নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ জুন ২০২৬, ১১:৫২ পিএম
ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ কমাতে এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ ‘এক্সিট’ সুবিধা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই সুবিধার আওতায় দীর্ঘদিন ধরে ‘মন্দ ও ক্ষতিকর’ শ্রেণিতে থাকা খেলাপি ঋণগ্রহীতারা এককালীন দায় পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রয়োজনে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদও আংশিক বা সম্পূর্ণ মওকুফ করতে পারবে।
সোমবার (২৯ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আর্থিক সংকটে থাকা, কিন্তু ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের আন্তরিকতা রয়েছে এমন ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ এই সুবিধা চালু করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমবে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গতি আসবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ‘মন্দ ও ক্ষতিকর’ শ্রেণিতে থাকা ঋণগুলো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে বিশেষ এক্সিট সুবিধার আওতায় আনা যাবে। তবে এ সুবিধা পেতে ঋণগ্রহীতাকে এককালীন পুরো দায় পরিশোধ করতে হবে।
ঋণ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সুদ মওকুফের বিষয়ে বিদ্যমান কিছু শর্তও শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২২ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে ‘তহবিল ব্যয়’ আদায়ের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, এই বিশেষ সুবিধার আওতায় তা প্রযোজ্য হবে না। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর আয় খাত সমন্বয় করে সুদ মওকুফ না করার শর্তও শিথিল করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী সুদ মওকুফ করে খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে পুনঃতফসিল করা মন্দ বা ক্ষতিকর ঋণও এই বিশেষ সুবিধার আওতায় আনা হবে।
কৃষি খাতের স্বল্পমেয়াদি ঋণ এবং সিএমএসএমই খাতের কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এই সুবিধা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সার্কুলারে ব্যাংকগুলোকে ঋণগ্রহীতাদের চিঠির মাধ্যমে এ সুবিধা সম্পর্কে অবহিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বিশেষ ‘এক্সিট’ সুবিধা আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। তিন মাস আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা।
সে হিসাবে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। আর এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা, যা সে সময়ের মোট বিতরণকৃত ঋণের ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চাপ কমিয়ে আর্থিক খাতকে আরও গতিশীল করা এবং নতুন ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই সুবিধা ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ কমাতে এবং অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
এমআর