টেলিগ্রাম গ্রুপ খুলি। যেহেতু মেসেঞ্জারে ২৫০ জনের বেশি যুক্ত করা যায় না। ফলে ১৭টি গ্রুপ খুলতে হয়েছিল। গাজীপুর, ডুয়েট, গাজীপুর ভাউয়াল কলেজ, গাজীপুর আজিমুদ্দিন কলেজ আলাদা আলাদা গ্রুপ করি।  টঙ্গী কলেজ  ও  প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির প্রত্যেকটার জন্য ইন্ডিভিজুয়াল গ্রুপ খোলা হয়েছিল। 

রিক্সাচালকরা বলতেন মামা নম্বর রাখেন, ফোন দিয়েন আসবো

নাঈম যেমন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আন্দোলনে একত্রিত করেছিলেন তেমনি খেটে খাওয়া মানুষজনও তার ডাকে সাড়া দিয়েছিল। ফলে আন্দোলনের সময় প্রশাসন উত্তরার রাস্তায় অটোরিক্সা বন্ধ করে দেয়। সে সময় ১৫ থেকে ২০ জন অটোরিক্সাচালক একত্রিত হয়ে তার কাছে এসে বলেন, মামা আমাদের নম্বর রাখেন। আগামীকাল ফোন দিয়েন। আমরা আন্দোলনে আসব। নাঈম বলছিলেন, এই আন্দোলনে সবার কথা উঠে এসেছে কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষের গল্পগুলো কেউ বলেনি। তারাই মুলত এই আন্দোলনের অন্যতম শক্তি ছিল। কারণ ১৯ ও ২০ জুলাইয়ের পর ছাত্রদের আন্দোলনে কিছুটা ভাটা পড়েছিল। তখন খেটে খাওয়া মানুষরাই এ আন্দোলনকে নতুন করে চাঙ্গা করেন।   

Untitled-1

নাঈমের বাসায় ডিবির রেড

নাঈম থাকতেন মোহাম্মদপুরে। কিন্তু আন্দোলনের পুরো সময় তার উত্তরাতেই কেটেছে। পুলিশের কাছে খবর চলে যায় নাঈম মোহাম্মদপুরে থাকে। ২০ জুলাই তার মোহাম্মদপুরের বাসায় ডিবি পুলিশ কয়েক দফা রেড দিলেও তার সন্ধান পায়নি। 

তিনি বলছিলেন, আন্দোলনে যুক্ত থাকায় বাসায় থাকার সুযোগ হয়নি। আমার বাসায় রেড দেওয়ার কারণে সিমও বদলে ফেলি। সিম সবগুলো চেঞ্জ করে আমি জাস্ট একটাই ব্যবহার করতাম। যেটা দিয়ে আমার ফেসবুকে লগইন করে মেসেঞ্জারের গ্রুপ চালানো যেতো। চায়ের দোকানে ফোন ব্যবহার করে বাসায় গিয়ে আবারও বন্ধ রাখতাম। ফোনটা বন্ধ করে বাসায় ঢুকতাম। যাতে তারা আমাকে ট্র্যাক করতে না পারে। এরপর মোহাম্মদপুর ছেড়ে গাজীপুরে এক আত্মীয়ের বাসায় বাসায় যাই। যেখানে আমরা তিতুমীর কলেজেরসহ সাতজন থাকতাম। 

গলা দিয়ে ঢুকে অন্যপাশ দিয়ে বের হল গুলি! 

২০ জুলাই কারফিউ চলছিল। সেই কারফিউয়ের মাঝেই গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে মিছিল বের করা হয়। তখনই শুরু হয় সংঘর্ষের সূত্রপাত্র। 

তিনি বলেন, আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয় গার্মেন্টস কর্মীরাও। আমরা যখন চৌরাস্তায় পৌঁছাই তখনই পুলিশ টিয়ারসেল মারা শুরু করে। তখন আমাদের সাথে লোকজন আরো বাড়ছিল। লাঠিসোটাসহ আমরা উত্তরের দিকে মুভ করব এমন সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ চলছিল। এরই মাঝে তারা পিছু হটে গুলি করতে শুরু করে। আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি যে এটা আসলে বুলেট ফায়ার করতেছে। আমার সাথের একটা ছেলের গলার মাঝ বরাবর ঢুকে ওপাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে। সে স্পট ডেড। আরেকটা ছেলের পায়ে লাগছে। সাতআট জনের গুলি লাগে। তিনজন স্পট ডেড। যাদের মধ্যে একজন গার্মেন্টস কর্মীও ছিল। 

পুলিশের টিয়ারসেল প্রতিরোধে পেস্ট ব্যবহার করতেন নাঈম

গাজীপুরের ঘটনার সময় পুলিশ যখন তাদের উদ্দেশ্যে টিয়ারসেল ছুঁড়ছিল তার আগেই তিনি নাকে মুখে টুথপেস্ট লাগিয়ে এসেছিলেন। তার মতে, নাকে মুখে পেস্ট লাগালে একটা ঝাঁজ তৈরি হয়। সেটা টিয়ারসেলের গ্যাসকে  নিমিষেই শেষ করে দেয়। ফলে সেই দিনগুলোতে তিনি টিয়ারসেলকে প্রতিরোধ করার জন্য নিজের ৫০০ টাকায় পেস্ট কিনে রেখেছিলেন। প্রতিদিন সেগুলো নিয়ে আসতেন এবং আন্দোলনকারীদের নাকে মুখে মাখিয়ে দিতেন তিনি। এছাড়াও টিয়ারসেলের গ্যাস যাতে নাকে না প্রবেশ করে সেজন্য মাস্কও নিয়ে আসতেন। যখন পুলিশ টিয়ারসেল মারতো তখন তিনি মুখে থাকা মাস্ক খুলে সেটি দিয়ে টিয়ারসেল কুড়িয়ে আবারও পুলিশের দিকে ছুঁড়ে মারতেন।

এমআইকে/এআরএম