বোরহান উদ্দিন
২৬ মে ২০২৬, ১১:৫৮ এএম
# কুলিদের দৌরাত্ম্য বন্ধ, স্বস্তিতে যাত্রীরা
# হকারমুক্ত টার্মিনাল, নির্বিঘ্নে হাঁটছেন যাত্রীরা
# মাঝনদীতে নৌকা থেকে যাত্রী তোলা বন্ধ
# নিরাপত্তা নিশ্চিতে সিসি ক্যামেরার আওতায় পুরো সদরঘাট
ঈদুল আজহার সরকারি ছুটির দুদিন পার হয়ে গেছে। তবুও শেষ মুহূর্তে নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়ছেন মানুষ। রাজধানীর রেলওয়ে স্টেশন ও বাস টার্মিনালগুলোতে এখনো উপচেপড়া ভিড় থাকলেও উল্টো চিত্র দেখা গেছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম নৌপথে।
ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে আগের সেই চিরচেনা ভিড় আর নেই। পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই এ রুটে যাত্রীচাপ ক্রমে কমে আসছে। বিগত ঈদুল ফিতরে কিছুটা ভিড় দেখা গেলেও কোরবানির ঈদে সদরঘাটের চিত্র তুলনামূলকভাবে অনেকটাই শান্ত ও সুশৃঙ্খল।
যাত্রী সংখ্যা কম হলেও ঈদের এই বিশেষ সময়ে বাড়তি আয়ের আশায় সব রুটে বিশেষ লঞ্চের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সোমবার (২ ৫মে) ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি বরিশালের উদ্দেশ্যে ৯টি বিলাসবহুল লঞ্চ ছেড়ে গেছে।
এদিকে যাত্রী খরা থাকলেও এবারের ঈদে সদরঘাটের চেহারা যেন বদলে গেছে। ঈদের সময় নানা অনিয়ম আর বিশৃঙ্খল পরিবেশ থাকলেও এবার এখানে দেখা গেছে নজিরবিহীন শৃঙ্খলা। সরকারের নেওয়া নানামুখী কঠোর পদক্ষেপের কারণে সদরঘাটের চিরচেনা বিশৃঙ্খলা এবার উধাও। এবারের মতো দৃশ্য অতীতে ঈদের সময়ে কল্পনাও করা যেত না।
সোমবার (২৫ মে) বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ঘাট ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। সার্বিক বিষয় তদারকির জন্য বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে ওয়াচ টাওয়ার করা হয়েছে৷ সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরায় বসে বসে কোথাও কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা তা দেখভাল করা হয়।
কুলিদের দৌরাত্ম্য বন্ধ, স্বস্তিতে যাত্রীরা
বছরজুড়ে সদরঘাটে পা রাখলেই কুলিদের টানাটানি আর অতিরিক্ত টাকা দাবির যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হতে হতো সাধারণ যাত্রীদের। ঈদের সময় এটা বেড়ে যেত। তবে এবার সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ঘাট কর্তৃপক্ষের কড়া নিয়মের কারণে এবার কুলিদের কোনো দৌরাত্ম্য নেই। নিয়ম করে দেওয়া হয়েছে, কুলিরা যাত্রীদের মালামাল বহনের বিনিময়ে কোনো টাকা নিতে পারবেন না। তাদের পারিশ্রমিক বা বেতন সরাসরি সরকারের পক্ষ থেকে পরিশোধ করা হচ্ছে। ফলে ঘাটে এখন দেখা গেছে এক ভিন্ন দৃশ্য।
যাত্রীরা ঘাটে নেমে প্রয়োজন হলে ট্রলিতে মালপত্র তুলে দিচ্ছেন, আর কুলিরা সেই ট্রলি টেনে লঞ্চে তুলে দিচ্ছেন। কোনো বাড়তি টাকা চাওয়ার সুযোগ নেই, নেই কোনো বাগবিতণ্ডা। যদিও যাত্রীদের তথ্য না জানার সুযোগে কুলিদের কেউ কেউ এরমধ্যেও টাকা নিচ্ছেন।
বরিশালগামী যাত্রী সরকারি চাকরিজীবী মোশারেফ হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সদরঘাট দিয়ে ঈদে বাড়ি যাই। ঘাটে নামলেই কুলিরা যেভাবে ব্যাগ ধরে টানাটানি করত, তাতে ঈদের আনন্দ অর্ধেক মাটি হয়ে যেত। এবারের চিত্র সত্যি ভালো লাগছে। কুলি নিজেই ট্রলি এনে মাল তুলে দিল, কোনো টাকা চাইল না। সরকারের এই সিদ্ধান্ত সত্যিই সাধারণ মানুষের জন্য অনেক বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে।
শুধু তাই নয়, অসুস্থ ও বয়স্ক যাত্রীদের নেয়ার জন্য হুইল চেয়ারেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিনামূল্যে হুইল চেয়ারে করে নির্ধারিত লোকজন তাদের লঞ্চে তুলে দিচ্ছেন।
হকারমুক্ত টার্মিনাল, নির্বিঘ্নে হাঁটছেন যাত্রীরা
এবারের ঈদে সদরঘাট টার্মিনালের ভেতরে এবার কোনো হকারকে বসতে দেওয়া হয়নি। ফলে পন্টুন এবং টার্মিনালের ভেতরের পুরো অংশ ফাঁকা ও পরিচ্ছন্ন। যাত্রীরা কোনো রকম ধাক্কাধাক্কি ছাড়াই নির্বিঘ্নে হেঁটে তাদের নির্দিষ্ট লঞ্চে উঠতে পারছেন।
তবে হকারদের রুটি-রুজির কথা চিন্তা করে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করেছে প্রশাসন। ঘাটের নিয়মিত হকারদের টার্মিনালের পূর্ব পাশের খোলা মাঠে বসার সুনির্দিষ্ট জায়গা করে দেওয়া হয়েছে।
টার্মিনালের পন্টুনে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী নাসির উদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, আগে লঞ্চে ওঠার সময় হকারদের ভিড়ের কারণে বাচ্চাদের হাত ধরে রাখাই কঠিন হতো। আজকে পুরো টার্মিনাল ফাঁকা। হেঁটে লঞ্চে উঠতে কোনো কষ্টই হয়নি।
মাঝনদীতে নৌকা থেকে যাত্রী তোলা বন্ধ
এদিকে গত ঈদুল ফিতরের সময়ে সদরঘাটে নৌকা থেকে লঞ্চে যাত্রী ওঠানামার সময় অসাবধানতাবশত ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বেশ কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবার কঠোর অবস্থানে রয়েছে ঘাট কর্তৃপক্ষ ও নৌ-পুলিশ। এবার নদী পারাপারের ডিঙি নৌকা থেকে চলন্ত বা নোঙর করা লঞ্চে যাত্রী ওঠানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও বন্ধ রাখা হয়েছে।
ডেকে চাপ কম, কবিন হাউসফুল
সদরঘাটে সোমবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে, লঞ্চগুলোর ডেকে অন্যান্য বছরের তুলনায় যাত্রী চাপ অনেক কম। বিশাল বিশাল ডেকে ঈদের সময় যাত্রীতে ঠাসা থাকলেও এবার স্বাভাবিক সময়ের মতো অবস্থা দেখা গেছে। তবে ডেকের অবস্থা যাই হোক, কেবিনের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। প্রায় প্রতিটি বিলাসবহুল লঞ্চের কেবিন ছিল সম্পূর্ণ বুকড বা ‘হাউসফুল’।
পরিবার-পরিজন নিয়ে একটু স্বস্তিতে ও শান্তিতে বাড়ি ফেরার জন্য সামর্থ্যবান যাত্রীরা আগেভাগেই কেবিন বুক করে রেখেছিলেন।
লঞ্চের ডেকে সিট নেওয়া যাত্রী মো. রফিক মিয়া জানান, আগে ঈদের সময় ডেকে বসার জায়গা পাওয়ার জন্য সকাল থেকে এসে বসে থাকতে হতো। এবার বিকেলে এসেও ডেকের মাঝখানে আরামে চাদর বিছিয়ে বসতে পেরেছি। মানুষ কম হওয়ায় বেশ ভালোই লাগছে, শান্তিতে যাওয়া যাবে।
নেপথ্যে পদ্মা সেতু: কী বলছেন স্টাফ ও লঞ্চ কর্তৃপক্ষ
নৌপথে যাত্রী কমে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পদ্মা সেতুর সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা। লঞ্চের স্টাফ, মালিকপক্ষ এবং সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লম্বা সময় লঞ্চে ব্যয় করার চেয়ে মানুষ এখন অল্প সময়ে বাসে বা নিজস্ব গাড়িতে বাড়ি ফিরতে পছন্দ করছেন। বিশেষ করে ঢাকা থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী, মাদারীপুরসহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বাসে এখন মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে, যেখানে লঞ্চে লাগে সারা রাত।
এমভি পারাবত লঞ্চের একজন স্টাফ ঢাকা মেইলকে বলেন, পদ্মা সেতু হওয়ার পর থেকেই আমাদের ব্যবসায়ে মন্দা। আগে ঈদের সময় এই দিনে লঞ্চে পা ফেলার জায়গা থাকত না। ঘাটে মানুষ আর মানুষ থাকত। এখন মানুষ বাসে অল্প সময়ে চলে যায়। কষ্ট করে সারারাত লঞ্চে থাকতে চায় না। ডেকে যাত্রী অনেক কম, তবে ফ্যামিলি নিয়ে যারা আরাম চান, তারা কেবিন নিচ্ছেন। কেবিন সব বুকড।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেইলকে বলেন, পদ্মা সেতুর প্রভাব নৌখাতে স্পষ্ট। তবে আমরা যাত্রী আকর্ষণের জন্য লঞ্চের সেবার মান বাড়াচ্ছি। ঈদের এই সময়ে আমরা লসে হলেও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে বাড়তি লঞ্চের ব্যবস্থা রেখেছি। সোমবারই ৯টি বড় লঞ্চ বরিশালের উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে।
কী বলছেন বিআইডব্লিউটিএ'র কর্মকর্তারা
সার্বিক পরিস্থিতি এবং শৃঙ্খলার বিষয়ে সদরঘাট টার্মিনালের দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএ-এর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, বিগত ঈদের দুর্ঘটনার পর আমরা এবার সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় আছি। যাত্রীদের নিরাপত্তা ও স্বস্তি দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। কুলিদের দৌরাত্ম্য বন্ধে সরকারের বিশেষ তহবিল থেকে তাদের ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা এবারই প্রথম। হকারদের সুনির্দিষ্ট স্থানে সরিয়ে দেওয়ায় টার্মিনাল এখন সম্পূর্ণ যানজট ও জনজটমুক্ত। নৌকা থেকে যাত্রী তোলা আমরা কঠোরভাবে বন্ধ করেছি। যাত্রী সংখ্যা কম হলেও যারা নৌপথ বেছে নিচ্ছেন, তারা যেন একটি স্মরণীয় ও নিরাপদ ঈদ যাত্রা উপভোগ করতে পারেন, আমরা সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছি।
এদিকে সোমবার রাতে ঘাট পরিদর্শন করেছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান।
এসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নিরাপদ ঈদযাত্রা আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা যাত্রীদের বলছি, আপনারা অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে লঞ্চে উঠবেন না। সরকারের যে নির্দেশনা রয়েছে সেগুলো মেনে চলুন।
নৌপ্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, পরিকল্পনামাফিক ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে। আশা করছি, সুষ্ঠুভাবে ও নিরাপদে মানুষদের তাদের ঘরে পৌঁছে দিতে পারবো এবং ছুটি শেষে আবার ফিরিয়ে আনতে পারবো। এটি একটি উৎসব, তাই যাত্রীদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকার কাজ করছে।
সদরঘাট টার্মিনালকে আরও যাত্রীবান্ধব করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই টার্মিনালে বিগত বছরগুলোতে হকার বসতো। যাত্রীদের সুবিধার্থে এখন হকারদের বসতে দেওয়া হয় না। সদরঘাট টার্মিনালকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুপরিকল্পিত রূপ দেওয়া হয়েছে। হকারদের বিকল্প জায়গায় পুনর্বাসন করা হয়েছে।
বিইউ/এমআর