জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
৩১ মে ২০২৬, ০৭:৪২ পিএম
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (LGED) আওতাধীন আরইউটিডিপি (RUTDP) প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী মো. মঞ্জুর আলীর বিরুদ্ধে আউটসোর্সিং নিয়োগ, কনসালটেন্ট ফার্ম অন্তর্ভুক্তি এবং টেন্ডারে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যেই পিআরএলে (অবসর-উত্তর ছুটি) যাওয়া এই সাবেক পিডি আবারও একই পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে, যা নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, গত বছরের ১০ অক্টোবর থেকে প্রকৌশলী মঞ্জুর আলীর পিআরএল শুরু হয়। এর পর থেকেই তিনি আগের পদে ফেরার চেষ্টা-তদবির চালাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। সম্প্রতি তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়ে একটি ফাইল স্থানীয় সরকার বিভাগের সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রজেক্ট স্ট্যাটাস রিপোর্ট এবং এলজিইডির ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (DPP) অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (LGED) আওতাধীন এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পটি আরইউটিডিপি (RUTDP) বা সহনশীল নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্প। ২০২৪ সালে চুক্তি ও কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশের বিভিন্ন পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনে এর মাঠ পর্যায়ের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ ও টেন্ডার প্রক্রিয়া (যেমন রাস্তা, ড্রেন, স্ট্রিট লাইট ইত্যাদি) পুরোদমে শুরু হয়। সব ঠিক থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন প্রকৌশলী মঞ্জুর আলী।
অভিযোগ আছে, এই কর্মকর্তার পিআরএলে যাওয়ার ঠিক পূর্বে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় প্রায় ২৫০ জন কর্মী নিয়োগে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। সহকারী প্রকৌশলী, উপসহকারী প্রকৌশলী, কার্যসহকারী, সোসিওলজিস্ট ও হিসাব সহকারী পদভেদে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প পরিচালক থাকাকালে তার ভাই মো. রাজুর মাধ্যমে এই অর্থ লেনদেন হয়েছে এবং অনেকে টাকা দিয়েও চাকরি পাননি।
এছাড়া আরইউটিডিপি প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী কনসালটেন্ট খাতে বরাদ্দকৃত ৩৭০ কোটি টাকার মধ্যেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বড় অঙ্কের কমিশন বা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ইফতিশা, অ্যাকুয়া কনসালটেন্সি, ডেপকো এবং ডিপিএম—এই চারটি ফার্মকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে কয়েক লাখ টাকা বেতনের স্বতন্ত্র কনসালটেন্ট পদে নিয়োগেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সাবেক পিডির বিরুদ্ধে। একাধিক পদে লোকবল নিয়োগ না দিয়ে ভুয়া হাজিরা দেখিয়ে বেতন তোলার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি প্রকল্প বহির্ভূত ব্যক্তিগত কর্মচারীদের প্রকল্পের আওতাভুক্ত দেখিয়ে বেতন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
এদিকে এই অর্থ জালিয়াতির মাধ্যমে ঢাকা শহরের ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরে চারটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, মধুমতি মডেল টাউনে একটি প্লট এবং বিরুলিয়ায় বড় আকারে জমি ক্রয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে সাবেক এই প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে। এছাড়া তার ভাই প্রকৌশলী রাজুর নামেও একাধিক ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, এসব অভিযোগ ও সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের বিষয়ে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের সম্পদের সঠিক তথ্য জানতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। এছাড়া আউটসোর্সিং ও কনসালটেন্সি নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে পত্রিকার বিজ্ঞাপন, নিয়োগ বিধিসহ যাবতীয় নথিপত্র এলজিইডির কাছে চাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে এই কর্মকর্তা এমজিএসপি প্রকল্পের ডিপিডি (DPD) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রকল্প সমাপ্তির পর উদ্বৃত্ত বিপুল পরিমাণ অর্থ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
সাবেক প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারির পরও তাকে ফের একই পদে নিয়োগের চেষ্টায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের তদন্ত চলছে, পিআরএলে যাওয়ার পরও তাকে ফেরত আনা হলে অধীনস্তরা কাজ করতে আগ্রহী হবেন না। পুরো প্রকল্পে এর প্রভাব পড়বে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী মো. মঞ্জুর আলীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে প্রশ্ন ও অভিযোগ জানিয়ে ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
এদিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক আজিজুল হক বলেন, এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের সম্পদের সঠিক তথ্য জানতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এছাড়া আউটসোর্সিং ও কনসালটেন্সি নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে পত্রিকা বিজ্ঞাপন, নিয়োগ বিধিসহ যাবতীয় নথিপত্র এলজিইডির কাছে চাওয়া হয়েছে।
বিইউ/এআর