জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
২৮ জুন ২০২৬, ০৪:৪০ পিএম
নিমতলী ট্র্যাজেডির মতো প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত, শোক, প্রতিশ্রুতি এবং কিছু সময়ের জন্য অভিযান দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন খুব কমই হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এসব দুর্ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা, দুর্বল সমন্বয় এবং আইনের শিথিল প্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে অননুমোদিত ভবন, বাণিজ্যিক রূপান্তর এবং কেমিক্যাল গুদাম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো অবগত থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। রাজউক, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
রোববার (২৮ জুন) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত ‘নিমতলী ট্র্যাজেডি: অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড থামবে কবে?’ শীর্ষক এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা এসব অভিমত ব্যক্ত করেন।
সেমিনারের মূল বক্তব্যে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ঢাকার নিমতলী এলাকার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মতো প্রতিটি ঘটনার পরই তদন্ত হয়েছে, নির্দেশনা এসেছে, অভিযান পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পর সবকিছু আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। অদ্যাবধি কাউকে বা কোনো সংস্থাকে দায়ী করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে দায়হীনতার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা পুরো বিষয়টিকে আরও জটিল ও ভয়াবহ করে তুলেছে। এটি যেন এক ভয়ংকর চক্র—অগ্নিকাণ্ড, মৃত্যু, শোক, প্রতিশ্রুতি, তারপর বিস্মৃতি।
তিনি বলেন, নিমতলী কেমিক্যাল ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের জন্য একটি কঠিন শিক্ষা। এই দুর্ঘটনা প্রমাণ করেছে যে দুর্বল নগর পরিকল্পনা, অপর্যাপ্ত রাসায়নিক নিরাপত্তা, আইন বাস্তবায়নের ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির অভাব একটি স্থানীয় দুর্ঘটনাকে জাতীয় বিপর্যয়ে পরিণত করতে পারে।
সভায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক পরিচালক শাকিল নেওয়াজ বলেন, সম্মিলিতভাবে চেষ্টা না করলে ঢাকায় অগ্নিকাণ্ড রোধে ফায়ার সার্ভিসের একার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়।
বনানী এফআর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সেখানে অনেকেই লাফিয়ে নিচে পড়েছিলেন। কেন? কারণ সেখানে জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি ছিল না। এর দায় কার? অবশ্যই স্থপতি ও প্রকৌশলীদের। কিন্তু এমন ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তাই স্থপতি, প্রকৌশলীসহ ভবন নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
ঢাকায় ২৮ লাখ ভবন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলো কি ভেঙে ফেলা সম্ভব? সব ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। বরং বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে। একটি ভবনের সঙ্গে আরেকটি ভবনের সংযোগ স্থাপন করলে দুটি ভবনের মধ্যে অনুভূমিক সিঁড়ি তৈরি করা সম্ভব। এতে ঝুঁকি কমবে।
বাপার নেতা ও রাজনীতিবিদ রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আমরা কি সংকটের সমাধান চাই, নাকি সংকট তৈরি হওয়ার পর তার সমাধান করতে চাই? আমরা দেখছি, সংকট সৃষ্টির পরের বিষয়গুলো নিয়েই বেশি কাজ হচ্ছে। সেটিও প্রয়োজন, তবে সংকট যাতে সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া আরও জরুরি।
সেমিনারে অংশ নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বলেন, আমরা ডেঙ্গু নিয়ে আন্দোলন করছি, অথচ ৬০ শতাংশ বাড়িতে গিয়ে মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা সাধারণত অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই। তাই আগে থেকেই সচেতন হওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। এ জন্য জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
ঢাকার আশপাশে বারবার ভূমিকম্প হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ঢাকার দুয়ারে ভূমিকম্প কড়া নাড়ছে। এটি যদি বড় আকারে আঘাত হানে, তাহলে কী পরিস্থিতি হবে, তা আল্লাহই ভালো জানেন। তাই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সমাজকে বাঁচাতে হলে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
ডিএসসিসি প্রশাসক আরও বলেন, আজ আমরা নিজেরাই বিল্ডিং কোড মানি না। এক ধরনের নকশা অনুমোদন করিয়ে পরে সেটি পরিবর্তন করে ভবন নির্মাণ করি। এ বিষয়ে সবাইকে গুরুত্ব দিতে হবে। আগে নিজেকে বদলাতে হবে। ব্যক্তি বদলালে সমাজও বদলাবে।
আরও পড়ুন: নিমতলী থেকে সীতাকুণ্ড ট্রাজেডি
বাপার সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, ঢাকা আজ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে। তাই ঢাকাকে কীভাবে বাঁচানো যায় এবং বসবাসের উপযোগী করা যায়, সে বিষয়ে সবাইকে ভাবতে হবে।
বুড়িগঙ্গা নদীর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দূষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন এই নদীর পানিতে হাত ভেজালেও জ্বালা করে। কিন্তু বুড়িগঙ্গাকে কেন পুনরুদ্ধার করা যাবে না? নায়াগ্রা জলপ্রপাতসংলগ্ন নদী ব্যবস্থাও একসময় ব্যাপক দূষণের শিকার ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার যৌথ উদ্যোগে সেটিকে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এখন এটি বিশ্বের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ।
বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবিরের সঞ্চালনায় সেমিনারে বাপার সহসভাপতি অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ, যুগ্ম সম্পাদক জাভেদ জাহান, নির্বাহী সদস্য স্থপতি ইকবাল হাবিব প্রমুখ বক্তব্য দেন।
সেমিনারে ভবিষ্যতে নিমতলী কেমিক্যাল ট্র্যাজেডির মতো দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ১১টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। শেষ বক্তব্যে বাপার পক্ষ থেকে বলা হয়, নিমতলী কেমিক্যাল ট্র্যাজেডি আমাদের শিখিয়েছে যে দুর্যোগ শুধু দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি অবহেলা, দুর্বল আইন প্রয়োগ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফল। নিরাপদ ও দুর্যোগ-সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে কঠোর আইন বাস্তবায়ন, কার্যকর তদারকি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করাই ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের প্রধান শর্ত।
এএম/এআর