ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৫ জুন ২০২৬, ১০:৪৬ পিএম
হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল। দেড় বছর পার হলেও ভাঙা যায়নি সে দেয়াল। উল্টো একটার পর একটা ইস্যু বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে দুই দেশের সম্পর্কে। সেই তালিকায় যোগ হলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে দিল্লি বিমানবন্দরে আটকে দেওয়ার ঘটনা।
কী ঘটেছে ডা. জাহেদের সঙ্গে?
রোববার (১৪ জুন) সন্ধ্যায় ভারতের ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের এই তথ্য উপদেষ্টা। দিল্লিতে সোমবার শুরু হওয়া ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুই দিনের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল ডা. জাহেদের।
কিন্তু কূটনৈতিক চিঠি দিয়ে আগে জানানোর পরও রোববার সন্ধ্যায় ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টাকে দিল্লিতে ঢুকতে বাধা দেয়। পরে উচ্চ মহলের নির্দেশে অনুমতি দেওয়া হলেও ডা. জাহেদ দিল্লিতে না গিয়ে কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। এই ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গণসহ নানা মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?
ডা. জাহেদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সোমবার (১৫ জুন) সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দিল্লির ওই ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত এবং দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এ ঘটনায় যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
এর কয়েক ঘণ্টা বাদেই সোমবার দুপুরে ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পাওয়ানকুমার বঢ়েকেকে তলব করা হয়। এসময় তার হাতে একটি প্রতিবাদপত্র তুলে দেওয়া হয় বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে রোববার দিল্লির বিমানবন্দরে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, তাতে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় এমপির ক্ষোভ প্রকাশ
ডা. জাহেদের সঙ্গে ঘটা দিল্লি বিমানবন্দরের ওই ঘটনায় জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (ঢাকা-১২) মো. সাইফুল আলম খান মিলন।
বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর অভিহিত করে সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘যথাযথ কূটনৈতিক চিঠি দেওয়ার পরেও কেন তথ্য উপদেষ্টাকে ভারতের বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হলো, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত তাকে ভারতে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হলেও তিনি অপমানে সেখান থেকে দেশে ফিরে এসেছেন।’
এই ঘটনার পেছনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কোনো ব্যর্থতা কাজ করেছে কি না এবং সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চান জামায়াতের এমপি সাইফুল আলম খান। একই সঙ্গে এ বিষয়ে তিনি সংসদে ৩০০ বিধিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট এবং আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দাবি করেন।
শেখ হাসিনার পতনের ক্ষত ভারতের আগেই ছিল
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিল্লিতে পালিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সমালোচকরা বলেন, ওই ঘটনা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে ভারতের মনে। হাসিনার পতন দেশটি মানতে পারেনি। কারণ, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সম্পর্ক ছিল গলায় গলায়।
ফলে শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারিয়ে দিল্লি পালিয়ে যাওয়ার পরই ভারতীয় ভিসা বন্ধ করে দেওয়া হয় বাংলাদেশিদের জন্য। সেই সঙ্গে দেশটির গণমাধ্যমগুলোতে বাংলাদেশ নিয়ে চলতে থাকে ধারাবাহিক অপপ্রচার। তিলকে তাল বানিয়ে প্রতিদিনই প্রচার হতে থাকে নানা মুখরোচক বানোয়াট সংবাদ। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পরও চলে প্রতিবেশী দেশের অপপ্রচার।
পুশইন নিয়ে উত্তেজনা চলমান
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশইন কার্যক্রম চালাচ্ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। সেই অপচেষ্টা এখনো অব্যাহত। কিছু ক্ষেত্রে তারা সফল হয়েছে, আবার কয়েকটি সীমান্তে বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধার মুখে পুশইনে ব্যর্থ হয়েছে বিএসএফ।
ভারতের এই অব্যাহত অপচেষ্টার কারণে দুই দেশের বিভিন্ন সীমান্তে কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা চরমে। প্রায়ই বিএসএফ সদস্যদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়াতে হচ্ছে বিজিবি সদস্যদের। সীমান্তের লোকজনের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার। বিজিবি-বিএসএফের একাধিক পতাকা বৈঠকেও এ বিষয়ে কোনো সমাধান আসেনি।
পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা নিয়ে উত্তেজনা তো আছেই। প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য হারে বাংলাদেশিকে সীমান্তে গুলি করে মারে ভারতীয় বাহিনী বিএসএফ। বারবার এর প্রতিবাদও জানায় সরকার। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করে না ভারত। বাংলাদেশের দিকে যেন তাক করাই থাকে বিএসএফের বন্দুক, হাতে থাকে ট্রিগারে। সীমান্তে বাংলাদেশি দেখলেই চলে গুলি।
চলমান সেই সীমান্ত হত্যা এবং পুশইন নিয়ে টালমাটাল অবস্থার মাঝেই ডা. জাহেদের ইস্যুটি বড়োসড়ো বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনা বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে নতুন অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এখন ডা. জাহেদের এই ঘটনার জল কতদূর গড়ায়, সেটাই দেখার।
এএইচ