জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
১১ জুন ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম
নিরাপদ সাইকেল লেন ও সমন্বিত সাইকেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা ও সাইকেলের যন্ত্রাংশের ওপর বিদ্যমান শুল্ক এবং কর কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসার জোরালোভাবে আহ্বান জানিয়েছে ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিইং বাংলাদেশ এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট (ডাব্লিউবিবি)।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকালে রাজধানীতে বিশ্ব বাইসাইকেল দিবস-২০২৬ উপলক্ষে সংস্থা দুটির যৌথ আয়োজনে বাইসাইকেল র্যালি ও অবস্থান কর্মসূচিতে এসব দাবি জানানো হয়।
কর্মসূচিতে বক্তারা পরিবেশ দূষণ, জলবায়ুর বিপর্যয় রোধ এবং চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে বাইসাইকেলের গুরুত্বকে তুলে ধরেন।
সভাপতির বক্তব্যে ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী বলেন, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব দিন দিন প্রকট হচ্ছে। একই সঙ্গে শহরগুলোতে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বায়ুদূষণের পরিমাণ এবং জ্বালানি সংকট। সাইকেলে যাতায়াতে কোনো কার্বন নিঃসরণ হয় না এবং প্রতি কিলোমিটার যাত্রায় কার্বন নিঃসরণ ব্যক্তিগত গাড়ির তুলনায় প্রায় ১০ গুণ কম।
তিনি ব্যক্তিগত মোটরযানের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অযান্ত্রিক ও পরিবেশবান্ধব পরিবহনের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন। এক্ষেত্রে বাইসাইকেল ব্যবহার একটি কার্যকর, সাশ্রয়ী ও টেকসই সমাধান। তিনি সিটি করপোরেশন, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষের সকল পরিকল্পনায় সাইকেলবান্ধব পরিবেশকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানান।
ধানমন্ডি কচিকণ্ঠ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, একটি গাড়ি পার্কিং করতে যে জায়গা লাগে, সেই জায়গায় প্রায় ৮ থেকে ১০টি সাইকেল রাখা সম্ভব। ফলে সাইকেলের ব্যবহার বাড়লে নগরের সড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
তিনি স্বাস্থ্যকর নগর জীবনের জন্য সাইকেল বান্ধব নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং নিরাপদ অবকাঠামোর মাধ্যমে নগরবাসীকে সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান।
রায়ের বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক তাহাজ্জাত হোসেন বলেন, প্রতিদিনের যাতায়াতে সাইকেল চালানো শরীর চর্চা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষারও একটি সহায়ক মাধ্যম। প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিট সাইকেল চালানো, একজন মানুষের শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া বায়ুদূষণ প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে পরিবেশবান্ধব সাইকেল।

ঢাকা আইডিয়াল ক্যাডেট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এম এ মান্নান মনির বলেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মস্থলে এবং স্বল্প দূরত্বে শিক্ষার্থী এবং পথচারীদেরকে বাইসাইকেল চালাতে অনুপ্রাণিত করতে হবে। পাশাপাশি, সাইকেলের ব্যবহার বাড়াতে এর মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে সাইকেল ও এর যন্ত্রাংশের ওপর বিভিন্ন শুল্ক, কর ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি করায় সাইকেলের বাজারমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এক্ষেত্রে, সাইকেলের যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ও কর হ্রাস, স্থানীয় উৎপাদনে প্রণোদনা এবং সাইকেলবান্ধব নীতিমালা গ্রহণের মাধ্যমে সাইকেলকে আরও সহজলভ্য করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সাইকেল লেন পরিষদের সভাপতি আমিনুল ইসলাম টুববুস বলেন, শহরগুলোতে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ স্বল্প দূরত্বে যাতায়াত করেন। কিন্তু নিরাপদ সাইকেল লেন, সাইকেল পার্কিং এবং সাইকেলবান্ধব অবকাঠামোর অভাবে সাইকেল ব্যবহারকারীরা নানা ঝুঁকির মুখোমুখি হন। ঢাকায় নিরাপদ সাইকেল লেন বাস্তবায়নের দাবিতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছি। কিন্তু এখনও এ বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।
র্যালিটি রাজধানীর আবাহনী মাঠ থেকে জিগাতলা প্রদক্ষিণ করে পুনরায় আবাহনী খেলার মাঠের সামনে এসে শেষ হয়। র্যালিটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘সাইকেল বান্ধব নগরী, জলবায়ু সহিষ্ণু ভবিষ্যৎ’। ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিইং বাংলাদেশ এর কমিউনিকেশন অফিসার মাহামুদুল হাসান এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের সহকারী প্রকল্প কর্মকর্তা মো. মিঠুনের সঞ্চালনায় র্যালিতে বিভিন্ন সাইকেল ক্লাবের সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, পরিবেশবাদী সংগঠন ও প্রতিনিধিবৃন্দ এবং সাধারণ নাগরিকসহ প্রায় ১২০ জন সাইক্লিস্ট অংশগ্রহণ করেন।
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার নিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সুপারিশমালা তুলে ধরেন। এগুলো হলো—
• প্রধান সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড জোন এবং আবাসিক এলাকাগুলোকে সংযুক্ত করে পৃথক ও নিরাপদ সাইকেল লেন নির্মাণ করা।
• শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপদ সাইকেল পার্কিং সুবিধা নিশ্চিত করা।
• স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য এলাকাভিত্তিক সাইকেল শেয়ারিং বা ভাড়া ব্যবস্থা চালু করা এবং এর প্রচার করা।
• কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজার এবং গণপরিবহন স্টেশনে নিরাপদ সাইকেল পার্কিং স্থাপন সাইকেলের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হ্রাস করা।
• সাইকেলের দেশীয় উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পকে উৎসাহিত করতে কর-সুবিধা, সহজ ঋণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা।
এএম/এফএ