নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ জুন ২০২৬, ১০:০০ পিএম
শুধু রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর জোর দিলেই অর্থনৈতিক বৈষম্য কমবে না। কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে প্রত্যক্ষ করের পরিধি বাড়ানো, পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমানো, কর ফাঁকি ও কর এড়ানো রোধ এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইন অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় বাজেটে কর-ন্যায়বিচার: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব প্রস্তাবনা পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংলাপে উপস্থাপিত গবেষণায় এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
গবেষণায় বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে এ হার ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শুধু রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগ অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর কারণে সরকার প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজার ২৩৬ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারিয়েছে। একই সময়ে সম্ভাব্য মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আয়ের মাত্র ২৮ থেকে ২৯ শতাংশ আদায় করতে সক্ষম হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
গবেষণায় বাজেটের ইতিবাচক দিক হিসেবে পরিবার কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে ৪১ লাখ নারীকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কর সুবিধা, তামাকজাত পণ্যে কর বৃদ্ধি, কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন এবং অনলাইন কর রিটার্ন ব্যবস্থার সম্প্রসারণের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়।
সিপিডির মতে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ এখনও জিডিপির ১ শতাংশের নিচে এবং শিক্ষা খাতেও বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় কম। পাশাপাশি ভ্যাটনির্ভর রাজস্ব কাঠামোর কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি করের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বাজেটে সম্পদ কর বা উত্তরাধিকার কর চালুর উদ্যোগ নেই। কর ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ, কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অবৈধ অর্থ পাচার প্রতিরোধে কার্যকর কৌশলেরও ঘাটতি রয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে সিপিডি প্রত্যক্ষ করের আওতা সম্প্রসারণ, ভ্যাট কাঠামো যৌক্তিক করা, সম্পদ কর চালু, কর প্রশাসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বৃদ্ধি, এনবিআরের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং প্রতিবছর বাজেটের ওপর ‘কর-ন্যায়বিচার প্রভাব মূল্যায়ন’ পরিচালনার সুপারিশ করেছে।
সংলাপে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, জাতীয় বাজেটে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ ব্যবসায়ীদের দাবি নয়; এটি রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক চাপের ফল। তিনি বলেন, যে ব্যবসায়ী কর দিতে চান না, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকুক বা না থাকুক তিনি কর দেবেন না।
এনবিআর ও ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব কমানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এনবিআরের নীতি বিভাগ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেও বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রশাসনিক দুর্বলতা দেখা যায়।
আবাসন খাতে নতুন কর আরোপের সমালোচনা করে রিজওয়ান রাহমান বলেন, এতে ফ্ল্যাট ও বাড়ির দাম আরও বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বিদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারেন। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উন্নয়ন ছাড়া সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে জবাবদিহিমূলক নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি একটি ‘জাতীয় জবাবদিহি কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাজেটে ব্যবসায়ীদের কিছু দাবির প্রতিফলন থাকলেও নতুন কয়েকটি কর ব্যবস্থা শিল্প খাতের জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে একাধিক কোম্পানির মধ্যে আর্থিক লেনদেনের ওপর নতুন করে সুদ ও কর আরোপ শিল্পের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একটি কোম্পানি আর্থিক সংকটে পড়লে অন্য কোম্পানি সহায়তা দিয়ে থাকে। সেই অর্থের ওপর বারবার কর আরোপের বিধান শিল্প খাতকে নিরুৎসাহিত করবে। এ ধরনের বিধান কীভাবে যুক্ত হলো, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, কর-ন্যায়বিচার শুধু বাজেট ঘোষণার সময় আলোচনার বিষয় হতে পারে না। বাজেট প্রণয়নের আগে ও পরে অংশীজনদের মতামত গ্রহণের ধারাবাহিক ব্যবস্থা থাকতে হবে।
এনবিআর সদস্য (কর নীতি) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, ন্যায়সঙ্গত কর ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক করতে হবে।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী তামিম আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে কর-ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ কর কাঠামো শুধু রাজস্ব আহরণের বিষয় নয়, এটি সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
সংলাপে জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব প্রস্তাব, কর সংস্কার এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ নিয়ে অর্থনীতিবিদ, গবেষক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকেরা মতবিনিময় করেন।
এএইচ/এআরএম