মোস্তাফিজুর রহমান
২৯ মে ২০২৬, ১০:৪৩ পিএম
রাজধানীর মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল্ডের পূর্বাংশে কোরবানির বর্জ্যের স্তূপে তখনো ধোঁয়া ওঠা গন্ধ। একের পর এক ড্রাম ট্রাক এসে ফেলে যাচ্ছে পশুর চামড়া, হাড়, চর্বি ও নানা বর্জ্য। ট্রাক থামার আগেই সেখানে শুরু হয়ে যায় আরেক দৃশ্য—ময়লার ভেতরে জীবিকার খোঁজে মানুষের হুমড়ি খাওয়া।
বস্তা, প্লাস্টিক, হাড় আর চর্বির ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস আলাদা করতে ব্যস্ত নারী-পুরুষরা। কারও হাতে লোহার রড, কেউ খালি হাতে টেনে তুলছেন ভারী বস্তা। কোরবানির পর ফেলা এই বর্জ্যই তাদের কাছে যেন এক ধরনের ‘মধু’—যেখান থেকে জীবিকার রসদ জোটে।
শুক্রবার (২৯ মে) বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, শুধু মাতুয়াইল নয়, আশপাশের বিভিন্ন ডাম্পিং পয়েন্টেও একই চিত্র। ট্রাক থেকে নামা বর্জ্য পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে নেমে পড়েন এসব সংগ্রহকারী।
কাজলা এলাকার বাবুল স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বর্জ্যের স্তূপে খুঁজছিলেন প্লাস্টিক ও হাড়। কাজের ফাঁকে কথা হলে তিনি বলেন, ‘বস্তা টোকাই। প্লাস্টিকের কাগজ লই। হাড় আছে, চর্বি আছে। অনেক কিছু লইতাছি।’
৫৫ বছরের বাবুল স্ট্রোক করে আগের কাজ হারিয়েছেন। এখন এই কাজই তার জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি নির্বিকারভাবে বলেন, ‘রোগটোগের ভয় পাইয়া কি হইবো? স্টোক কইরা তো এই কামে আইলাম। অন্য কাজ পারি না।’
বর্জ্যের স্তূপে কাজ করতে দেখা যায় ষাটোর্ধ কুলছুম বেগমকেও। জমানো হাড়ের বস্তার পাশে বসে তিনি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। দীর্ঘ সময় ময়লার ভেতর কাজের কষ্টের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ময়লা থেক্কা হাড্ডি উঠানো কষ্টের কাম। ভারী বস্তা টানতে হয়। যতটা সহজ মনে হয়, আসলে ততটা না।’
তিনি জানান, ট্রাক আসার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু করতে হয়। দেরি করলে বুলডোজার এসে মাটি চাপা দিয়ে দেয় সবকিছু। ‘তখন কিছুই নেওয়া যায় না,’ বলেন তিনি।
একই এলাকায় রোজিনা খাতুন দুপুরের পর আবার কাজে ফিরেছেন। তিনি জানান, সংগ্রহ করা হাড় ও অন্যান্য বর্জ্য আশপাশের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। ‘হাড্ডি-বস্তা ওইখানেই যায়। আশপাশে অনেক দোকান আছে। বেচার জায়গার অভাব নাই,’ বলেন তিনি।
আরও পড়ুন: মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে কোরবানি বর্জ্যের পাহাড়
মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল্ড ঘুরে দেখা যায়, কোরবানির বর্জ্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি। হাড়, প্লাস্টিক, বোতল—সবকিছুর আলাদা বাজার তৈরি হয়েছে আশপাশে, যেখানে এই বর্জ্যই কারও কারও কাছে হয়ে উঠেছে এক ধরনের ‘মধু’।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কোরবানির সময় এই বর্জ্যকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। তবে সংগ্রহকারীরা বলছেন, তাদের ভাগে পড়ে সামান্যই।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা মফিদুল বলেন, ‘বড় ব্যবসায়ীরাই লাভ করে। যারা ময়লা থেকে তোলে, তারা অল্প টাকা পায়। কোটি টাকার ব্যবসা চলে এটার ওপর।’
কোরবানির মৌসুমে শুধু ধর্মীয় আবহই নয়, দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভেতরে তৈরি হয় একটি অদৃশ্য অর্থনৈতিক চক্র। বিভিন্ন খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা, একটি গরু থেকে আকারভেদে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ কেজি হাড় ফেলে দেওয়া হয়। সেই হাড় সংগ্রহ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে মৌসুমে প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার বাণিজ্য হয়। বছরে এই খাতের বাজার কয়েকশ কোটি টাকায় পৌঁছায় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বর্জ্যকে শুধু ফেলে দেওয়ার উপাদান হিসেবে না দেখে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে বিবেচনা করলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। হাড় থেকে তৈরি হয় সিরামিক, বোতাম, চিরুনি, ওষুধের ক্যাপসুলের কভার ও পশুখাদ্য। নাড়িভুঁড়ি ও রক্ত ব্যবহার হয় জৈব সার, মাছ ও পাখির খাদ্যসহ বিভিন্ন শিল্পে। চর্বি দিয়ে তৈরি হয় সাবান ও অন্যান্য রাসায়নিক উপকরণ।
বিশ্ববাজারেও এসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে চীন, থাইল্যান্ড, জার্মানি ও ইতালিতে গরুর হাড় ও শিংয়ের কাঁচামালের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। রপ্তানি ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে এই খাত থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অবকাঠামো ও নীতিগত দুর্বলতার কারণে সম্ভাবনার বড় অংশই এখনো অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, ‘ল্যান্ডফিল্ড নিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে। সেখানে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের প্রকল্প চলছে। ভবিষ্যতে এখানে শূন্য বর্জ্যের ধারণা বাস্তবায়ন করা হবে।’
মাতুয়াইলের এই বিশাল বর্জ্যের পাহাড় তাই শুধু নগর জীবনের পরিত্যক্ত অংশ নয়, একই সঙ্গে এটি লুকিয়ে থাকা এক সম্ভাবনাময় অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি—যেখানে ময়লাই কারও কারও কাছে সত্যিই হয়ে উঠেছে ‘মধু’।
এএম/এআর