আব্দুল হাকিম
২২ জুন ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম
রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। নগরীর চারটি প্রধান আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে ঢাকার অভ্যন্তরে যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এই বৃহৎ অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্তত আড়াই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
ঢাকার গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা হাজার হাজার বাসের প্রধান কেন্দ্র। এসব বাস নগরীর প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকে আবার শহরের বিভিন্ন সড়কে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সকাল ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে রাজধানীর প্রবেশমুখসহ প্রধান সড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। বিশেষ করে গাবতলী-মিরপুর, মহাখালী-বিমানবন্দর, সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী এবং গুলিস্তান-কাকরাইল করিডরে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব টার্মিনালকে রাজধানীর বাইরে আধুনিক পরিবহন হাবে রূপান্তর করা হবে। সেখানে থাকবে ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম, পর্যাপ্ত পার্কিং, যাত্রী অপেক্ষাকক্ষ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক সুবিধা। একই সঙ্গে এসব টার্মিনালকে এক্সপ্রেসওয়ে, জাতীয় মহাসড়ক, বিআরটি, মেট্রোরেল ও ভবিষ্যৎ রেল যোগাযোগের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে, যাতে যাত্রীরা রাজধানীর বাইরে নেমেই সহজে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন টার্মিনালগুলোতে আধুনিক যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল টিকিটিং, নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নজরদারি ব্যবস্থা এবং যাত্রীবান্ধব সুযোগ-সুবিধা রাখার বিষয়েও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে টার্মিনালগুলোকে ভবিষ্যতের পরিবহন চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সম্প্রসারণযোগ্যভাবে নির্মাণের চিন্তা-ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সম্ভাব্য নতুন টার্মিনালগুলোকে জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল, বিআরটি এবং ভবিষ্যতের রেল যোগাযোগের সঙ্গে সমন্বয় করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। যাত্রীরা রাজধানীর বাইরে নেমেই দ্রুত গণপরিবহনের মাধ্যমে নিজ নিজ গন্তব্যে যেতে পারবেন। এতে আন্তঃজেলা বাসগুলোকে আর নগরীর ভেতরে প্রবেশ করতে হবে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতেও রাজধানীর বাইরে বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হলেও জমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং বাস্তবায়ন জটিলতার কারণে সেগুলো এগোয়নি। বর্তমান সরকার এবার সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে এগোচ্ছে।
আগামী দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে রাজধানী ঢাকা থেকে চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি জানান, সায়েদাবাদ টার্মিনাল কাঁচপুরে, ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে, গাবতলী টার্মিনাল হেমায়েতপুরে এবং মহাখালী টার্মিনাল উত্তরা ও আব্দুল্লাহপুরের কাছাকাছি জায়গায় চলে যাবে।
মন্ত্রী বলেন, কলাবাগান, কল্যাণপুরসহ যে সমস্ত জায়গায় কাউন্টার, এসি কাউন্টা বা অনেকগুলো বেসরকারি বাসের কাউন্টারকে কেন্দ্র করে অস্থায়ী টার্মিনালের মতো হয়েছে, রাস্তার পাশে বাস দাঁড়িয়ে থাকে, তারা কাউন্টারগুলো পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেবে। আর অবশ্যই কাউন্টারের সামনে বাস এনে যাত্রী উঠাতে পারবে না, আমরা মোটামুটি এই পদক্ষেপ নিয়েছি।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী সায়েদাবাদ টার্মিনাল ধীরে ধীরে কাঁচপুরে স্থানান্তর করা হবে। ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়া হবে কেরানীগঞ্জে, আর গাবতলীর টার্মিনাল স্থানান্তর করা হবে হেমায়েতপুরে। মহাখালীর টার্মিনাল উত্তরা বা আব্দুল্লাহপুরের কাছাকাছি এলাকায় সরানোর জন্য প্রায় ৫০ বিঘা জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
মন্ত্রী বলেন, এই স্থানান্তর হঠাৎ করে নয়, বরং পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। আপাতত এসব স্থানে ডিপো হিসেবে কার্যক্রম চলবে, তবে নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী বাস এসে যাত্রী উঠিয়ে আবার নির্ধারিত সময়ে টার্মিনাল ত্যাগ করবে। একই সঙ্গে কলাবাগান, কল্যাণপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অনানুষ্ঠানিক কাউন্টারগুলোও ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়া হবে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে যানজট নিরসনে ঢাকার চার আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল—সায়েদাবাদ, মহাখালী, গাবতলী ও ফুলবাড়িয়া—শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবকে অবাস্তব ও অকার্যকর বলে মনে করছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। আইপিডি বলছে, পর্যাপ্ত গণপরিবহন সংযোগ, ফিডার সার্ভিস ও লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি নিশ্চিত না করে কেবল টার্মিনালগুলো শহরের প্রান্তে কাঁচপুর, হেমায়েতপুর, টঙ্গী ও কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়া হলে তা ঢাকার পরিবহন সংকট আরও জটিল করবে। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় আসা সাধারণ যাত্রী, বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষ, নারী, শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়বেন।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, দুই কোটির বেশি মানুষের এই মহানগরীর যাতায়াত ব্যবস্থাকে টেকসই করতে হলে ঢাকার বর্ধিত নগর এলাকায় নতুন বাস ডিপো ও টার্মিনাল নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে বিদ্যমান চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার পরামর্শ দিয়েছে আইপিডি।
আইপিডির মতে, ঢাকার যানজটের মূল কারণ হিসেবে বাস টার্মিনালগুলোকে দায়ী না করে পরিবহন খাতের সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা, অবৈধ পার্কিং, সড়কে যাত্রী ওঠানামা, চাঁদাবাজি ও বিশৃঙ্খলার বিষয়গুলো আগে সমাধান করা প্রয়োজন। টার্মিনাল এলাকার এসব সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে আশপাশের সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। প্রস্তাবিত চারটি টার্মিনালই মূল শহর থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এসব এলাকা থেকে ঢাকার কেন্দ্রে আসার জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন ব্যবস্থা এখনো নেই। বিশেষ করে রাতের সময়ে এসব এলাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। ফলে দূরপাল্লার যাত্রীদের বাড়তি খরচ ও ভোগান্তির মুখে পড়তে হবে।
আইপিডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, দূরের টার্মিনালে নামার পর যাত্রীরা যদি মেট্রোরেল, বিআরটি বা উন্নতমানের লোকাল বাসের মাধ্যমে সহজে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারেন, তাহলে পুরো পরিবহনব্যবস্থায় নতুন সংকট তৈরি হবে। পাশাপাশি সিএনজি, অ্যাপভিত্তিক যানবাহন কিংবা ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভরতা বাড়বে, যা শহরের প্রবেশমুখে যানজট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন বড় শহরে মূল শহরের ভেতরেই আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল রয়েছে। এসব টার্মিনাল শহরের মানুষের যাতায়াত সহজ করে এবং ছোট যানবাহনের চাপ কমাতে ভূমিকা রাখে। তাই বিদ্যমান চারটি বাস টার্মিনাল সরিয়ে না নিয়ে এগুলোর ব্যবস্থাপনা উন্নত করার দিকে নজর দেওয়া উচিত।
তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর যানজট নিরসনের জন্য শুধু চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে এর কার্যকারিতা নিয়ে সমীক্ষা ও গবেষণা থাকা জরুরি। তাদের মতে, যানজট কমাতে হলে প্রথমেই রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সরিয়ে সেগুলোকে অলিগলির সড়কে সীমাবদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বাস টার্মিনালগুলো বাস্তবে যানজটের কত শতাংশের জন্য দায়ী, সে বিষয়েও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। গবেষণা ছাড়া বড় অবকাঠামোগত সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস টার্মিনালকে কেন্দ্র করে যে অব্যবস্থাপনা তৈরি হয়, তার বড় অংশই হকার ও অনিয়ন্ত্রিত দখলের কারণে। অতীতে গুলিস্তানে হকার উচ্ছেদের পর এলাকাটিতে যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। কিন্তু পরে আবার হকারদের বসতে দেওয়ায় সেই সুফল নষ্ট হয়ে যায়। তাই শুধু টার্মিনাল সরিয়ে দিলেই যানজট কমবে, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। বিশ্বের বহু বড় শহরেই নগরের ভেতরে বাস টার্মিনাল রয়েছে এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেগুলো পরিচালিত হচ্ছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসনের জন্য শুধু চারটি বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়াই যথেষ্ট নয়। এর আগে প্রধান সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সরিয়ে অলিগলির সড়কে সীমাবদ্ধ করতে হবে। এছাড়া বাস টার্মিনাল স্থানান্তরে যানজট কতটা কমবে, সে বিষয়ে সরকারের কোনো সমীক্ষা বা গবেষণা আছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়া এ ধরনের বড় সিদ্ধান্ত টেকসই হয় না।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, অতীতে গুলিস্তান থেকে হকার উচ্ছেদের পর এলাকাটির যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। কিন্তু পরে আবার হকারদের বসতে দেওয়ায় পরিস্থিতি আগের মতো হয়ে যায়। তাই শুধু টার্মিনাল সরিয়ে দিয়ে যদি হকারদের অব্যবস্থাপনা দূর করা না হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। বিশ্বের অনেক বড় শহরেই নগরের ভেতরে বাস টার্মিনাল রয়েছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে টার্মিনাল নিজেই যানজটের কারণ হয় না। তার মতে, মহাখালী থেকে শুধু দূরপাল্লার বাসের কাউন্টার শহরের বাইরে নেওয়া হলে যানজট কিছুটা কমতে পারে।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী আরও বলেন, দেশে বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে তার সম্ভাব্য সুফল ও কুফল নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা করা হয় না। পদ্মা সেতুর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেতু নির্মিত হলেও এর পূর্ণ সুফল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি সমান গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে কাশপুরে স্টপওভার বাস টার্মিনাল করা হলে দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা বাসগুলো কীভাবে সেখানে পৌঁছাবে, সে বিষয়েও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। অন্যথায় সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, রাজধানীর চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জনপরামর্শ, পেশাজীবীদের মতামত কিংবা সমন্বিত গবেষণার তথ্য সামনে আসেনি। ঢাকায় প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ যাতায়াত করেন। তাই টার্মিনাল স্থানান্তরের আগে যাত্রীদের চলাচল, গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর বিষয়গুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন ছিল। একসময় গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ শহরের প্রান্তে থাকলেও নগর সম্প্রসারণের ফলে এখন সেগুলো নগরের ভেতরে চলে এসেছে। শুধু আরও দূরে সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে, এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
তাদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন শহরে দুই ধরনের মডেলই রয়েছে। কোথাও আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে, আবার কোথাও শহরের কেন্দ্রেই পরিচালিত হয়। মূল বিষয় হলো সঠিক ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অধিকাংশ যাত্রীর ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের সামর্থ্য নেই এবং রাতের বেলায় গণপরিবহনও সীমিত। ফলে দূরের টার্মিনালে যাত্রী নামিয়ে দিলে তাদের গন্তব্যে পৌঁছানো আরও কঠিন হতে পারে। এতে ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভরতা বাড়বে, যা উল্টো নগরীর ভেতরে যানবাহনের চাপ বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান ঢাকা মেইলকে বলেন, রাজধানীর চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে শুধু যানজট নিরসনের সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নগর পরিকল্পনা, গণপরিবহন, যাত্রীসেবা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বিষয়। তাই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নাগরিক, পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও পরিকল্পনাবিদদের মতামত নিয়ে বিস্তৃত পর্যালোচনা করা উচিত ছিল। তার মতে, কোনো অবকাঠামো স্থানান্তরের আগে বিকল্প ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ আন্তঃজেলা বাসে ঢাকায় আসেন। তাদের অধিকাংশই ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেন না। যদি টার্মিনাল শহরের অনেক বাইরে নেওয়া হয়, তাহলে যাত্রীদের শেষ গন্তব্যে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময়, খরচ ও দুর্ভোগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে রাতের সময় পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকায় অনেক যাত্রী সমস্যায় পড়বেন। ফলে বড় বাসের পরিবর্তে ছোট ছোট যানবাহনের ব্যবহার বাড়তে পারে, যা নগরীর ভেতরে নতুন করে যানবাহনের চাপ সৃষ্টি করবে।
আদিল মাহমুদ খান আরও বলেন, যানজটের জন্য শুধু বাস টার্মিনালকে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়। রাজধানীতে অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত ও সড়ক দখল, অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ আরও অনেক কারণ রয়েছে। তাই টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা, বাস পার্কিং শৃঙ্খলায় আনা এবং গণপরিবহনের সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করলে আরও কার্যকর ফল পাওয়া যেতে পারে। তার মতে, নগর পরিকল্পনায় একমাত্রিক নয়, সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
আরও পড়ুন
‘ঢাকার দুঃখ’ সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী!
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, বর্তমানে বাস টার্মিনালগুলো যাত্রীসেবা কেন্দ্রের পরিবর্তে কার্যত ডিপো হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে যাত্রীসেবার উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না। তার মতে, শুধু টার্মিনাল ঢাকার বাইরে সরিয়ে নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। একই ব্যবস্থাপনা বহাল থাকলে নতুন টার্মিনালও ডিপোতে পরিণত হবে এবং যাত্রী তোলার জন্য বাসগুলো সড়কেই অপেক্ষা করবে। এতে যানজট নগরী ছাড়িয়ে মহাসড়কেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই পরিবহন বিশেষজ্ঞ বলেন, বাস রাখার জন্য পৃথক ডিপো গড়ে তুলতে হবে। বাসগুলো সেখানে অবস্থান করবে এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী যাত্রী তুলতে টার্মিনালে এসে আবার গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। এতে টার্মিনালের কার্যকারিতা বাড়বে এবং সড়কে অপ্রয়োজনীয় বাসের অবস্থানও কমবে।
এএইচ/জেবি