নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ জুন ২০২৬, ০৪:২৩ পিএম
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন মিডিয়া কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, গণমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না। এই আয়না যত নিখুঁত হবে, রাষ্ট্র ও সমাজের বাস্তব চিত্রও তত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে। তবে অতীতে গণমাধ্যম সংস্কার নিয়ে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর অধিকাংশই আংশিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে বাংলাদেশে গণমাধ্যম একটি শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি।
সোমবার (১৫ জুন) বেলা ১১টায় ডিএফপি সম্মেলন কক্ষে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কমিশন গঠনের জন্য বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর দাঁড়ানো প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে জাতীয় সম্পাদক কাউন্সিল, সংবাদপত্র মালিক সমিতি, সাংবাদিক সংগঠন, ইউনিয়ন এবং গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি তাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে একটি অভিন্ন লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করা। কারণ লক্ষ্য ও মতামতের ক্ষেত্রে ঐক্য না থাকলে অতীতের মতো অনেক উদ্যোগই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা, যেখানে কোনো না কোনো দর্শন ও আদর্শকে ধারণ করতে হয়। সচেতন সাংবাদিকদের লেখনীর মধ্যেও সেই চিন্তার প্রতিফলন ঘটে। তবে মতাদর্শগত ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও দেশ ও মানবতার বৃহত্তর স্বার্থে একটি ঐক্যবদ্ধ সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই কঠিন কাজকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে না আনতে পারলে প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, অতীতে বিভিন্ন জাতীয় সংকটে সম্মিলিতভাবে কাজ করার সংস্কৃতির অভাব এবং প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতিই ছিল প্রধান সমস্যা। বর্তমানে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে একটি ‘কমন লক্ষ্য’ খুঁজে পাওয়া গেছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই চিন্তার আলোকে একটি ‘ফেডারেল কালচার’ এবং বিচারিক ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাজ্যের অফকম (Ofcom) কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (FCC) আদলে একটি গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হলে তা পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হবে। এই কমিশন একদিকে যেমন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে স্বাধীনতার অপব্যবহার ও নৈরাজ্য রোধে দায়িত্বশীলতার সীমারেখাও নির্ধারণ করবে। এ লক্ষ্য অর্জনে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধারাবাহিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং সম্মিলিত ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে।
জাতীয় সম্পাদক কাউন্সিলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের বাধার মুখোমুখি হয়েছে।
আওয়ামী লীগের শাসনামল প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করে বলেন, স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকেই মানুষের অধিকার খর্ব করার একটি ধারাবাহিক ইতিহাস তৈরি হয়েছে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০১৭ সালে দ্বিতীয় দফায় কারাভোগ শেষে মুক্তি পাওয়ার পর জাতীয় প্রেসক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে শেখ পরিবারের গণমাধ্যমবিরোধী মনোভাব নিয়ে মন্তব্য করেছিলাম। ওই বক্তব্যের জেরে আমার বিরুদ্ধে নতুন করে ৩৫টি মামলা দায়ের করা হয়। আগের মামলাগুলোর পাশাপাশি নতুন এসব মামলা আমাকে আবারও হয়রানির মুখে ফেলে।
তিনি অভিযোগ করেন, একটি বক্তব্যের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য মামলা দায়ের হওয়া কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এমন রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।
মাহমুদুর রহমান বলেন, ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠা সেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই। এই সংগঠনের আহ্বায়ক শফিক রেহমান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পারলেও তার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারাগারে শফিক রেহমানের সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, সংগঠনটির অন্যতম লক্ষ্য হলো গণমাধ্যমকে কোটামুক্ত করা এবং একটি জাতীয় চরিত্র প্রদান করা। এ কারণেই সংগঠনের নামের সঙ্গে ‘জাতীয়’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে। অতীতের বিভিন্ন সম্পাদক সংগঠনের তুলনায় এবার প্রথমবারের মতো ঢাকার বাইরের সম্পাদকদেরও কাউন্সিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি অনুষ্ঠানের সূচনাও করা হয়েছে ঢাকার বাইরের একজন সম্পাদকের বক্তব্যের মাধ্যমে।
গণমাধ্যমের প্রকৃত স্বাধীনতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, একজন সাংবাদিক বা সম্পাদক যেন নিজের মতামত নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারেন, সেটিই প্রকৃত স্বাধীনতা। কেউ সেই মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলে তার জবাব লেখার মাধ্যমে দেওয়া উচিত, কিন্তু কণ্ঠরোধ বা দমন-পীড়নের মাধ্যমে নয়।
তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যমের এই স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য সাংবাদিক, সম্পাদক ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট সবাইকে অন্তত এই একটি প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
নবগঠিত ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের প্রথম জনসম্মুখের অনুষ্ঠান হিসেবে এ আয়োজনের প্রতি গণমাধ্যমকর্মীদের ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে যে এমন একটি সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা ছিল।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের আহ্বায়ক শফিক রেহমান, যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান, নয়াদিগন্তের সম্পাদক সালাহ উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ, যুগান্তরের সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, ঢাকা মেইলের নির্বাহী সম্পাদক হারুন জামিল, প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান সোহেল, সংগ্রামের সম্পাদক আযম মীর শাহীদুল আহসান, নিউ নেশনের সম্পাদক মোকাররম হোসেন, ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, মানবকণ্ঠের সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, লোকসমাজের সম্পাদক শান্তনু ইসলাম সুমিত, ডেইলি পিপলস ভিউয়ের সম্পাদক ওসমান গনি মনসুর এবং জালালাবাদের সম্পাদক মুকতাবিস উন নূর প্রমুখ।
এম/এফএ