images

জাতীয়

মেট্রোরেলের নিচে গরুর হাট, কপাল পুড়তে পারে ইজারাদার ফরিদের!

আব্দুল হাকিম

২৭ মে ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম

  • জরিমানা আদায় না হওয়ায় নতুন বিতর্ক তৈরি
  • প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই হাট পরিচালনার অভিযোগ
  • হাট কর্তৃপক্ষ দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে
  • প্রভাবশালীদের সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ
  • অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেবে স্বেচ্ছাসেবক দল
  • শুধু জরিমানা নয়, আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার—বলছেন পরিকল্পনাবিদরা

রাজধানীর দিয়াবাড়িতে মেট্রোরেলের নিচে অনুমোদন ছাড়াই গরুর হাট বসিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা ফরিদ হোসেন। ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে গত সোমবার তিনি মেট্রোরেলের পিলারের নিচে অস্থায়ী পশুর হাট বসান। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা ও চলাচলের ঝুঁকির বিষয়টি উপেক্ষা করেই সেখানে গরু-ছাগল বেচাকেনা শুরু করা হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে তাকে জরিমানা আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে জরিমানা আদায় না হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিচে অবৈধভাবে পশুর হাট বসানো শুধু আইন লঙ্ঘনই নয়, এটি জননিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিয়াবাড়ি এলাকায় মেট্রোরেলের নিচের খোলা জায়গা ব্যবহার করে কয়েকদিন ধরেই পশু নামানো হচ্ছিল। পরে গত সোমবার সেখানে বড় পরিসরে অস্থায়ী হাট বসানো হয়। স্থানীয়রা জানান, মেট্রোরেলের পিলারের নিচে সারি সারি গরু বেঁধে রাখা হয়েছিল। আশপাশে বাঁশ ও ত্রিপল টাঙিয়ে হাসিল ঘরও তৈরি করা হয়। এতে ওই এলাকায় যান চলাচলে ধীরগতি তৈরি হয় এবং পথচারীদের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই প্রভাব খাটিয়ে সেখানে পশুর হাট পরিচালনা করা হচ্ছিল। বিশেষ করে মেট্রোরেলের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনার নিচে পশুর হাট বসানো নিয়ে শুরু থেকেই উদ্বেগ ছিল এলাকাবাসীর মধ্যে। তারা বলছেন, সেখানে দুর্ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা ছিল।

ঘটনার পর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। এ সময় মেট্রোরেলের নিচে পশুর হাট বসানো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিযান পরিচালনার সময় হাট পরিচালনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মেট্রোরেলের নিরাপত্তা বিবেচনায় ওই এলাকায় কোনো ধরনের অস্থায়ী বাজার বা পশুর হাট বসানোর অনুমতি নেই। তারপরও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সেখানে হাট বসানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

1

স্থানীয়দের দাবি, দিয়াবাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই খালি জায়গা দখল করে বিভিন্ন অস্থায়ী কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা চলে। তবে এবার মেট্রোরেলের নিচে গরুর হাট বসানো নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আমানউল্লাহ বলেন, মেট্রোরেলের নিচে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করেন। সেখানে গরুর হাট বসালে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তিনি বলেন, গরু পরিবহনের ট্রাক, ক্রেতাদের ভিড় এবং পশুর বর্জ্যের কারণে পুরো এলাকাই অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল। এছাড়া বৃষ্টি হলে পিচ্ছিল অবস্থা তৈরি হচ্ছিল।

আরেক বাসিন্দা সোহেল রানা বলেন, প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতো। কারণ ঈদের আগের দিনগুলোতে সেখানে আরও বেশি গরু আনার পরিকল্পনা ছিল বলে তিনি শুনেছেন।

এদিকে ঘটনার পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। অভিযোগ উঠছে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ পশুর হাট গড়ে উঠছে। সাধারণ ব্যবসায়ীরা যেখানে সামান্য নিয়ম ভাঙলেও প্রশাসনের কঠোরতার মুখে পড়েন, সেখানে প্রভাবশালীরা অনেক ক্ষেত্রেই পার পেয়ে যান।

যদিও স্বেচ্ছাসেবক দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতা বলছেন, বিষয়টি ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছিল, দলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

তবে রাজধানীর দিয়াবাড়িতে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে গরুর হাট বসানোকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কের ঘটনায় এখন পর্যন্ত স্বেচ্ছাসেবক দলের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট নেতার বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান।

তিনি বলেন, ঘটনাটি হাট পরিচালনার অংশ ছিল না এবং এটি ভুল বোঝাবুঝি থেকে তৈরি হয়েছে। মেট্রোরেলের নিচে গরু বাঁধার বিষয়টি মূল হাটের অংশ হিসেবে হয়নি। হাট কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, এটি তাদের নির্ধারিত এলাকার ভেতরের কোনো কার্যক্রম নয়। কোরবানির সময় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুল সংখ্যক গরু আসে। পরিবহন ও নামানোর সময় অনেক সময় খামারিরা নির্দিষ্ট জায়গা না বুঝে পাশের খালি এলাকায় পশু রেখে দেন, যার ফলে ওই স্থানে সাময়িকভাবে গরু রাখা হয়েছিল। ঘটনাটি ঘটার পরপরই ডিএনসিসি প্রশাসক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং গরুগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে সংগঠনের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত ওই ঘটনায় কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি।

2

সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ওই নেতা বলেন, যদি ভবিষ্যতে কারও সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই সংগঠন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সেখানে সংগঠনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে আমরা জেনেছি।

তবে সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, মেট্রোরেলের নিচে পশুর হাট বসানোর ঘটনায় আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। গত সোমবারের ঘটনায় কোনো জরিমানা করা সম্ভব হয়নি; কারণ তারা তাৎক্ষণিক চলে যায়।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, হাট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চলছে। কোথাও অনিয়ম পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্রেতা ও বিক্রেতাদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশন, ইজারাদার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একসঙ্গে কাজ করছে। সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে।

izaradar

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিচে এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, এটি রাষ্ট্রের সুশাসন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতার চিত্র। রাষ্ট্রে কার্যকর সুশাসন থাকলে কোনো গোষ্ঠী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে মেট্রোরেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিচে পশুর হাট বসানোর সাহস পেত না। এর অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্রের বার্তাই দুর্বল এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে কাজ করছে না। মেট্রোরেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিচে কেউ হাট বসানোর চিন্তা করবে, এটিই অস্বাভাবিক। সেখানে এমন শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা থাকার কথা, যাতে কেউ এমন পরিকল্পনা করার আগেই তা প্রতিরোধ করা যায়।

তিনি বলেন, দেখা যাচ্ছে হাট বসে যাওয়ার পর প্রশাসন গিয়ে বলছে এখানে বসা যাবে না বা জরিমানা করা হবে। এটি কার্যকর শাসনব্যবস্থার চিত্র নয়, বরং দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতিফলন। প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল হাট বসার আগেই এটি বন্ধ করা। কোথাও অবৈধভাবে দখল বা কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। শুধু জরিমানা করলেই দায়িত্ব শেষ নয়; তাদের সরাসরি আইনের আওতায় আনা উচিত।

এএইচ/এআর