নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ জুন ২০২৬, ১০:৪৯ পিএম
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, পরিবেশ ও জলবায়ু সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন ও নীতিমালায় নারীর সুরক্ষা ও অংশগ্রহণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
একইসঙ্গে পরিবেশ আইনে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় নারীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা বিধান যুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকেলে রাজধানীর আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: পরিবেশ আইনে নারীর সুরক্ষা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, এটি মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাংলাদেশের উপকূলীয় ও গ্রামীণ অঞ্চলের নারীরা পানি সংগ্রহ, খাদ্য প্রস্তুত, পরিবার ও গবাদিপশুর যত্নের মতো দায়িত্বের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বেশি বহন করেন। দুর্যোগের সময় তারা নিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নারীরা তুলনামূলকভাবে কম দায়ী হলেও ক্ষতির বোঝা তাদেরই বেশি বহন করতে হয়। তাই পরিবেশ আইন ও নীতিতে নারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি, বিকল্প জীবিকা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, ভূমির অধিকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আগাম সতর্কবার্তায় নারীদের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম জোরদার এবং বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। পাশাপাশি জলবায়ু বিষয়ক নীতিমালার বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার তাগিদ দেন।
স্বাগত বক্তব্যে সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদা রেহানা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নারীরা নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হচ্ছেন। পরিবেশ আন্দোলন ও নারী আন্দোলন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত উল্লেখ করে তিনি নারীর সুরক্ষায় প্রণীত পরিবেশ আইন বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মনজিল মোরশেদ বলেন, দেশে পরিবেশ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় আইন থাকলেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতি রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
পরিবেশকর্মী ফারিহা সুলতানা অমি উপকূলীয় ও সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার নারীদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, জলবায়ু অভিযোজন ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় প্রান্তিক নারীদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় কাজ করা নারীদের সুরক্ষায় আইনি বিধান যুক্ত করারও দাবি জানান তিনি।
সাংবাদিক শাকেরা আরজু শিমু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীভাঙন, বাস্তুচ্যুতি ও দারিদ্র্যের শিকার হয়ে অনেক শিশু শ্রমে জড়িয়ে পড়ছে। মেয়েশিশুরা সহিংসতার ঝুঁকিতে পড়ছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের কারণে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশ ও প্রকৃতি সুরক্ষিত রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি পরিবেশ আন্দোলন ও নারী আন্দোলনের সমন্বিত উদ্যোগের ওপরও জোর দেন।
এছাড়া মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে, নারীর প্রতি সহিংসতা ও মানবপাচারের ঝুঁকিও বাড়ছে। তারা পরিবেশ সুরক্ষায় আদিবাসী নারী, প্রতিবন্ধী নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিষয়গুলো নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, পরিবেশকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের পরিবেশ সম্পাদক পারভীন ইসলাম।
এমএইচ/এএইচ