images

জাতীয়

অভাগা মায়ের উচ্চপদস্থ সন্তানরা কারা?

নিজস্ব প্রতিবেদক

০২ জুন ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম

রাজধানীতে মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে সাত দিনের বেশি সময় ধরে পচে-গলে পড়ে ছিল ৭২ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের মরদেহ। পুলিশ জানিয়েছে, তার এক ছেলে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক। কিন্তু তাদের পরিচয় এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মুখে এখন একটাই প্রশ্ন, ‘অভাগা মায়ের সেই উচ্চপদস্থ সন্তানরা কারা?’

একজন মা সন্তানের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেন। অসুস্থতা, কষ্ট, অভাব সবকিছু বুকে চেপে সন্তানকে বড় করেন। কিন্তু সেই মায়ের শেষ পরিণতি যদি হয় ঘরের ভেতর নিঃসঙ্গ মৃত্যু, আর মৃত্যুর পর সাত দিন ধরে পচে-গলে পড়ে থাকা; তাখন সেটি শুধু একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়, সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া এক নির্মম প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

রাজধানীর মিরপুর-৬ এলাকায় নূরজাহান বেগমের মৃত্যু এখন তেমনই এক প্রশ্ন হয়ে সামনে এসেছে। রোববার রাতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে পুলিশ একটি আবাসিক ফ্ল্যাট থেকে তার পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ধারণা, অন্তত সাত থেকে আট দিন আগে তার মৃত্যু হয়েছে।

ঘটনার পর জানা যায়, মৃত নূরজাহান বেগমের এক ছেলে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্য ছেলে দেশের সর্বোচ্চ প্রকৌশল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বুয়েটের শিক্ষক। মেয়ের স্বামীও ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, যিনি পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন।

কিন্তু এত পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারের একজন বৃদ্ধা মা কেন এমন করুণ পরিণতির শিকার হলেন, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি এখন আরেকটি প্রশ্নও সামনে এসেছে। সেই দুই ছেলের পরিচয় কী? তারা কোথায় ছিলেন? কেন মায়ের খোঁজ নেননি? তবে সেসব প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মা ও মেয়ে ওই ফ্ল্যাটে একসঙ্গে থাকলেও আলাদা কক্ষে বসবাস করতেন। মেয়ে রোববার মাকে ডাকতে গিয়ে কোনো সাড়া না পেয়ে একজন নার্সকে ডেকে আনেন। পরে নার্স ঘরে ঢুকে দেখেন, বৃদ্ধা অনেক আগেই মারা গেছেন এবং মরদেহে পচন ধরে শরীরের বিভিন্ন অংশের মাংস বিছানায় খসে পড়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃদ্ধার কক্ষটির অবস্থা ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। ঘরে ছত্রাক, ময়লা-আবর্জনা ও পোকামাকড়ের উপদ্রব ছিল। দীর্ঘদিন কেউ ওই কক্ষে যেত না বলেও জানা গেছে।

পল্লবী থানার ওসি হাসান বশির বলেন, মেয়েকে দেখে কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। কারণ, একই বাসায় থেকেও তিনি মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি টের পাননি বলে দাবি করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তবে জনমনে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে সন্তানদের ভূমিকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, একজন মা সাত দিন ধরে নিখোঁজ বা অসুস্থ অবস্থায় থাকলেও কেন কোনো সন্তান তার খোঁজ নিলেন না? কেন কেউ ফোন করেননি, কেন কেউ বাসায় আসেননি?

এদিকে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পরও সংশ্লিষ্ট সন্তানদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কৌতূহল ও প্রশ্ন আরও বেড়েছে।

নূরজাহান বেগমের স্বামী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সন্তানরাও সমাজের উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত মানুষ। কিন্তু সেই পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে গেছে এক বৃদ্ধা মায়ের নিঃসঙ্গ জীবনের গল্প। মৃত্যুর পরও যার পরিচয়ের চেয়ে বেশি আলোচনায় তার সন্তানদের নীরবতা।

এমএইচ/এফএ