images

জাতীয়

মাঠ-পার্ক ক্লাবের দখলে দিয়ে জনগণের অধিকার সংকুচিত করা হচ্ছে: আইপিডি

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৩ মে ২০২৬, ০৯:৫৮ এএম

রাজধানীর গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক ও স্পোর্টস কমপ্লেক্সের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে দেওয়ার মাধ্যমে মাঠ-পার্ক ও গণপরিসরে সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার সংকুচিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংগঠনটি বলছে, মাঠ-পার্ককে বাণিজ্যিক ক্লাবের নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার প্রবণতা সরকার ও জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে এবং এতে শহরের উন্মুক্ত জনপরিসর আরও সীমিত হয়ে পড়বে।

শুক্রবার (২২ মে) অনলাইনে আয়োজিত ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) পর্যবেক্ষণ অনুষ্ঠান ‘গুলশান সেন্ট্রাল পার্ককে গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের নিকট সমর্পণ: মাঠ-পার্কের দখলদারিত্বের নতুন বাস্তবতা’ শীর্ষক আলোচনা এসব কথা বলা হয়।

অনুষ্ঠানে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও ক্রীড়ামন্ত্রী যেখানে খেলাধুলার সুযোগ সম্প্রসারণের কথা বলছেন, সেখানে গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের মাঠ একটি ক্লাবের কাছে হস্তান্তর করা উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপন্থী এবং আদালত অবমাননার শামিল। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের খেলাধুলা ও বিনোদনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, কয়েক মাস আগেও রাজউক গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে অবৈধ দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। অথচ এখন একই প্রতিষ্ঠান সেই ক্লাবকেই মাঠ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও বিভিন্ন সময়ে মাঠটির দায়িত্ব ওই ক্লাবের হাতে তুলে দিয়েছিল।

আইপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঠ-পার্ক এখনো দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকার পরিবর্তন হলেও দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এতে সাধারণ শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ কমে যাচ্ছে এবং বিত্তশালীদের জন্য আলাদা সুবিধা তৈরি হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে পরিবেশবিষয়ক আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় প্রতিটি এলাকায় পার্ক ও খেলার মাঠ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে মাঠ-পার্ক দখল হয়ে যাচ্ছে। হাইকোর্টের রায় থাকার পরও গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক ক্লাবের কাছে হস্তান্তর করা হতাশাজনক। এ ঘটনায় কোনো ধরনের দুর্নীতি হয়েছে কি না, তা দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত করা উচিত।

বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক আমিরুল রাজীব বলেন, মাঠ-পার্ক রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তির নৈতিক বিচ্যুতি আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এরপরও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে নাগরিকদের কথা বলে যেতে হবে।

স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষক ও আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল বলেন, ঢাকার জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঠ-পার্কের ওপর চাপও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল মাঠ ও পার্ক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

পরিবেশকর্মী নাঈম উল হাসান বলেন, গুলশানের মতো দখলদারিত্ব দেশের অন্যান্য এলাকাতেও রয়েছে। রাজধানীতে এ ধরনের দখলের বিরুদ্ধে আন্দোলন অন্যান্য অঞ্চলের মানুষকেও অনুপ্রাণিত করবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও আইপিডির রিসার্চ ফেলো ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় পার্ক ও খেলার মাঠের সংখ্যা খুবই কম। অথচ উন্নত দেশগুলোতে নগর পরিকল্পনায় এসব জনপরিসরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি চুক্তিকে আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সদস্য পরিকল্পনাবিদ আবু নইম সোহাগ বলেন, সরকার যখন প্রতিটি এলাকায় মাঠ রাখার ঘোষণা দিয়েছে, তখন কোনো অনুমোদন ছাড়াই মাঠ একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ ধরনের সিদ্ধান্তের পরিণতি ভালো হয় না বলেও তিনি সতর্ক করেন।

আইপিডির সদস্য পরিকল্পনাবিদ ফাহিম মন্ডল বলেন, সরকার মাঠ-পার্ক নিজেরা রক্ষণাবেক্ষণের পরিবর্তে তৃতীয় পক্ষের কাছে ইজারা দিতে বেশি আগ্রহী। পার্কটির আগের নাম ‘শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক’ পুনর্বহালের দাবিও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে আইপিডির পক্ষ থেকে মাঠ-পার্ক ব্যবস্থাপনায় কমিউনিটি ও সিটি করপোরেশনভিত্তিক যৌথ ব্যবস্থাপনা মডেল প্রস্তাব করা হয়। এতে মাঠ-পার্কের উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা দেখভালে স্থানীয় নাগরিক প্রতিনিধি ও সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়।

এ ছাড়া গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের সব সুযোগ-সুবিধা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা, রাজউক ও গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বাতিল, মাঠ-পার্কের বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধ এবং সারা দেশের মাঠ-পার্ক দখল ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানানো হয়।

ঢাকা শহরের মাঠ-পার্ক এর সার্বিক পরিচালনার জন্য আইপিডির পক্ষ থেকে
কমিউনিটি ও সিটি কর্পোরেশনভিত্তিক যৌথ ব্যবস্থাপনা মডেল প্রস্তাব করা হয়। 

দ্বি-স্তরের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে মাঠ-পার্ক পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ যৌথ কমিটি গঠিত করবার সুপারিশ করা হয়। প্রথম স্তর হবে সিটি কর্পোরেশন ভিত্তিক। ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিস এবং সিটি কর্পোরেশনের প্রতিনিধিরা এর আইনি ও কাঠামোগত অভিভাবক হিসেবে থাকবেন। দ্বিতীয় স্তর হবে স্থানীয় কমিউনিটির নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বশীল কমিটি। এতে এলাকার সমাজসেবক, পরিবেশবিদ এবং বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নাগরিকদের নিয়ে প্রতিনিধিত্ব থাকবে। মূলত পার্কের উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ বিল, সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ এবং মূল নিরাপত্তা অবকাঠামো তদারকি করবে সিটি কর্পোরেশন। 

এছাড়া প্রতিদিনের পরিচ্ছন্নতা, তদারকি, যত্ন এবং দর্শনার্থী ও ব্যবহারকারীরা মাঠপার্কের নিয়ম ও নীতিমালা মানছেন কিনা তা দেখাশোনা করবে কমিউনিটিভিত্তিক কমিটি। মাঠ-পার্কের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিটি কর্পোরেশন এর বাজেটে বরাদ্দ থাকতে হবে। এছাড়া প্রয়োজন হলে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর ফান্ড কিংবা ডোনেশন ও সংগ্রহ করা যেতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থাপনা মডেলে কোনো নির্দিষ্ট স্পোর্টিং ক্লাব বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী পার্ক বা মাঠকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে বাণিজ্য করতে পারে না, যা ঢাকার বিভিন্ন মাঠ-পার্কে এখন দেখা যাচ্ছে।

এ ছাড়া মাঠ-পার্ক ও গণপরিসরে সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে আইপিডির পক্ষ থেকে আট দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—

১. গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের মাঠসহ সকল সুযোগ সুবিধাদি সর্বসাধারণের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিতে হবে।

২. রাজউক ও গুলশান ইয়ুথ ক্লাব এর মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।

৩. পার্কের নাম পুনরায় ‘শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক’ রাখতে হবে।

৪. এই যাবতকাল গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের দখলদারিত্বের বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

৫. ঢাকা শহরসহ সারা দেশের সকল মাঠ-পার্কের বাণিজ্যিক ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।

৬. ঢাকা শহরসহ সারাদেশের সকল মাঠ-পার্কের বাণিজ্যিক ব্যবহার ও দখলদারিত্বের পূর্ণ তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ ও দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

৭. মাঠ পার্ক এর ব্যবস্থাপনার জন্য কমিউনিটি ও ওয়ার্ড কাউন্সিলকে এর যৌথ ব্যবস্থাপনাভিত্তিক নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

৮. প্রতিটি এলাকায় সার্বজনীন প্রবেশগম্য মাঠ পার্ক এর জন্য যথাযথ পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের পথরেখা তৈরি করতে হবে।

এএইচ/এএস