মোস্তফা ইমরুল কায়েস
২৬ মে ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
রাজধানীর চকবাজারে একটি প্লাস্টিক কারখানায় ইউসুফ (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তবে কারখানার প্রকৃত মালিক ও হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এখনো গ্রেফতার করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৫ মে চকবাজারের ৩০/৬ দাশেরঘাট লেনের একটি প্লাস্টিক কারখানায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও হত্যার কারণ নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যেও মিলছে না সামঞ্জস্য। একই সঙ্গে সিসিটিভির ফুটেজ নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও আশপাশের কারখানার শ্রমিকদের ভাষ্য, ইউসুফকে চুরির সন্দেহে আটকের পর বেধড়ক মারধর করা হয়। পরে কারখানার ম্যানেজার শহীদুল মালিক বাবুলকে ফোন করে বিষয়টি জানান। এ সময় বাবুল ফোনে মারধরের নির্দেশ দেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ফোনে বাবুল বলেন, ‘তোরা ধইরা পিটায়া মাইরা ফালা। যা করার আমি গিয়া পরে করুম নে।’
আরও পড়ুন: চকবাজারে চুরির অভিযোগে যুবককে পিটিয়ে হত্যা
তাদের দাবি, ওই নির্দেশের পর আবারও ইউসুফকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তিনি মারা যান। স্থানীয়দের ভাষ্য, মারধর এতটাই নির্মম ছিল যে ইউসুফের মাথার পেছনের অংশ থেঁতলে যায়।
এলাকার এক বৃদ্ধ বলেন, ‘পোলাডার পুরো শরীরে তারা হাতুড়ি দিয়া মারছিল। এমনভাবে মাইরছে, মাথার পেছন দিক দিয়া মগজ বাইর হইয়া গ্যাছে গা। তারা ওর হাত-পা বাইন্ধা পিটাইছে।’
সেদিন লাশ উদ্ধারের সময় কারখানার মেঝেতে নিহতের মাথা ও শরীর থেকে বের হওয়া রক্ত পড়ে থাকতে দেখেছেন বলে জানান অনেকে।
এলাকাবাসী আরও জানিয়েছেন, ইউসুফকে হত্যার পর লাশ গুম করার জন্য কারখানাটিতে সেদিন দুপুর পর্যন্ত ফেলে রাখা হয়। যদিও ইউসুফের মৃত্যু হয় সেদিন সকাল ১০টার দিকে। বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পরে তা জানাজানি হয়ে যায়। পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করলেও শুরুতে বিষয়টি চাপা ছিল। পরে গণমাধ্যমকর্মীরা জেনে গেলে ঘটনাটি আলোচনায় আসে।
তারা আরও বলছেন, ম্যানেজার ও বাবুলের মধ্যে কথোপকথনের কল রেকর্ড যাচাই করলেই প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
এ বিষয়ে চকবাজার জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমরা তাদের ফোন জব্দ করেছি। কল রেকর্ড যাচাই চলছে। সবাইকে ধরা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
শুক্রবার রাতে সরেজমিনে চকবাজারের ৩০/৬ দাশেরঘাট লেনের সেই কারখানাটিতে গেলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। দরজায় তালা ঝুলছিল।
ফারুক নামে গলিতে আড্ডা দেওয়া এক যুবক জানান, ঘটনার রাত থেকেই কারখানাটি বন্ধ। শ্রমিকরা সবাই পলাতক।
মামলায় নির্দেশদাতার নাম নেই
আলোচিত এ ঘটনার মামলার এজাহার ঘেঁটে জানা গেছে, কারখানার মালিক বাবুলের ছোট ভাই খুরশীদ আলম (৩৭), কারখানার ম্যানেজার শহীদুল (৪০), সাহাবুদ্দিন (৩৫) ও আলী আকবর (৩৩)সহ চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। মামলায় বাকিদের অজ্ঞাত আসামি করা হয়। তবে কারখানার মালিক বাবুলের নাম যুক্ত করা হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ পরিবারটির দাবি, বাবুলকে রক্ষায় কাজ করছে পুলিশ। তাকে কোনোভাবেই গ্রেফতার করা হচ্ছে না।
নিহতের বাবা অলি মিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘তারা তো বাবুলকে ধরছে না। বাবুলকে আসামিও করল না। আমরা যাদের আসামি করতে চাইলাম, তাদের নাম তারা দিল না।’
আরও জানা গেছে, মামলার এজাহারে কারখানাটির মালিক হিসেবে এক নম্বর আসামি খুরশীদের নাম উল্লেখ করা হলেও মূল মালিক তাঁর ভাই বাবুল। খুরশীদের নির্দেশেই ইউসুফকে হত্যা করা হয় বলেও উল্লেখ করেছেন বাদী নিহতের মা ময়না বেগম। এ ছাড়া নিহতের পুরো শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
চুরি নয়, বলছেন এলাকাবাসী
শুরু থেকেই বিষয়টি ধামাচাপা দিতে একটি চক্র ইউসুফ চুরি করতেই কারখানাটিতে ঢুকেছিলেন বলে প্রচার করছে। তবে এলাকাবাসী ও নিহতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, ইউসুফের বিরুদ্ধে আগে কখনো বাসাবাড়ি বা কারখানায় চুরির অভিযোগ ছিল না। তিনি মূলত বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও কারখানায় টয়লেট পরিষ্কার করে যে টাকা পেতেন, তা দিয়েই সংসার চালাতেন।
এলাকাটিতে গত ৪০ বছর ধরে থাকেন জলিল মিয়া। তিনি বলেন, ‘ইউসুফ খুবই ভালো ছেলে। তার মতো ছেলে এলাকায় নেই। হুদাই ছেলেটাকে চুরির অপবাদ দিয়ে মেরে ফেলল।’
নিহতের মা ময়না বেগম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমার পোলাডা টয়লেট ক্লিনারের কাজটা ভালো পারত। সে জন্য বাসাবাড়িতে গিয়া গিয়া টয়লেট পরিষ্কার করত। যে যা দিত, তা নিয়া আসত। কাউরে কখনো চাপ দিয়া কোনো টাকা-পয়সা আমার পোলায় নিছে, এমন রেকর্ড নাই। আমার ভালো ছেলেটারে চোর বইলা তারা পিটায়া মাইরা ফালাইলো।’
এ বিষয়ে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘কী কারণে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তা আমরা এখনো উদ্ঘাটন করতে পারিনি। তবে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে আপনাদের ডেকে ব্রিফ করা হবে।’
অন্যদিকে চকবাজার জোনের এসি মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘গ্রেফতারকৃতরা দাবি করেছেন, চুরির অভিযোগে তাকে পিটিয়েছেন।’ পরে আবার তিনি বলেন, ‘চুরির অভিযোগে মেরেছে, বিষয়টি আসলে এমন নয়। আমরাও তা মনে করছি না। ভিন্ন কারণও থাকতে পারে।’
মালিকের সংশ্লিষ্টতা পায়নি পুলিশ!
চকবাজার থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এ ঘটনায় কারখানার মালিকের ব্যাপারে কিছু জানি না। আমরা তাদের ফোন জব্দ করেছি। সেগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।’
তবে কারখানার মালিককে গ্রেফতার করা হবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি তিনি। তাঁর ভাষ্য, এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে।
তিনি দাবি করেন, এ ঘটনায় মালিকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। ফলে সিসিটিভি ফুটেজে যাদের দেখা গেছে, তাঁদেরই গ্রেফতার করা হয়েছে।
অন্যদিকে চকবাজার জোনের এসি মাহফুজুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এ ঘটনায় কারখানার মালিকই এক নম্বর আসামি। সেই মালিক পলাতক থাকায় এখনো গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। এখন পর্যন্ত আমরা চারজনকে গ্রেফতার করেছি। দুজন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।’
তবে জানা গেছে, এক নম্বর আসামি খুরশীদ বাবুলের ছোট ভাই। তাকেই পুলিশ মালিক বলে প্রচার করছে। এতে বাবুলকে রক্ষার চেষ্টা করছে পুলিশ বলেও মনে করছেন এলাকাবাসী।
সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে লুকোচুরি?
এ ঘটনায় জব্দ করা সিসিটিভি ফুটেজ থানার ওসির কাছে নেই বলে দাবি করেছেন তিনি। ওসি বলেন, ‘এই সিসিটিভি ফুটেজ এসি স্যারের কাছে আছে। তিনি সব ডিল করছেন। তার সঙ্গে কথা বলেন। আমার কাছে সিসিটিভি ফুটেজ নাই।’
এ ছাড়া তিনি বিষয়টি নিয়ে ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
সিসিটিভি ফুটেজ চাইলে এসি মাহফুজ বলেন, ‘আমরা যে সিসিটিভি ফুটেজ পেয়েছি, সেগুলো স্পষ্ট না। আর এই ফুটেজ আপনাকে দিতে হলে আমাকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’
তবে কারখানার ভেতরের সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
নিহতের পরিবার যা বলছে
শুক্রবার রাতে সরেজমিনে কথা হয় নিহতের মা-বাবার সঙ্গে। তারা অভিযোগ করেন, মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তা তাদের জানানো হয়নি।
নিহতের মা ময়না বেগম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘পোলাডা মারা গেল, সেই খবরও আমারে কেউ দেয় নাই। মানুষের মুখ থাইকা শুনার পর সেইখানে গিয়া দেখি, আমার পোলা মইরা আছে। আমার পোলা অপরাধ করলে আমাগো জানাইত, কিন্তু তারা এভাবে ক্যান পিটাইয়া মারল? আমার পোলা তো চোর-ডাকাইত না। আমি এই হত্যার বিচার চাই। মামলা করছি, কিন্তু পুলিশ তো সবারে ধরতাছে না।’
নিহতের বাবা অলি মিয়া বলেন, ‘আমরা ছেলে হত্যার বিচার চাই।’
এমআইকে/এআর