মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
২৭ মে ২০২৬, ১০:২৪ পিএম
পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করতে নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়ছেন কয়েক কোটি মানুষ। ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে ঘরমুখো মানুষের যাত্রায় এবারও ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। একদিকে দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান যোগাযোগ রুটগুলোতে তুলনামূলক স্বস্তি থাকলেও উত্তরাঞ্চলের মহাসড়কগুলোতে তীব্র যানজট, দীর্ঘ অপেক্ষা ও চরম ভোগান্তির মধ্যে বাড়ি ফিরছেন লাখো মানুষ। বিশেষ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে পরিস্থিতি সবচেয়ে জটিল আকার ধারণ করেছে। কোথাও কোথাও যানজট ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
বুধবার (২৭ মে) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এই মহাসড়কের মির্জাপুর, করাতিপাড়া বাইপাস, আশেকপুর বাইপাস, রাবনা বাইপাস ও এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে থেমে থেমে দীর্ঘ যানজট দেখা যায়। একদিকে বৃষ্টিস্নাত আবহাওয়া, অন্যদিকে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ—দুইয়ে মিলে পুরো রুটে ধীরগতির পাশাপাশি কোথাও কোথাও পুরোপুরি স্থবিরতা তৈরি হয়। ঈদযাত্রার শেষ মুহূর্তে এই পরিস্থিতি যাত্রীদের মধ্যে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী বাস ও ব্যক্তিগত গাড়িগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্থানে আটকে থাকে। অনেক যাত্রীর অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় লাগলেও গন্তব্যে পৌঁছানোর কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না। গাবতলী থেকে রওনা দেওয়া একাধিক যাত্রী জানান, ভোরে যাত্রা শুরু করলেও দুপুর গড়িয়ে গেলেও তাঁরা টাঙ্গাইল পার হতে পারেননি। নারায়ণগঞ্জ থেকে রংপুরগামী এক গার্মেন্টসকর্মী জানান, রাত ৮টার দিকে বাসে ওঠার পর দীর্ঘ সময় ধরে তাঁরা যমুনা সেতু পার হতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, আমাদের গাড়ি এখনো টাঙ্গাইল এলাকায় আটকে আছে। কতক্ষণ লাগবে জানি না। পরিবার নিয়ে ঈদ করতে যাচ্ছি, কিন্তু এই ভোগান্তি সহ্য করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান নীলফামারীগামী এক প্রাইভেটকার যাত্রী। তিনি বলেন, গাজীপুর থেকে যাত্রা শুরু করার পর সেতু পার হতে কতক্ষণ লাগবে, তা বলা যাচ্ছে না। ঈদের সময় এমন যানজট নতুন নয়, তবে এবারের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে আরও তীব্র।
যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন জানান, রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি এবং অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের কারণে মহাসড়কে ধীরগতি সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে যানবাহন বিকল হয়ে পড়ায় যানজট আরও দীর্ঘ হয়েছে। তিনি বলেন, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে চাপ পুরোপুরি কমতে কিছুটা সময় লাগবে।
উত্তরের মহাসড়কে যখন এমন পরিস্থিতি, তখন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ছিল তুলনামূলক স্বস্তি। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ও পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণবঙ্গগামী যাত্রীরা নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন বলে জানা গেছে। বৃষ্টিস্নাত সকালে যানবাহনের চাপ বাড়লেও কোনো বড় ধরনের যানজট তৈরি হয়নি। দ্রুত টোল আদায়, পর্যাপ্ত লেন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটেও ঈদের আগের কয়েক দিনের চাপ কমে এসে বুধবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা যায়, ফেরিঘাট এলাকায় বড় ধরনের যানজট নেই। ফেরিগুলো নির্ধারিত সময় অনুযায়ী যানবাহন পারাপার করছে। ঘাট-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ঈদের আগে যাত্রী ও যানবাহনের বড় অংশ ইতিমধ্যে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ায় চাপ অনেকটাই কমে এসেছে। পাটুরিয়া ঘাট এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক দিন ধরে যে চাপ ছিল, বুধবার থেকে তা অনেকটাই কমেছে। ফলে পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। যাত্রীরাও তুলনামূলক স্বস্তিতে পারাপার করতে পারছেন।
এ ছাড়া সড়কের পাশাপাশি রেলপথেও ঈদযাত্রার চাপে ব্যাপক ভোগান্তি ছিল। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে সকাল থেকেই উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। ট্রেনের আসনসংকটের কারণে বহু যাত্রী বাধ্য হয়ে ছাদ ও দরজায় ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করেন। উত্তরাঞ্চলগামী ট্রেনগুলোতে সবচেয়ে বেশি চাপ দেখা গেছে। একতা এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন ট্রেনে এমন দৃশ্য দেখা গেছে, যেখানে নিরাপত্তাকর্মীদের হস্তক্ষেপেও ছাদে ওঠা যাত্রীদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
যাত্রীরা জানান, টিকিটের চাহিদা এত বেশি ছিল যে অনেকেই আগেভাগে টিকিট না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাত্রা করছেন। অনলাইনে টিকিট পাওয়া যাত্রীরা তুলনামূলক স্বস্তিতে থাকলেও অধিকাংশ সাধারণ যাত্রী ভিড়ের মধ্যেই বাড়ি ফিরছেন।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত কিছু কোচ সংযোজন করা হলেও চাহিদার তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। ফলে কিছু ট্রেনে যাত্রীচাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
ঈদযাত্রাকে ঘিরে এবারও পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ২৬টি রুটে প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার যাত্রীর কাছ থেকে ৫ কোটি ৬১ লাখ টাকার বেশি অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক বেশি টাকা নেওয়া হয়েছে, যা প্রতি ঈদেই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
তাদের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, দূরপাল্লার বাসগুলোতে আসনসংখ্যা কম দেখিয়ে বেশি ভাড়া আদায়ের ঘটনাও পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে চালক ও হেলপাররা জানান, ঈদ বোনাস ও শ্রমিকদের বেতন অনিশ্চিত থাকায় তাঁরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে বাধ্য হচ্ছেন। সংগঠনটি মনে করে, দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন খাতে কাঠামোগত সংস্কার না থাকায় এবং ভাড়া মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় প্রতি ঈদে যাত্রীদের এমন ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। ডিজিটাল ভাড়া ব্যবস্থা চালু না হওয়া, নগদ লেনদেনের আধিপত্য এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের প্রভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
এদিকে ঈদযাত্রার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, দেড় কোটি মানুষের ঈদযাত্রা এবং প্রায় ৮০ লাখ কোরবানির পশু পরিবহনের মতো বড় চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও পরিবহনব্যবস্থা মোটামুটি সন্তোষজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
মন্ত্রীর মতে, সরকার সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং বিআরটিএর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে নিয়মিত মনিটরিং চলছে। কোথাও অনিয়ম দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, অধিকাংশ যাত্রী নির্ধারিত ভাড়ায় গন্তব্যে যেতে পারছেন এবং বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়ানো গেছে।
তবে যমুনা সেতুর আগে চন্দ্রা এলাকায় যানজট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাত লেনের যানবাহন দুই লেনে প্রবেশ করায় কিছুটা ধীরগতি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বড় চাপের সময় এমন পরিস্থিতি হয়েই থাকে, যা বড় ধরনের ব্যবস্থাপনা ত্রুটি নয়।
অন্যদিকে ঈদযাত্রার ভয়াবহ ভোগান্তি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল। তিনি জানান, ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে প্রায় ১২ ঘণ্টাতেও তিনি টাঙ্গাইল পার হতে পারেননি। নির্ধারিত সময়ে ঈদের কর্মসূচিতে পৌঁছাতে না পারায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি ছিল না এবং যানজট নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। তাঁর মতে, বাস্তব পরিস্থিতি সরকারের স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রার দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সব মিলিয়ে এবারের ঈদযাত্রা আবারও দেশের যোগাযোগব্যবস্থার সক্ষমতা ও দুর্বলতা—দুই দিকই সামনে এনে দিয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে আধুনিক এক্সপ্রেসওয়ে ও সেতুকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলক স্বস্তি থাকলেও উত্তরাঞ্চলের পুরোনো মহাসড়ক অবকাঠামো ও অতিরিক্ত চাপ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ যানজট ও সীমাহীন দুর্ভোগ। রেল ও সড়ক—দুই পথেই যাত্রীদের বড় অংশ ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
টিএই/এআর