মাহফুজুর রহমান
০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম
ঢাকার ব্যস্ততম পুরান শহরের প্রাণকেন্দ্রে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের বিপরীতে জনসন রোড ও লক্ষ্মীবাজার এলাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত বাহাদুর শাহ পার্ক। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই পার্কের পাশ দিয়ে হেঁটে যান, যানজট পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছান কিংবা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পার্কের ভেতরে বসেন।
কিন্তু অনেকেই জানেন না, এই পার্কটি শুধু একটি সবুজ খোলা জায়গা নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, স্বাধীনতা আন্দোলন এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের বহু ঘটনার স্মৃতি বহন করে চলেছে এই পার্ক।
এক সময় এর নাম ছিল ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’। পরে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় নাম বদলে হয় ‘বাহাদুর শাহ পার্ক’। নাম বদলালেও পার্কটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব এতটুকু কমেনি। বরং এটি আজও পুরান ঢাকার অতীতকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে।
শুরুটা যেভাবে
বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকাটি একসময় ছিল একটি খোলা ময়দান। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এটি আর্মেনীয় ব্যবসায়ীদের ব্যবহৃত স্থান এবং পরে বিভিন্ন সামাজিক ও আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। ব্রিটিশ আমলে এটি ‘আন্টাগোনিস্ট ময়দান’ নামেও পরিচিত ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ দমনের পর এই এলাকাটি ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিদ্রোহে অংশ নেওয়া বহু ভারতীয় সৈনিক ও সাধারণ মানুষকে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এই স্থানে। অনেককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে এবং অনেককে কামানের মুখে বেঁধে উড়িয়ে হত্যা করা হয়। ব্রিটিশ শাসকরা বিদ্রোহ দমনের শক্তি প্রদর্শনের জন্য জনসম্মুখে এসব শাস্তি কার্যকর করেছিল।
স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ
১৮৫৭ সালের ঘটনার কয়েক দশক পর ব্রিটিশ সরকার এই স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ১৯০৫ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত হয় বর্তমানের সুদৃশ্য স্মৃতিস্তম্ভ এবং পার্কটির নাম রাখা হয় ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’। স্মৃতিস্তম্ভটির স্থাপত্যে ইউরোপীয় ধাঁচের প্রভাব স্পষ্ট। উঁচু স্তম্ভ,অলংকরণ এবং চারপাশের পরিকল্পিত নকশা সেই সময়ের স্থাপত্যরীতির পরিচয় বহন করে।
যদিও স্মৃতিস্তম্ভটি রানী ভিক্টোরিয়ার স্মরণে নির্মিত হয়েছিল, তবুও পরবর্তীকালে এটি ১৮৫৭ সালের শহীদদের স্মৃতির সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।
নাম পরিবর্তনের ইতিহাস
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঔপনিবেশিক শাসনের বিভিন্ন প্রতীক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ভিক্টোরিয়া পার্কের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বাহাদুর শাহ পার্ক’। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের (বাহাদুর শাহ জাফর) নামানুসারে পার্কটির নতুন নামকরণ করা হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের প্রতীকী নেতা ছিলেন তিনি। যদিও বিদ্রোহের সামরিক নেতৃত্ব তিনি দেননি, তবুও বিদ্রোহীরা তাকে ভারতের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেছিল। বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর ব্রিটিশরা তাকে বন্দি করে রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠায়, যেখানে তার মৃত্যু হয়।

পুরান ঢাকার কেন্দ্রবিন্দু
বাহাদুর শাহ পার্ককে ঘিরে রয়েছে পুরান ঢাকার বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা। এর পাশেই রয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ভিক্টোরিয়া ওয়াটার পাম্প, জনসন রোড, লক্ষ্মীবাজার এবং সদরঘাটের সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। ফলে প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে পুরো এলাকা।
শুধু ইতিহাস নয়, স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পার্কটির গুরুত্ব রয়েছে। সকাল-বিকেল অনেকে এখানে হাঁটতে আসেন, শিক্ষার্থীরা আড্ডা দেন, প্রবীণরা বিশ্রাম নেন এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও এখানে অনুষ্ঠিত হয়।
পার্কের কেন্দ্রে অবস্থিত স্মৃতিস্তম্ভটি পুরো এলাকাকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। চারপাশে রয়েছে সবুজ গাছপালা, হাঁটার পথ এবং বসার স্থান। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পার্কের আয়তন ও পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে, তবুও এটি এখনো পুরান ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্মুক্ত স্থান হিসেবে পরিচিত।
ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়োজন
ইতিহাসবিদদের মতে, বাহাদুর শাহ পার্ক শুধু একটি বিনোদনকেন্দ্র নয়; এটি বাংলাদেশের উপমহাদেশীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশবিরোধী প্রথম বৃহৎ সশস্ত্র আন্দোলনগুলোর একটি। সেই আন্দোলনের নির্মম পরিণতির সাক্ষী এই পার্ক।

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘ভিক্টোরিয়া পার্কটি আয়তনে অত্যন্ত ছোট এবং সেখানে মানুষের প্রচণ্ড ভিড় থাকে। পুরান ঢাকার মতো জনবহুল এলাকায় পার্কের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় দশ ভাগের এক ভাগও নেই।’
পার্ককে ‘শহরের ফুসফুস’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘বড় জায়গা না পাওয়া গেলেও ছোট ছোট পার্ক তৈরি করে এই চাপ কমানো দরকার। জনগণের বিনোদন ও শিশুদের বিকাশের জন্য সরকারের উচিত প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণ করে হলেও নতুন পার্ক বা উন্মুক্ত স্থান তৈরি করা।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই মনে করেন, বাহাদুর শাহ পার্কের ঐতিহাসিক পরিচিতি আরও বেশি প্রচার করা দরকার। তাদের মতে, অনেকেই পার্কটির পাশ দিয়ে চলাচল করলেও এর ইতিহাস সম্পর্কে অবগত নন। এখানে যদি তথ্যসমৃদ্ধ ফলক, আলোকচিত্র প্রদর্শনী কিংবা ঐতিহাসিক নির্দেশিকা স্থাপন করা হয়, তাহলে নতুন প্রজন্ম দেশের ইতিহাস সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারবে।
ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক
দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাহাদুর শাহ পার্ক নীরবে সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছে উপমহাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন, ঔপনিবেশিক শাসনের নির্মমতা এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার। সময়ের সঙ্গে এর নাম বদলেছে, চারপাশের নগরচিত্র বদলেছে, কিন্তু ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে এর গুরুত্ব আজও অটুট। তাই শুধু একটি পার্ক হিসেবে নয়, জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বাহাদুর শাহ পার্ককে সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সময়ের দাবি।

চাকরিজীবী মো. রাকিব হাসান বলেন, ‘কাজের ফাঁকে বা ছুটির দিনে বন্ধুদের সঙ্গে মাঝে মধ্যেই বাহাদুর শাহ পার্কে আসি। শহরের ব্যস্ততার মধ্যে এখানে কিছুটা সময় কাটালে মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়। এই পার্কের সঙ্গে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের এত গভীর ইতিহাস জড়িয়ে আছে। বিভিন্ন বই ও ইন্টারনেটে পড়ে বিষয়টি জানতে পারি।’
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তাসনিয়া রহমান বলেন, ‘আমরা প্রায়ই বন্ধুদের সঙ্গে এখানে আড্ডা দিতে আসি। চারপাশের পরিবেশ ভালো লাগে, তবে পার্কটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে অধিকাংশ দর্শনার্থীর কোনো ধারণাই নেই। আমার মনে হয়, শুধু একটি পার্ক হিসেবে নয়, এটিকে একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবেও উপস্থাপন করা দরকার।’
পুরান ঢাকার বাসিন্দা মো. আব্দুল কাদের বলেন, ‘আগে পার্কে মানুষ কম আসত, তখন পরিবেশটা অনেক শান্ত ছিল। এখন মানুষের ভিড় বেড়েছে, যা ভালো দিক। তবে পার্কটির ঐতিহাসিক পরিচয় যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, সবুজায়ন এবং স্মৃতিস্তম্ভের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের কথা উঠলে অনেকেই আহসান মঞ্জিল বা লালবাগ কেল্লার কথা বলেন। কিন্তু বাহাদুর শাহ পার্কের গুরুত্ব অনেকেই জানেন না। অথচ এই পার্ক উপমহাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে সংরক্ষণ করা হলে এটি পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে।’
এম/এএইচ