নিজস্ব প্রতিবেদক
১৮ জুন ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম
আলোচিত-সমালোচিত চিত্রনায়িকা পরীমনির সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) ও বর্তমানে ঝিনাইদহ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. গোলাম সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ কথা জানানো হয়।
এর আগে মঙ্গলবার (১৬ জুন) এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (শৃঙ্খলা অনুবিভাগ) কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিষয়টি মন্ত্রীর দফতর থেকে জানা যেতে পারে। ঘটনাটি আমিও দেখেছি। এ ব্যাপারে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ঘটনাটি সত্য।’
আরও পড়ুন: সাকলায়েনকে নিয়ে মুখ খুললেন পরীমণি
২০২৪ সালের ১৩ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে উপসচিব রোকেয়া পারভিন জুঁইয়ের স্বাক্ষর করা এক চিঠিতে গোলাম সাকলায়েনকে ‘গুরুদণ্ড’ হিসেবে চাকরি থেকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান’ পরামর্শের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়।
ওই চিঠিতে বলা হয়, বিভিন্ন সময়ে (দিনে ও রাতে) নায়িকা পরীমনির বাসায় এডিসি গোলাম সাকলায়েন অবস্থান করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় মোবাইল ফোনের ফরেনসিক রিপোর্ট দেখে। তাকে গুরুদণ্ড দেওয়ার বিষয়ে মতামত চেয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২১ সালের ১৩ জুন ঢাকার অদূরে সাভারের বিরুলিয়ার বোট ক্লাবের ঘটনার পর পরীমনিকে ধর্ষণচেষ্টা ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ এনে মামলা করা হয়। মামলার পরদিনই আসামি হিসেবে ক্লাব নেতা ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদকে ঢাকার উত্তরার একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার সঙ্গে গ্রেফতার হন আরও কয়েকজন সহযোগী।
মামলা তদন্তের অংশ হিসেবে পরীমনিকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। তখনই ডিবির গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) গোলাম সাকলায়েনের সঙ্গে পরিচয় হয় এই নায়িকার। এরপর দুজনের মধ্যে শুরু হয় যোগাযোগ। নিয়মিত পরীমনির বাসায় যাতায়াত শুরু করেন সাকলায়েন। মাঝেমধ্যেই গাড়ি নিয়ে বের হতেন দুজনে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, সবশেষ পরীমনি ডিবির কর্মকর্তা গোলাম সাকলায়েনের রাজারবাগের মধুমতি ভবনের বাসায় গিয়ে প্রায় ১৮ ঘণ্টা থাকেন। ২০২১ সালের ৪ আগস্ট রাতে গ্রেফতারের পর এ সবই অপকটে স্বীকার করেন পরীমনি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গোলাম সাকলায়েন পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়ে সরকারি দায়িত্বের বাইরে পরীমনির সঙ্গে অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তিনি বিবাহিত ও এক সন্তানের জনক হওয়া সত্ত্বেও পরীমনির সঙ্গে তার বিবাহ-বহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। পরীমনির সঙ্গে জন্মদিন উদযাপন ও নিজের সরকারি বাসভবনে নিজ স্ত্রীর অবর্তমানে সময় কাটিয়েছেন।
বিষয়টি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত হওয়ায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। তাই তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এ প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ বিবরণী জারি করা হয়। তিনি অভিযোগের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত শুনানি প্রার্থনা করেন। ওই বিভাগীয় মামলা তদন্তে করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হায়াত-উদ-দৌলা খাঁনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার তদন্তে সাকলায়েনের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’র অভিযোগ প্রমাণিত হয়। গুরুদণ্ডের আওতায় কেন তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না- সে মর্মে দ্বিতীয় কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয় সাকলায়েনকে। এর উত্তরে তিনি চাকরি থেকে বরখাস্তকরণ মামলার দায় থেকে অব্যাহতি চান। এ জবাব সন্তোষজনক বিবেচিত না হওয়ায় তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়।
এরপর ২০২৪ সালের ১৩ জুন জননিরাপত্তা বিভাগের শৃঙ্খলা-২ শাখার উপসচিব রোকেয়া পারভীন জুঁই স্বাক্ষরিত স্মারকে বিভাগীয় মামলায় সাকলায়েনকে গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরি থেকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর প্রদানে’র বিষয়ে সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়ের (পিএসসিতে) পরামর্শ চেয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়।
সেই চিঠিতে বলা হয়, তদন্তে উঠে এসেছে, পরীমনির সঙ্গে সাকলায়েনের বিবাহবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। তিনি পরীমনির বাসায় রাত্রিযাপন করতেন। সাকলায়েনের স্ত্রী তার (সাকলায়েন) সরকারি বাসায় না থাকার সময় পরীমনিও সেখানে রাত্রিযাপন করেছেন। এমনকি সাকলায়েনের বাসায় টানা ১৭ ঘণ্টা দুজন (পরী ও সাকলাইন) একসঙ্গে ছিলেন।
আরও বলা হয়, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-২০১৮ অনুযায়ী ‘অসদাচরণের’ কারণে সাকলায়েনকে ‘গুরুদণ্ড’ হিসাবে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদানের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
২০২১ সালে পরীমনির সঙ্গে একজন পুলিশ কর্মকর্তার অবৈধ সম্পর্কের কথা প্রকাশ হলে শোবিজ অঙ্গণসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছিল। তখন থেকেই কানাঘুষা ছিল, বড় শাস্তি পেতে পারেন অভিযুক্ত সাকলায়েন। অবশেষে হলোও তাই।
এএইচ