নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ মে ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম
রাত পোহালেই পবিত্র ঈদুল আজহা। শেষ সময়ের কেনাকাটাকে সামনে রেখে রাজধানীর সবচেয়ে বড় পশুর হাট গাবতলীতে এখন গরুর ব্যাপক সমাগম হলেও সেই তুলনায় ক্রেতার উপস্থিতি না থাকলে কেনার সংখ্যা অনেক কম।
টানা বৃষ্টি, কাদা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত পশু সরবরাহের কারণে হাটে গরুর দামে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে বলে দাবি করছেন খামারি ও ব্যাপারিরা।
অনেকেই বলছেন, গত দুই-তিন দিনের তুলনায় বুধবার দুপুরের পর থেকেই দাম দ্রুত কমতে শুরু করেছে। ফলে লোকসানের শঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা খামারিরা। তবে ক্রেতারা বলছেন, একদিনের ব্যবধানে দাম কিছুটা কমে আসায় এখন গরু কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বুধবার (২৭ মে) বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গাবতলী পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, হাটজুড়ে হাজার হাজার গরুর সারি। একের পর এক ট্রাক এসে পশু নামাচ্ছে। কোথাও মাঝারি আকারের দেশি গরু, কোথাও বিশাল আকৃতির ষাঁড় ঘিরে মানুষের ভিড়।
কিন্তু গরুর তুলনায় ক্রেতা তুলনামূলক কম থাকায় অনেক বিক্রেতাকে উদ্বিগ্ন দেখা গেছে। অনেকে গরুর পাশে বসে অপেক্ষা করছেন, কেউ আবার ক্রেতা ডাকতে হাটজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বৃষ্টির কারণে হাটের বিভিন্ন অংশে কাদা জমে যাওয়ায় স্বাভাবিক চলাচলেও ভোগান্তি তৈরি হয়েছে।
কুষ্টিয়া থেকে আসা খামারি সাবের আলী হাটে এনেছেন ১৮টি গরু। তিনি জানান, গত ছয় মাস ধরে নিজের খামারে গরুগুলো প্রস্তুত করেছেন। কিন্তু এবার বাজার পরিস্থিতি দেখে তিনি হতাশ।

সাবের আলী বলেন, কয়েক দিন আগে যে গরুর দাম দুই লাখ টাকার ওপরে উঠছিল, আজ একই গরুর জন্য দেড় লাখ টাকার বেশি বলছে না। অনেক ক্রেতা শুধু ঘুরে ঘুরে দাম জিজ্ঞেস করছেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। বৃষ্টি থাকায় মানুষ কম আসছে। এখন শেষ রাতের ওপরই ভরসা।
পাবনার চাটমোহর থেকে আসা ব্যবসায়ী বারিউল ইসলাম হাটে এনেছেন মাঝারি আকারের ১৩টি গরু। তিনি বলেন, গত বছর এই সময় হাটে ক্রেতার চাপ ছিল অনেক বেশি। এবার মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করছে। ফলে বাজারে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বারিউল বলেন, সকালে এক ক্রেতা তার একটি গরুর দাম বলেছে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। অথচ গরুটি প্রস্তুত করতে তার খরচ হয়েছে প্রায় এক লাখ ১০ হাজার টাকা। এত কম লাভে বিক্রি করলে পরিবহন আর শ্রমিক খরচই উঠবে না।
হাটের আরেক পাশে মানিকগঞ্জের ঘিওর থেকে আসা খামারি নাসির উদ্দিন তিনটি বড় গরু নিয়ে বসেছেন। তিনি জানান, গতকাল রাত পর্যন্ত তার একটি গরুর দাম উঠেছিল আড়াই লাখ টাকা। কিন্তু আজ দুপুরে একই গরুর জন্য দুই লাখ টাকার বেশি কেউ বলছে না। ক্রেতারা এখন সুযোগ নিচ্ছে। কারণ তারা বুঝে গেছে হাটে গরু বেশি। অনেক খামারি শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে কম দামেই বিক্রি করবেন।

শুধু বিক্রেতারাই নন, ক্রেতারাও বলছেন বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। মিরপুর থেকে গরু কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী শাহাদাত হোসেন বলেন, গত সপ্তাহে যে গরুর দাম এক লাখ ৮০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল, আজ একই ধরনের গরু এক লাখ ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি গরুর দাম কমেছে বেশি।
মোহাম্মদপুর থেকে পরিবার নিয়ে গরু দেখতে আসা তালহা জুবায়ের বলেন, বৃষ্টির কারণে হাটে ঘোরাফেরা করতে কষ্ট হলেও আজ বাজারে গরু অনেক বেশি। বিক্রেতারাও আগের মতো শক্ত অবস্থানে নেই। দরদাম করলে অনেকটাই কমে আসছে। তিনি বলেন, শেষ রাতে আরও দাম কমতে পারে বলে ধারণা করছেন।
হাট ঘুরে দেখা যায়, বড় গরুর তুলনায় মাঝারি আকারের দেশি গরুর চাহিদা বেশি। তবে সেই তুলনায় সরবরাহও অনেক বেশি থাকায় বিক্রেতারা কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। অনেক খামারি গরুর সামনে দাঁড়িয়ে ক্রেতাদের ডেকে ডেকে দাম বলছেন। কেউ কেউ আবার গরুর ওজন, খাবার এবং খামারের পরিচর্যার গল্প শুনিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন।
গাবতলীর হাটে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন শ্রমিক জানান, বুধবার সকাল থেকেই ট্রাকের চাপ বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এখনও গরু আসছে। ফলে হাটের ভেতরে জায়গা সংকটও তৈরি হয়েছে। অনেক গরু কাদার মধ্যেই রাখা হচ্ছে।

হাটে দায়িত্বে থাকা এক পশু চিকিৎসক বলেন, দীর্ঘ সময় ভেজা পরিবেশে থাকলে গরুর বিভিন্ন রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে খুরের সমস্যা, ঠান্ডাজনিত অসুস্থতা এবং হজমের সমস্যা বাড়তে পারে। তাই খামারিদের শুকনো খাবার ও পরিষ্কার পরিবেশ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের অভিযোগ, হাটে কাদা ও জলাবদ্ধতার কারণে স্বাভাবিক বেচাকেনা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক জায়গায় হাঁটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও পানি জমে ছোট ছোট গর্ত তৈরি হয়েছে। এতে গরু নামানো এবং পরিবহনেও সমস্যা হচ্ছে।
তবে হাট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পানি নিষ্কাশন ও কাদা কমাতে কাজ চলছে। বিভিন্ন জায়গায় বালু ও ইট ফেলা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না ঘটে।
এএইচ/এএইচ