মো. মেহেদী হাসান হাসিব
২৪ মে ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম
আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহার সরকারি ছুটি। ঈদের আগে আজই ছিল সরকারি অফিসগুলোর শেষ কার্যদিবস। অফিস শেষ হওয়ার পরপরই রাজধানীর বাসস্ট্যান্ডগুলোতে বেড়েছে ঘরমুখো মানুষের চাপ। যাদের অগ্রিম টিকিট রয়েছে, তারা নির্বিঘ্নে নির্ধারিত বাসে উঠে গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করছেন। তবে যারা অগ্রিম টিকিট না কেটে কাউন্টারগুলোতে এসে তাৎক্ষণিক টিকিট সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, তারা অভিযোগ করেছেন বাড়তি ভাড়া আদায়ের।
রোববার (২৪ মে) কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা যায়। বিগত কয়েকদিনের তুলনায় বাসস্ট্যান্ডে যাত্রী উপস্থিতি বেশি।কাউন্টারের ভেতরে ও বাইরে সবাই নিজেদের নির্ধারিত বাসের অপেক্ষায় রয়েছেন। কেউ কেউ টিকিটের জন্য এক কাউন্টার থেকে অন্য কাউন্টারে ঘুরছেন।
সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন আবদুল মতিন। অফিস শেষে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য তিনি কল্যাণপুর বাস কাউন্টারে এসেছেন। অগ্রিম টিকিট কাটতে না পেরে এখন তাৎক্ষণিক টিকিটের জন্য এক কাউন্টার থেকে আরেক কাউন্টারে ঘুরছেন। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ভাই, আমি গাইবান্ধা যাব। অগ্রিম টিকিট কাটার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। প্রতিবারই কিছু টাকা বেশি দিয়ে টিকিটের ব্যবস্থা হয়ে যায়। এখনো টিকিট পাইনি, তবে আশা করছি পেয়ে যাব।
আরেক যাত্রী সজিব আহমেদ নওগাঁ যাওয়ার জন্য কল্যাণপুরে এসেছেন। তিনি পেশায় একজন ছাত্র। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে, তবে তা সামান্য। আমি সকালে এসে সাড়ে ৬টার বাসের টিকিট কেটেছি। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০০ টাকা বেশি নিয়েছে। তবে এতে আমার কোনো ক্ষোভ নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসচালক বলেন, ঈদের সময় যাত্রীদের উপস্থিতি বেশি থাকে। আমরা কোনো কোনো দিন দূরপাল্লায় চারটি ট্রিপও দিয়ে থাকি, একটু বেশি আয়ের আশায়। এখন সিটপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি নিলে হেলপারদেরও কিছু টাকা-পয়সা দিতে পারি। আবার ঢাকা ফেরার সময় যাত্রী পাওয়া যায় না। পুরো বাস খালি নিয়ে আসতে হয়। এসব দিক কেউ দেখে না, সবাই শুধু দেখে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
বাস মালিকপক্ষের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত ঈদের তুলনায় এবার যাত্রীর চাপ কম। আপনি বাড়তি ভাড়ার কথা বলছেন, কিন্তু বড় বড় বাস কোম্পানিগুলো সাধারণত অতিরিক্ত ভাড়া নেয় না। বরং অফ-সিজনে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা ছাড় দিয়ে যাত্রী পরিবহন করে। ছোট ছোট বাস কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেই বেশি অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তাদেরও কিছু করার থাকে না। কারণ ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে গেলেও ফেরার পথে অনেক সময় একটি যাত্রীও পাওয়া যায় না। অতিরিক্ত ভাড়া না নিলে তারা টিকে থাকতে পারবে না।
যাত্রী না পাওয়া কিংবা খালি বাস ফিরিয়ে আনার কারণে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়া কতটা বৈধ— এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি এটাকে ভালোভাবে দেখি না। তবে কেন তারা এমন করে, সেটা বললাম। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া অবশ্যই অপরাধ, আর এর জন্য শাস্তিও হয়। আমি কখনোই অতিরিক্ত ভাড়ার পক্ষে নই।
শ্যামলী এনআর কাউন্টারের টিকিট মাস্টার কিশোর কুমার বাড়তি ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা অনলাইন ছাড়া কোনো টিকিট দিচ্ছি না। সব টিকিট অনলাইনেই বিক্রি হয়ে গেছে। কাউন্টারে এসে কোনো টিকিট পাওয়া যাবে না। তাই বাড়তি ভাড়া নেওয়ার সুযোগও নেই।
হানিফ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টার মাস্টার আকাশ বলেন, এখনো পুরোপুরি যাত্রীর চাপ শুরু হয়নি। সন্ধ্যার পর চাপ কিছুটা বাড়বে। আর শিল্পকারখানাগুলো আগামীকাল থেকে ছুটি হবে। সেই হিসাবে সোমবার (২৬ মে) ও বুধবার (২৭ মে) যাত্রীর চাপ আরও বাড়তে পারে।
এবার যানজট কেমন হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা কোরবানির ঈদ। অনেক জায়গায় পশুর হাট সড়ক পর্যন্ত চলে আসে। সে হিসাবে গত ঈদের তুলনায় এবার যানজট বেশি হতে পারে। সড়কের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যায় না। তবে সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিয়েছে।
এদিকে এবারের ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, দেড় কোটি মানুষ এবং এক কোটি কোরবানিযোগ্য পশুকে মাত্র তিন দিনে নির্বিঘ্ন, আরামদায়ক ও স্বস্তিদায়কভাবে পরিবহন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার চেষ্টা করছি। সবাই সহযোগিতা করলে, জনগণ সচেতন থাকলে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করা সম্ভব হবে।
জানা গেছে, ঢাকা থেকে নওগাঁগামী নন-এসি বাসের ভাড়া ৭২০ টাকা, ইকোনমি এসি বাসের ভাড়া ১ হাজার ৫০০ টাকা। ঢাকা থেকে গাইবান্ধাগামী নন-এসি বাসের ভাড়া ৭৯০ টাকা এবং বিজনেস ক্লাস এসি বাসের ভাড়া ১ হাজার ৭৫০ টাকা। ঢাকা থেকে রংপুরগামী নন-এসি বাসের ভাড়া ৯১০ টাকা, ইকোনমি এসি বাসের ভাড়া ১ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার টাকা। ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী নন-এসি বাসের ভাড়া ৭২০ টাকা এবং এসি বাসের ভাড়া ১ হাজার ৫৫০ টাকা। ঢাকা থেকে পঞ্চগড়গামী নন-এসি বাসের ভাড়া ১ হাজার ২৮০ টাকা এবং দেবীগঞ্জগামী বাসের ভাড়া ১ হাজার ১০০ টাকা। ঢাকা-কুষ্টিয়া-মেহেরপুর রুটে নন-এসি বাসের ভাড়া ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা। আর ঢাকা থেকে ভুরুঙ্গামারীগামী বাসের ভাড়া ১ হাজার ১১০ টাকা।
এমএইচএইচ/এফএ