images

জাতীয়

‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বোঝা যায় সমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতায়’

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৪ জুন ২০২৬, ০২:৩০ পিএম

পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনের সংসদ সদস্য ও সেন্টার ফর মিডিয়া, ইনফরমেশন অ্যান্ড পাবলিক পলিসির পরিচালক ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেছেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আছে কি না, তা প্রশংসামূলক সংবাদ দেখে বোঝা যায় না; বরং সরকার ও রাষ্ট্র সমালোচনা কতটা সহ্য করতে পারে, সেটিই প্রকৃত পরীক্ষার বিষয়। মাইক বন্ধ করা যেতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন বন্ধ করা যায় না। কোনো রাষ্ট্র যদি সমালোচনাকে ভয় পায়, তাহলে বুঝতে হবে সেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

রোববার (১৪ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে অনুষ্ঠিত ‘তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার: একটি জনমুখী ও সংস্কারমূলক রোডম্যাপ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যেমন ইসলামফোবিয়ার কথা শোনা যায়, তেমনি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘সংস্কারফোবিয়া’ও দেখা যাচ্ছে। অনেকেই এখন সংস্কার শব্দটি উচ্চারণ করতে অনীহা দেখাচ্ছেন। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন অঙ্গকে পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েই জনগণের সমর্থন নেওয়া হয়েছিল। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, সংস্কারকে ভয় পাওয়ার কারণ কী?

গণঅভ্যুত্থান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হলেও আন্দোলন থেমে থাকেনি। তখন শিক্ষার্থীরা ‘তুমি কে, আমি কে— মিডিয়া, মিডিয়া’ স্লোগান দিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে তারা বুঝিয়ে দিয়েছিল, তথ্যপ্রবাহের পথ বন্ধ করে সত্যকে থামিয়ে রাখা যায় না। যখন গোটা জাতি তথ্যের বাহক হয়ে ওঠে, তখন কোনো শক্তিই মানুষের প্রশ্নকে দমন করতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল প্রতিষ্ঠানগত স্বাধীনতা নয়; সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। কোনো সরকারের যদি ধারণা হয় যে মাইক বন্ধ করে বা তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে প্রশ্ন থামিয়ে দেওয়া যাবে, তাহলে সেটি ভুল ধারণা। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, তথ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের কণ্ঠস্বর দীর্ঘদিন চাপা রাখা সম্ভব নয়।

গণমাধ্যম সংস্কারের প্রশ্নকে রাষ্ট্র সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোতে সমস্যা থেকে গেলে শুধু সংশোধনী কমিটি গঠন করে সংকটের সমাধান হবে না। সর্বাঙ্গে ব্যথা হলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ওষুধ প্রয়োগ করে যেমন সুফল পাওয়া যায় না, তেমনি রাষ্ট্রের গভীর সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। সেই সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে উন্নয়নকেন্দ্রিক প্রচারণাকে অনেক সময় সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু গণমাধ্যমের কাজ কেবল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রচার নয়। কোনো সড়ক নির্মিত হয়েছে, সেটি সংবাদ নয়; বরং সেই প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে কি না, বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যবহার হয়েছে কি না এবং জনগণ প্রকৃত সুবিধা পাচ্ছে কি না— সেগুলো অনুসন্ধান করাই সাংবাদিকদের দায়িত্ব।

ড. মাসুদ বলেন, জনগণ অতীতে সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে। সেই প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে কেবল উন্নয়ন বা নির্বাচনকেন্দ্রিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। জনগণের আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের সম্মানহানি হলে রাষ্ট্র দ্রুত ব্যবস্থা নেয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে একই ধরনের সংবেদনশীলতা দেখা যায় না। আইনের প্রয়োগে বৈষম্য থাকলে এবং সমালোচনামূলক মত প্রকাশের কারণে মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। সভাপতিত্ব করেন খ্যাতিমান লেখক ও সাংবাদিক আবুল আসাদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইস্টার্ন নিউ মেক্সিকো ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. খাদেমুল ইসলাম হৃদয়। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন বাবর, একুশে টেলিভিশনের হেড অব নিউজ হারুনুর রশিদ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন, ঢাকা মেইলের নির্বাহী সম্পাদক হারুন জামিলসহ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা।

এএইচ/এফএ