images

জাতীয়

প্রস্তুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের রোডম্যাপ

মো. মেহেদী হাসান হাসিব

০৩ জুন ২০২৬, ১০:১৫ এএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আলোচনা তুঙ্গে। চলতি বছরেই সিটি করপোরেশনসহ একাধিক স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। বর্ষাকাল হওয়ায় এই নির্বাচন আয়োজনে কিছুটা দেরি হচ্ছে। তবে ইতোমধ্যে এই নির্বাচনের রোডম্যাপ প্রস্তুত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বর্ষাকাল শেষ হলেই ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজন করবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। 

ইসি কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যেমন একটি রোডম্যাপ প্রস্তুত করা হয়, ঠিক সেরকম একটি রোডম্যাপ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্যও তৈরি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বর্ষাকাল শেষ হওয়ার পরপরই ধাপে ধাপে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা হবে। তবে পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা এখনই জানানো সম্ভব হচ্ছে না। কারণ সরকারের সঙ্গেও এ নিয়ে আলোচনার বিষয় রয়েছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন কীভাবে নির্বাচনগুলো করবে, নির্বাচন কমিশনের যে কর্মপরিকল্পনা, সেটি আমরা তৈরি করছি। আশা রাখি, নির্বাচন কমিশনের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী নির্বাচন ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে এবং বর্ষা মৌসুম শেষেই তা শুরু হয়ে যাবে।’

যেহেতু একটি নির্বাচনের সময় চলে এসেছে এবং সামনে নির্বাচন শুরু হবে, সেক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য যদি নতুন করে মামলার বিষয়গুলো আসে, সেগুলো কীভাবে দেখবেন— জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘যে কাউকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা বা কাউকে নির্বাচন থেকে বাধাগ্রস্ত করা— সেই বিষয়গুলো তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের বিষয়। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে এগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখা বা এই অবস্থায় নিরূপণ করা খুব কঠিন। তারপরও নির্বাচন কমিশনের নজরে এ ধরনের কোনো ঘটনা পড়লে আইন অনুযায়ী তার এখতিয়ার মোতাবেক ব্যবস্থা নেবে।’

এখন পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আপনাদের প্রস্তুতি কেমন— এমন প্রশ্নের জবাবে মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতির বিষয়টি যদি বলি, প্রথম কথা হচ্ছে, গত নির্বাচনে আমরা সারা বিশ্বে যে সুনাম অর্জন করেছি, যেকোনো প্রকারে হোক, যেকোনোভাবেই হোক, আমরা সেটি বজায় রাখার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এবং বিভিন্ন অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি শক্তভাবে নির্বাচন কমিশন দেখবে, যাতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে প্রাণহানি, আহত-নিহতের ঘটনা না ঘটে। নির্বাচনে সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত সজাগ এবং সচেষ্ট থাকবে।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে, কিন্তু সরকার তো দলীয়। সেক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু এটি কোনো দলীয় মনোনয়নে হচ্ছে না, দলীয় প্রতীকেও হচ্ছে না, সুতরাং পক্ষ-বিপক্ষ তো কেউ নয়, সবাই নিরপেক্ষ। এখানে প্রশাসন যেটি রয়েছে, সরকার যেটি রয়েছে, সরকারও তো বলছে না, বলার সুযোগও নেই যে, এটি আমার প্রার্থী। অন্যান্য দলও বলার সুযোগ পাবে না যে, এটি আমার মার্কা বা আমার দল, আমি এর সমর্থনে কাজ করছি। এ ধরনের কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং আমি মনে করি, পুরো ব্যবস্থাই নিরপেক্ষ থাকবে। এটি আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি।’

Anwarul-Islam-Sarker
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার

এক্ষেত্রে আলাদা করে কোনো উদ্যোগ নেবেন, নাকি জাতীয় নির্বাচন যে প্রক্রিয়ায় আয়োজন করেছিলেন সেভাবেই করবেন— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে যারা প্রার্থী হবেন, তারা বাংলাদেশের নাগরিক; নির্বাচনে যারা ভোট দেবেন, তারাও বাংলাদেশের নাগরিক; আপনারা যারা মিডিয়াকর্মী, আপনারাও বাংলাদেশের নাগরিক; নির্বাচন কমিশনও বাংলাদেশেরই লোক। সুতরাং যেসব নির্বাচন হয়েছে বা সামনে যেসব নির্বাচন হবে, আমরা সবাই মিলে ইচ্ছা করলে ভালো করতে পারি— এর প্রমাণ তো রয়েছে। সুতরাং কেন আমরা এর ব্যত্যয় ঘটাব? আমি মনে করি, রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বিশাল পরিবর্তনের দিকেই আমরা যাচ্ছি। গত নির্বাচনে তো আপনারাই দেখেছেন, আমাদের মিডিয়ার কর্মীরা কত সুন্দরভাবে আমাদের সহযোগিতা করেছেন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নিজেরা আচরণবিধি পরিপন্থী কাজ না করার জন্য তাদের কর্মীবাহিনীকে বিরত রেখেছেন। কোনো মারামারি, কাটাকাটি বা হানাহানি না করার জন্য তারা উদ্যোগী হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উদ্যোগী ছিল, নির্বাচন কমিশন উদ্যোগী ছিল। সবাই মিলেই তো আমরা ভালো করেছি। সুতরাং এবারও ভালো না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ভালো করব, ইনশাআল্লাহ।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারকে আপনাদের তরফ থেকে একটি চিঠি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল, সেটি আসলে দেওয়া হয়েছে কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এ ধরনের কোনো বিষয় নেই।’

ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে ৪ হাজার ৫৮১টি। এর মধ্যে চলতি বছরেই নির্বাচন উপযোগী হবে ৩ হাজার ৭৫৫টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং আগামী বছরে উপযোগী হবে আরও ৩৪৯টি। এছাড়া অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের ভেঙে দেওয়া ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা, ১২টি সিটি করপোরেশন ও ৬১টি জেলা পরিষদ বর্তমানে নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে।

জানা গেছে, নতুন করে বগুড়াকে সিটি করপোরেশন ঘোষণার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। সে হিসেবে দেশে মোট সিটি করপোরেশনের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৩টি। পাশাপাশি নতুন পাঁচটি উপজেলা অনুমোদন করায় দেশের উপজেলার সংখ্যা হবে ৫০০।

ইসি নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠান নির্বাচন উপযোগী হলেও নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি অনেকাংশে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। সরকার চাইলে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন আয়োজন করবে। এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নির্বাচন আয়োজনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ইসিতে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। 

তবে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ছাড়া নতুন করে একযোগে ১১টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। পরবর্তী সময়ে বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়। সেখানেও ইতোমধ্যে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 

এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্র্বতীকালীন সরকার গঠিত হলে ৬১টি জেলা পরিষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে বিএনপি সরকার গঠনের পর ধাপে ধাপে ৫৬টি জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে পৌরসভাগুলোও প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। শুধু ইউনিয়ন পরিষদগুলোতেই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করছেন।

এমএইচএইচ/জেবি