জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
১০ জুন ২০২৬, ০৪:৫৭ পিএম
সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ১৮০ দিন, ২০২৬-২৭ অর্থবছর এবং আগামী ৫ বছরের জন্য মেগা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এসব কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (১০ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের চতুর্থ দিনে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের করা লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
সংসদে দেওয়া লিখিত উত্তরে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড
'ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক'- এ দর্শনে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষায় নারীপ্রধান পরিবারকে 'ফ্যামিলি কার্ড'-এর মাধ্যমে মাসিক আড়াই হাজার টাকা দেওয়া শুরু হয়েছে। পাইলটিং পর্যায়ে এ পর্যন্ত ৩৬টি ইউনিটের ৬০ হাজার ৪৪টি পরিবারকে এ কার্ড দেওয়া হয়েছে।
কৃষকের ইউনিক পরিচয় নিশ্চিতকরণ ও ন্যায্যমূল্যে উপকরণ পেতে গত ১ বৈশাখ (১৪ এপ্রিল ২০২৬) থেকে 'কৃষক কার্ড' বিতরণ শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত ২০ হাজার ৭৪৮ জনকে এ কার্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাজেটে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে সারা দেশের প্রায় ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ জন কৃষক উপকৃত হবেন।
ই-হেলথ কার্ড ও সম্মানি ভাতা
১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির আওতায় ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪ হাজার ৯০৮টি মসজিদ, ৯৯০টি মন্দির, ১৪৪টি বৌদ্ধ বিহার/প্যাগোডা এবং ৩৯৬টি গির্জায় কর্মরত ব্যক্তিবর্গকে মাসিক সম্মানি ভাতা দিচ্ছে।
পাশাপাশি জনগণকে 'ই-হেলথ কার্ড' প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৮০ দিনের মধ্যে ৫টি জেলায় (খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী) ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা প্রদান শুরু হবে। এটি ইলেকট্রনিক পেশেন্ট রেফারেল ও ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
কর্মসংস্থান ও শিক্ষাখাত
সরকার ৫ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তরে শূন্য পদের বিপরীতে ২ হাজার ৮৭৯ জন লোক নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
আগামী অর্থবছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিশুর মাঝে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণ এবং পর্যায়ক্রমে 'ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব' বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। ১৮০ দিনের মধ্যে দেশের ২ হাজার ৩৩৬টি কারিগরি ও ৮ হাজার ২৩২টি মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ফ্রি ওয়াই-ফাই’ চালু করা হবে। এছাড়া ল্যাঙ্গুয়েজ স্টুডেন্ট ভিসায় বিদ্যমান জামানতবিহীন ঋণ সীমা ৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে এবং জাপানগামীদের ভিসা প্রাপ্তি সহজ করা হয়েছে।
পেপ্যাল চালু ও অবকাঠামো উন্নয়ন
দেশে হাই-টেক/সফটওয়্যার পার্কগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনা এবং পেপ্যাল (PayPal) কার্যক্রম আরম্ভের উদ্যোগ গ্রহণে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া সারা দেশে শহর ও গ্রামে প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলায় যথাক্রমে ৮ বিঘা ও ১০ বিঘা করে উন্মুক্ত খেলার মাঠ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিবেশ ও বিদ্যুৎ
গত ১৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় ৪টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ৬৬৬টি খালের কাজ চলমান, যার মোট দৈর্ঘ্য ৯৬৫.০৪ কিলোমিটার। আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং আসন্ন বর্ষাতেই প্রায় ৩ কোটি ১৪ লাখ চারা রোপণ করা হবে। এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে রুফটপ সোলার ও নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে।
ক্রীড়াখাতে উন্নয়ন
ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণে ১২-১৪ বছরের শিশু-কিশোরদের জন্য ফুটবল, ক্রিকেটসহ ৮টি খেলা অন্তর্ভুক্ত করে গত ২ মে 'নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬' উদ্বোধন করা হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারকে প্রাধান্য দিয়ে জাতীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য ক্রীড়া ভাতা চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫০০ জনকে এই ভাতার আওতায় আনার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ পর্যন্ত ৩০০ জনকে ভাতা এবং ৩২৫ জনকে ক্রীড়া কার্ড প্রদান করা হয়েছে।
বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানাই
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দেশের সুষম উন্নয়নে বিশ্বাস করে। তাই সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের মতো বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের এলাকায়ও সমানভাবে উন্নয়ন কাজ করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে গঠনমূলক সমালোচনা থাকলে সরকার তা গ্রহণ করবে। বাজেট অধিবেশনের চতুর্থ দিনে সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সংসদে ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেমের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের এলাকার উন্নয়ন ও কর্মপরিধি নিয়ে কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নির্দিষ্ট আসন থাকলেও নারী সংসদ সদস্যদের সংবিধানে বা আইনে নির্দিষ্ট কোনো আসন নেই। তবে রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কাঠামোর ভিত্তিতে দলীয় অবস্থান থেকে তাদের কাজের জন্য কিছু জায়গা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
এলাকার উন্নয়নে সরাসরি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং নারী সংসদ সদস্য—উভয়েরই কাজ করার অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘উন্নয়নের বিষয়ে সরকারি নিয়মানুযায়ী আমরা এগোচ্ছি। আপনার এলাকার উন্নয়নের বিষয়ে আমার সহযোগিতা করার কিছু থাকলে জানাবেন, আমি সরাসরি সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।’
পরবর্তীতে সংসদ সদস্য আনিছুর রহমানের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী দেশের সুষম উন্নয়ন এবং বিরোধী দলের প্রতি সরকারের সহযোগিতার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
স্পিকারের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কয়েকদিন আগে সংসদ কীভাবে চলবে সে বিষয়ে কমিটির একটি বৈঠক ছিল। সেখানে মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতাও ছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, ঈদের আগে সরকারের (এলজিইডি) পক্ষ থেকে দেওয়া কিছু সহযোগিতা হয়তো বিরোধীদলীয় অনেক সংসদ সদস্য পাননি। আমি ওই বৈঠক থেকে বেরিয়েই এলজিইডি মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী উভয়কেই সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশনা দিয়েছিলাম, বিরোধীদলীয় কোনো সংসদ সদস্য যদি না পেয়ে থাকেন, তবে যাতে দ্রুত সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন, ‘বর্তমান সরকার দেশের সম-উন্নয়নে বিশ্বাস করে। আমরা, সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা যেভাবে এলাকার উন্নয়ন করবেন, ঠিক একইভাবে সরকারের সম্পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে বিরোধীদলীয় সদস্যবৃন্দ যারা আছেন, তাদের এলাকায়ও। আমরা সমানভাবে কাজ করার চেষ্টা করব।’
সরকারের পক্ষ থেকে উন্নয়ন সহযোগিতা দেওয়ার পরও সরকারি দলের বিরুদ্ধে যেসব অপপ্রচার হয়, সেগুলো বন্ধে বিরোধী দলের সঙ্গে কোনো আলোচনা হবে কি না—সাংসদ আনিসুর রহমান এমনটি জানতে চাইলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমার মনে হয় এ বিষয়ে আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। সবেমাত্র শুরু হলো, লেট আস ওয়েট অ্যান্ড সি।’
এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘এই সরকার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি সরকার। কাজেই যদি গঠনমূলক কোনো সমালোচনা থাকে, অবশ্যই সেটি আমরা গ্রহণ করব এবং সেভাবে আমরা পদক্ষেপ নেব।’
বিইউ/ক.ম