ঢাকা মেইল ডেস্ক
২১ জুন ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে খারাপ দিক হলো অপপ্রচার। এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তিলকে তাল বানিয়ে প্রচার করে মজা নেয় বিভিন্ন শ্রেণি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে সেই হীন প্রবনতা বহুগুণে বেড়েছে। ফ্যাক্টচেকিংয়ে সেসব অপপ্রচার প্রতিনিয়ত ধরাও পড়ছে।
তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি চলমান বিশ্বকাপ ফুটবল, পুলিশের সাবেক বিতর্কিত ও পলাতক মহাপরিদর্শক (আিইজিপি) বেনজীর আহমেদ এবং বর্তমান সরকারের তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদকে নিয়ে অনলাইনে অপপ্রচার শনাক্ত করেছে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ‘রিউমর স্ক্যানার বাংলাদেশ’। গত ১৪ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত অপপ্রচারগুলো শনাক্ত করা হয়।
ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে যেসব অপপ্রচার শনাক্ত হয়েছে
এক. ‘ব্রাজিল এমন একটি দেশ, যে দেশে আজান নিষিদ্ধ আর আর্জেন্টিনা এমন একটি দেশ, যে দেশে প্রকাশ্যে কেউ আল্লাহর নাম নিতে পারে না’- শীর্ষক একটি দাবি অন্তত এক যুগ ধরে প্রচার হয়ে আসছে। এবারও ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর আগ থেকেই দাবিটি ফের প্রচার হতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে ২০২২ সালেই ‘রিউমর স্ক্যানার’ প্রকাশিত ফ্যাক্টচেক থেকে জানা যায়, প্রচারিত দুই দাবির কোনোটিই সঠিক নয়। ব্রাজিলের মসজিদে প্রকাশ্যেই আজান দেওয়ার প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই পাওয়া যায় এবং আর্জেন্টিনায় ইসলামী অনুষ্ঠান দেশটির টেলিভিশনেই সম্প্রচার হয়।
দুই. জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চার শীর্ষ নেতা ইরানের জার্সি পরে ছবি তুলেছেন- এমন দাবির একটি ছবি বেশ ভাইরাল হয় ফেসবুকে। গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) Maminul Sir নামের একটি পেজ থেকে প্রচার হওয়া এমন দাবির ছবিতে আজ রবিবার (২১ জুন) সকাল পর্যন্ত ৬২ হাজারের বেশি রিঅ্যাকশন পড়েছে।
রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেকিংয়ে দেখা যায়, হাসনাত আবদুল্লাহর প্রকাশ করা পুরনো দুটি ছবি এআই দিয়ে সম্পাদনা করে পাঞ্জাবির স্থলে ইরানের জার্সি বসিয়ে দিয়ে প্রচার করা হয়েছে। ওিই ছবিতে হাসনাতের সঙ্গে আছেন এনসিপির আরও তিন শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলাম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সারজিস আলম। মূল ছবিতে সবার গায়েই পাঞ্জাবি। কিন্তু এআই ছবিতে পাঞ্জাবি সরিয়ে ইরানের জার্সি পরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিন. টাওয়ারে আর্জেন্টিনার পতাকা লাগাচ্ছেন এক ব্যক্তি- এমন একটি ছবি প্রচার করা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত ‘Argentine Football Association – AFA’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে। ছবিটি Md. Elahi Box নামে এক ব্যক্তি পেজটিতে মেইল করেছেন দাবি করা হয়। তবে ফ্যাক্টচেকিংয়ে ধরা পড়েছে, এই ছবিটিও এআই জেনারেটেড।
চার. কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশন ইরানের পতাকার সাজে সেজেছে- এমন একটি ছবি প্রচার করা হয়েছে ‘Shakib Official’ নামের একটি পেজ থেকে, যা আজ সকাল পর্যন্ত ৬৭ হাজারের বেশি রিয়েকশন পেয়েছে। তবে ফ্যাক্টচেকিংয়ে ধরা পড়েছে, এই ছবিটিও এআই জেনারেটেড, যা গুগলের টুল ব্যবহার করে বানানো হয়েছে।
পাঁচ. গত ১১ জুন মেক্সিকোতে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর সেই অনুষ্ঠানের দুটি দৃশ্য দাবিতে দুটি আলাদা ছবি ছড়ায় ফেসবুকে। একটি ছবিতে দাবি করা হয়, উদ্বোধনে শহীদ ওসমান হাদির ছবি ভেসে ওঠে লেজার শোতে। তবে ফ্যাক্টচেকিং জানাচ্ছে, ‘GojobVision’ নামের একটি সার্কাজম পেইজে দাবিটির সূত্রপাত ঘটে, যা মূলত ব্যাঙ্গাত্মক প্রচারের উদ্দেশে তৈরি করা হয়েছিল।
আরেকটি ছবিতে দাবি করা হয়, উদ্বোধনে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি লেজার শোতে দেখানো হয়েছে। তবে যাচাই করে দেখা যায়, ‘Sesh Tv’ নামের একটি এআই নির্ভর সার্কাজম পেইজে দাবিটির সূত্রপাত ঘটে, যা মূলত ব্যাঙ্গাত্মক প্রচারের উদ্দেশে তৈরি করা হয়েছিল। আদতে, মেক্সিকোতে বিশ্বকাপের উদ্বোধন হয়েছে দিনের বেলায়, সেখানে এমন কোনো লেজার শোও হয়নি।
বেনজীর আহমেদের গ্রেফতার ঘিরে অপতথ্যের ধারাবাহিকতা
গত ১৪ জুন দুপুরে খবর আসে, বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেফতার হয়েছেন। ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের এক খবরে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে গ্রেফতার করেছে দুবাই পুলিশ। পুলিশ সদর দফতরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে খবরটি জানায় পত্রিকাটি।
এই খবরের পর বিকেলেই ফেসবুকের একাধিক পেইজ থেকে প্রচার চালানো হয়, বেনজীর আহমেদের গ্রেফতারের বিষয়টি ভুয়া। এসব পোস্টে এটিকে গুজব হিসেবে দাবি করে তাতে কান না দেওয়ারও পরামর্শ ছিল। ‘Team Ekattor’ নামের একটি পেজে এমন একটি পোস্ট করার ১৫ জুন রাত ১২টার পর আরেক পোস্ট দিয়ে দাবি করা হয়, এআই এর মাধ্যমে বেনজির সন্দেহে যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তিনি আসলে বেনজির নন। এই পোস্টের আধঘণ্টা পরই একই পেইজে আরেক পোস্টে দাবি করা হয়, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বেনজীরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, একই পেজ প্রথমে গ্রেফতারের দাবি ‘ভুয়া বলে’ পরে ‘গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি বেনজীর নন’ বলে শেষে দাবি করেছে ‘বেনজীর গ্রেফতার হয়েছিল কিন্তু পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে’।
এই তিন দাবির শেষেরটি ১৫ জুন রাতভর প্রচার করা হয় অসংখ্য পেইজ-প্রোফাইল থেকে। The Crack Team, Daily Ajker Kantho, Lekhak Bhattacharjee, Nucleus 71, Al Amin Rahman, Bangladesh Insiders -এর এ সংক্রান্ত পোস্টগুলোর মাধ্যমে দাবিটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যায়।
এমনও দাবি করা হয়, সাবেক আইজিপি বেনজীরকে ভিসা সংক্রান্ত ইস্যুতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে আমিরাত প্রশাসন।
কিছু পোস্টের দাবি ছিল, বেনজিরের নামে যে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ প্রচার করা হয়েছে, সেটি ভুয়া। ইন্টারপোলে ৫৯ বাংলাদেশির নামে রেড নোটিশ আছে, তাদের মধ্যে বেনজীরের নাম নেই। মূলত, প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এক ফেসবুক পোস্টে আলোচিত নোটিশটির একটি ছবি যুক্ত করেন। সেটিকেই ভুয়া বলে দাবি করা হচ্ছিল।
রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে, ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটের প্রকাশিত তালিকায় নাম না থাকা রেড নোটিশ জারি না হওয়ার প্রমাণ নয়। কারণ, ইন্টারপোল অধিকাংশ নোটিশই জনসাধারণের জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে না। ইন্টারপোল তাদের ওয়েবসাইটে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।
ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘অধিকাংশ রেড নোটিশ শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ। সংশ্লিষ্ট সদস্য দেশের অনুরোধে এবং যখন কোনো ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে জনসাধারণের সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে অথবা যদি ওই ব্যক্তি জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে, তখন রেড নোটিশের অংশবিশেষ প্রকাশ করা হয়।’
পরবর্তীতে, বেনজীরের গ্রেফতারের বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একটি বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়। ১৪ জুন দুপুরেই তিনি সংসদকে জানান, ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো একটি ই–মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে গ্রেফতারের বিষয়টি জানানো হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, গ্রেফতারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ (এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট) পাঠাতে হবে। অর্থাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য অনুযায়ী অন্তত পরবর্তী ৩০ দিন বেনজীর আহমেদ দুবাই কর্তৃপক্ষের হেফাজতেই থাকবেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত ও অনুমোদন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাবে। এনসিবি (পুলিশ সদর দফতরের একটি শাখা যারা ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ করে) আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করবে। অতি দ্রুতই বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে বলেও জানান মন্ত্রী।
ডা. জাহেদের দিল্লির ঘটনা নিয়ে অপপ্রচার
গত ১৫ ও ১৬ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওআরএ)-এর ২৮তম সিনিয়র কর্মকর্তা কমিটির বৈঠক। এ বৈঠকে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ১৪ জুন বাংলাদেশ থেকে দিল্লি যান। তবে দিল্লি বিমানবন্দরে কর্তৃপক্ষের ‘অসৌজন্যমূলক’ আচরণের অভিযোগ তুলে ডা. জাহেদ বৈঠকে অংশ না নিয়ে সেদিনই দেশে ফিরে আসেন।
ওই ঘটনাটি ঘিরে দুই দেশের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এরই মধ্যে ডা. জাহেদ উর রহমানকে কেন্দ্র করে একাধিক বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পড়ে, যার অন্তত একটি প্রচার করেছে ভারতীয় গণমাধ্যমও।
দিল্লীর বিমানবন্দরে ডা. জাহেদের ঘটনাটির কোনো ছবি বা ফুটেজ দায়িত্বশীল কোনো মাধ্যম প্রকাশ করেনি। অথচ, ভারতের গণমাধ্যম (Bharat Tak) থেকে শুরু করে ফেসবুকের অসংখ্য নেটিজেনের পোস্টে ডা. জাহেদের একটি ছবি ছড়িয়েছে যাতে দেখা যায়, ভারতের পুলিশ জাহেদকে দুই পাশ থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। রিউমর স্ক্যানার গুগলের বিশেষ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ‘SynthID’ দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এটি গুগলের এআই প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি ছবি।
‘Gupto Tv’ নামের সার্কাজম পেজ থেকে ১৫ জুন একটি পোস্টে দাবি করা হয়, দিল্লি বিমানবন্দরে নারীসহ আটক হয়েছেন ডা. জাহেদ। পোস্টের ফটোকার্ডে এ সংক্রান্ত একটি ছবিও যুক্ত করা হয়। এই ফটোকার্ডটি পরবর্তীতে বাস্তব ভেবে নিয়ে অনেক নেটিজেনকে সমালোচনা করতে দেখা যায়। যাচাই করে দেখা যায়, এটিও গুগলের এআই প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি ছবি।
তাছাড়া ডা. জাহেদের সফরসঙ্গী কোনো নারী ছিলেন না। প্রতিনিধি দলের অন্য দুই সদস্য হলেন- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামুদ্রিক বিষয়ক ইউনিটের প্রধান ও অতিরিক্ত সচিব কমোডর শেখ মাহমুদুল হাসান এবং একই ইউনিটের সহকারী সচিব আবুলাইচ সম্রাট। এই দুজন ভারতে প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার পর দুই দিনের বৈঠকটিতে অংশ নেন।
এএইচ