বোরহান উদ্দিন
২৯ মে ২০২৬, ০৪:৫৩ পিএম
রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি আট-আটটি হাসপাতাল ঘুরেও মেলেনি জরুরি চিকিৎসা। পরিচয়হীন, মানসিক ভারসাম্যহীন এক মুমূর্ষু নারীর চিকিৎসার জন্য সাত দিন দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন এক যুবক। অবসান ঘটল সেই অদম্য ও মানবিক লড়াইয়ের। গণমাধ্যমের ভূমিকা, সচেতন মহলের আকুতি এবং সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে অবশেষে হাসপাতালে ঠাঁই হয়েছে ‘দুলালী’ নামের সেই হতভাগ্য নারীর।
কঙ্কালসার এক শরীর ও এক যুবকের লড়াই
ঘটনাটির সূত্রপাত গত শুক্রবার (২২ মে)। মিরপুর-২ নম্বরের ৬০ ফিট রোডের বাসিন্দা মুছা করিম রিপন সকালে ঘর থেকে বের হয়ে বারেক মোল্লা মোড়ে দেখতে পান এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে। তীব্র অপুষ্টি আর অনাহারে কঙ্কালসার হয়ে পড়া ওই নারীর পিঠের হাড়গুলো চামড়ার ওপর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা এই নারীর এমন দৃশ্য গভীরভাবে নাড়া দেয় মুছাকে। তিনি প্রথমে দোকান থেকে কলা ও পাউরুটি এবং পরে হোটেল থেকে মোরগ পোলাও কিনে এনে ওই নারীকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তীব্র অসুস্থতার কারণে চিৎকার করলেও খাবার মুখে তোলার মতো ন্যূনতম শক্তিও ছিল না তার।
এমন পরিস্থিতিতে মুছা করিম রিপন সিদ্ধান্ত নেন, যেকোনো মূল্যেই হোক এই অসুস্থ, অবহেলিত মানুষটির চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন তিনি। পাশে থাকা দুই ভিক্ষুক নারীকে অনুনয়-বিনয় করে কিছুটা সাহায্য নেন তিনি। এরপর একটি সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে রোগীকে তাতে তুলে রওনা হন শ্যামলীর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের উদ্দেশে। নিজে মোটরসাইকেল নিয়ে ছোটেন পেছনে পেছনে। কিন্তু আসল লড়াই আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার গল্পটা শুরু হয় ঠিক সেখান থেকেই।
আট হাসপাতাল ঘুরেও মেলে না সামান্য সহানুভূতি
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক রোগীকে দেখে প্রাথমিক প্রেসক্রিপশন করলেও সাফ জানিয়ে দেন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা লিগ্যাল গার্ডিয়ান (আইনগত অভিভাবক) ছাড়া রোগী ভর্তি করা সম্ভব নয়। যে মানুষটি নিজের নাম ও পরিচয় ঠিকমতো বলতে পারে না, তার এনআইডি আসবে কোথা থেকে?
নিরুপায় হয়ে মুছা যোগাযোগ করেন পরিচিত এক চিকিৎসকের সঙ্গে। তার পরামর্শে রোগীকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু শুক্রবার হওয়ায় সেখানেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি। এরপর শুরু হয় বেসরকারি হাসপাতালের খোঁজে ছোটাছুটি।
ফার্মগেটের ‘মডার্ন সাইকিয়াট্রিক’ হাসপাতালে রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর জানানো হয়, কেরানীগঞ্জে তাদের অন্য একটি শাখায় রোগীকে পাঠানো হবে। মুছা তাতেও সায় দেন। কিন্তু সেখানে নেওয়ার পর রাতে মলমূত্র ত্যাগের বিষয়টি সামনে এনে তার শরীরের ইনফেকশনের জন্য জেনারেল হসপিটালে ভর্তির জন্য তারাও রেফার করে দেন । এরপর মুছা অসহায় হয়ে পড়েন। রোগীকে কোথায় নিয়ে যাবেন, বুঝতে পারছিলেন না ।
পরে ওইদিন দুপুরে রোগীকে নিয়ে যাওয়া হয় কাজীপাড়ায় এক্সিম ব্যাংক হাসপাতালে। সেখান থেকেও সাফ মানা করে দেওয়া হয়। এরপর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের ‘নিরাময় ক্লিনিক’ এবং এক অ্যাম্বুলেন্স চালকের সহায়তায় সর্বশেষ ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের ‘সুপারম্যাক্স হাসপাতালে’ নিয়েও কোনো লাভ হয়নি।
এভাবে টানা দুই দিন ধরে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় আটটি হাসপাতালের দুয়ারে ঘুরেও মেলেনি সামান্য সহানুভূতি বা চিকিৎসার নিশ্চয়তা। নিরুপায় হয়ে একপর্যায়ে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের জেনেটিক প্লাজার পাশে ফুটপাতে পলিথিন মুড়িয়ে রাখা হয়েছিল তাকে।
মুছা করিম আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি মানসিক স্বাস্থ্য আইনটি পড়েছি। সেখানে পরিষ্কার বলা আছে, অনিচ্ছুক বা পরিচয়হীন রোগীদের ভর্তির ক্ষেত্রে এনআইডি বা লিগ্যাল গার্ডিয়ান থাকতেই হবে- এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মেডিকেল অফিসার রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে নিজেই ভর্তি করাতে পারেন। সব হাসপাতালেই টাকার গ্যারান্টি দেওয়ার পরও শুধু সদিচ্ছার অভাবে একটা মুমূর্ষু মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।’
গতি হলো প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর হস্তক্ষেপে
এনআইডি কার্ড না থাকার কারণে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ চিকিৎসা পাবেন না- একে চরম অমানবিক আচরণ হিসেবে দেখেন মুছা করিম। এই নিয়মের প্রতিবাদে এবং দুলালীর সুচিকিৎসার দাবিতে উপায় না পেয়ে বুধবার (২৭ মে) বেলা সাড়ে ১১টায় ‘দুলালীকে বাঁচাতে চাই’ সম্বলিত প্ল্যাকার্ড হাতে গুলশানে প্রধানমন্ত্রীর গুলশানের বাসভবনের সামনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন মুছা। প্লেকার্ড হাতে গুলশানে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদও জানান তিনি।
পরে বিষয়টি দ্রুত গণমাধ্যমকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের নজরে এলে পাল্টে যায় পুরো দৃশ্যপট। ঘটনাটি জানতে পেরে তাৎক্ষণিকভাবে মানবিক উদ্যোগে এগিয়ে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) জিয়াউদ্দিন হায়দার। তার সরাসরি হস্তক্ষেপ, তদারকি ও দিকনির্দেশনায় দুলালীকে পুনরায় রাজধানীর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ভর্তি নিশ্চিত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার আশ্বস্ত করেছেন, দুলালীর চিকিৎসার সার্বিক তত্ত্বাবধান এখন থেকে সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় করা হবে।
শুক্রবার (২৯ মে) তিনি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন দুলালীকে সশরীরে দেখতে যান। এ সময় তার সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হানসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিইউ/এএইচ