আব্দুল হাকিম
০৫ জুন ২০২৬, ০২:১২ পিএম
- প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল প্রায় ৮০০ কোটি টাকা
- ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৮৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ
- প্রকল্পের পূর্ণ সুফল এখনো দৃশ্যমান নয়
- বারবার পরিবর্তনে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া জটিল হয়েছে
- অসমাপ্ত কাজ রেখেই প্রকল্প সমাপ্তির সতর্কবার্তা
- গুণগত মান নিশ্চিত করতে কড়া মনিটরিংয়ের নির্দেশ
ঢাকার আশপাশের ছয় জেলায় গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য নেওয়া বৃহত্তর ঢাকা গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন-৪ প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল উচ্চ প্রত্যাশা নিয়ে। পরিকল্পনা ছিল সড়ক, সেতু, কালভার্ট ও গ্রামীণ যোগাযোগ কাঠামো উন্নত করে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অর্থনৈতিক গতি বাড়ানো। কিন্তু সময় গড়িয়েছে, বাজেট সংশোধন হয়েছে একাধিকবার, মেয়াদও বেড়েছে বারবার, তবুও প্রকল্পটির কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। আট বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো শতভাগ বাস্তবায়নের দেখা মেলেনি।
২০১৮ সালে অনুমোদিত এই প্রকল্পটি শুরু থেকেই উচ্চ ব্যয়ের সরকারি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত ছিল। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নকে লক্ষ্য করে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। শুরুতে নির্ধারিত ব্যয় ছিল প্রায় ৮০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। নির্ধারিত সময় ছিল ৪ বছর। কিন্তু বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে কাজের জটিলতা, দরপত্র প্রক্রিয়া, জমি সংক্রান্ত সমস্যা এবং ব্যয় কাঠামোর পরিবর্তন প্রকল্পটিকে ধীরে ধীরে পিছিয়ে দেয়।
প্রকল্পের প্রথম সংশোধনের পরও পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হয়নি। বরং কাজের অগ্রগতি কিছুটা বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত গতিতে পৌঁছায়নি। সংশোধনের মাধ্যমে সময় বাড়ানো হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, অনেক স্কিম এখনো অসম্পূর্ণ। সড়ক ও সেতু নির্মাণের কিছু অংশ শেষ হলেও সংযোগ সড়ক, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সম্পূরক অবকাঠামোর কাজ বাকি থেকে যায়। ফলে পুরো প্রকল্পের সুফল এখনো পূর্ণভাবে দৃশ্যমান হয়নি।
পরিকল্পনা কমিশনের সাম্প্রতিক প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় উঠে এসেছে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনের বিষয়টি। সেখানে দেখা যায়, প্রকল্পের ব্যয় কমিয়ে পুনর্গঠন করা হলেও বাস্তবায়ন চাপে রয়েছে আগের মতোই। নতুন মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। তবে এই সময়ের মধ্যেই পুরো কাজ শেষ করা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সভার আলোচনায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, সময়মতো কাজ শেষ না হলে প্রকল্পের কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মাঠপর্যায়ের অগ্রগতির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রকল্পটির প্রায় ৮৬ শতাংশ ভৌত কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৮৫ শতাংশের কাছাকাছি। যদিও এই অগ্রগতি কাগজে ভালো দেখালেও বাস্তবে অসমাপ্ত স্কিমের সংখ্যা এখনো উল্লেখযোগ্য। মোট ৭৭৩টি স্কিমের মধ্যে অনেক অংশ শেষ হলেও প্রায় ৮৫টি স্কিম এখনো চলমান রয়েছে। এসব স্কিমের কাজ শেষ করতে হলে সময়, অর্থ ও সমন্বয়ের প্রয়োজন, যা বর্তমান সময়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক বলছেন, এলজিইডির নতুন রেট সিডিউল কার্যকর হওয়ার কারণে বিভিন্ন প্যাকেজের ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি বাস্তব অবস্থার পরিবর্তনে কিছু স্কিম বাদ দিতে হয়েছে এবং নতুন কিছু স্কিম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে করে প্রকল্পের কাঠামো বারবার পরিবর্তিত হয়েছে, যা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করেছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির কারণে প্রশাসনিক ও রাজস্ব ব্যয়ও বেড়ে মোট ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে। শুরুতে যে বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটি কার্যত স্থিতিশীল থাকেনি। বিভিন্ন সময়ে ব্যয় সমন্বয়, কমানো ও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, প্রকল্পের কার্যক্রম যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই ব্যবস্থাপনা ব্যয় বাড়ছে। বিশেষ করে আউটসোর্সিং, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ব্যয় এবং প্রশাসনিক খাতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কমিশন এসব খাতে অযৌক্তিক ব্যয় না বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে স্কিম বাতিল ও পুনর্গঠন নিয়ে। কিছু স্কিম বাস্তবায়নযোগ্য না হওয়ায় বাতিল করতে হয়েছে, আবার কিছু নতুন স্কিম যোগ করা হয়েছে। কিন্তু এসব পরিবর্তনের যথাযথ যৌক্তিক ব্যাখ্যা আরডিপিপিতে স্পষ্টভাবে না থাকায় প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কোন স্কিম কেন বাদ দেওয়া হলো এবং কেন নতুন স্কিম যুক্ত হলো তার পূর্ণ ব্যাখ্যা থাকতে হবে।
>> আরও পড়ুন
প্রকল্পটির আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনার অভাব। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নির্মিত সড়ক ও অবকাঠামো কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট এক্সিট প্ল্যান এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। অথচ দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামোর টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনা কমিশন এই বিষয়ে আলাদা পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে।
প্রকল্পটির দুর্বল দিকগুলো তুলে ধরেন বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা। তারা বলেন, প্রকল্পে সময় ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। কাজের গতি একরকম না থাকায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমাপ্তি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে ক্রয় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পর্যায়ে সমন্বয়ের অভাবও প্রকল্পের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় মাঠপর্যায়ের কাজ থমকে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রকল্পের মূল সমস্যা শুধু অর্থ বা প্রযুক্তি নয়, বরং ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের দুর্বলতা। একাধিক দফায় মেয়াদ বৃদ্ধি এবং সংশোধন করা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা আসেনি। ফলে প্রকল্পটি একটি দীর্ঘমেয়াদি চাপের মধ্যে পড়ে গেছে। উন্নয়ন প্রকল্প দীর্ঘ হলে তার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, এই প্রকল্প তার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
এলজিইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের বড় অংশ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং বাকি কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। তবে কিছু জটিল স্কিমের কাজ সময়মতো শেষ করা কঠিন হচ্ছে। বিশেষ করে সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে ভৌগোলিক ও কারিগরি জটিলতা সময় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুনের মধ্যে প্রকল্পের সব কাজ শেষ করতে হবে। এই সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ না হলে অসমাপ্ত রেখেই প্রকল্প বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এটি প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্যান্ট চার্ট ভিত্তিক সময় ব্যবস্থাপনা এবং নিবিড় মনিটরিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, বৃহত্তর ঢাকা গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন-৪ প্রকল্পটি বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের গ্রামীণ যোগাযোগ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পের অবশিষ্ট সকল কাজ নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যেই সম্পন্ন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই কাজের গুণগত মানের সঙ্গে আপস করা যাবে না। এ জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ ও এলজিইডিকে বাস্তবায়ন কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি ও মনিটরিং করতে হবে।
এএইচ/এএস